ইডেনের সাবেক অধ্যক্ষ খুন

দুই গৃহকর্মীর সঙ্গে আরও এক নারীকে ঘিরে সন্দেহ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইডেনের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন
ইডেনের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ছবি: সংগৃহীত

নিজ ফ্ল্যাটে ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভিন খুনের ঘটনায় দুই গৃহকর্মীর সঙ্গে আরও এক নারীকে ঘিরে সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে।

বাসা থেকে খোয়া গেছে ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন। ঘটনার পর থেকে পলাতক দুই গৃহকর্মী রুমা ওরফে রেশমা ও স্বপ্না ১ মাস আগে মাহফুজার বাসায় কাজ নেয়। রুনু নামের এক নারী তাদের এ বাসায় সরবরাহ করে।

ঘটনার পর এ রুনুরও কোনো হদিস মিলছে না। পুলিশের সন্দেহ রুনু নামের ওই নারী মালামাল লুট করতেই রেশমা ও স্বপ্নাকে মাহফুজার বাসায় পাঠিয়ে থাকতে পারে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেছেন, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মাহফুজাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছাড়াও তার হাতের একটি আঙুল ভাঙা ছিল। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি।

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ‘সুকন্যা টাওয়ার’র ১৫ ও ১৬ তলার নিজের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে খুন হন মাহফুজা। নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল খোয়া গেছে বাসা থেকে। সোমবার সকালে মাহফুজার স্বামী ইসমত কাদির গামা নিউমার্কেট থানায় রেশমা ও স্বপ্নাকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে রুনুকে সন্দেহজনক এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

মাহফুজার স্বামী ইসমত কাদির বলেছেন, রেশমা ও স্বপ্না অজ্ঞাত আসামিদের যোগসাজশে মাহফুজাকে হত্যা করে নগদ অর্থ ও মালামাল নিয়ে পালিয়ে গেছে। রুনু এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ বলছে, পরিকল্পিতভাবে মালামাল লুট করতে মাহফুজাকে খুন করে থাকতে পারে দুই গৃহকর্মী। এর পেছনে অজ্ঞাত কারও হাত থাকতে পারে। অন্য কোনো কারণ আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুই গৃহকর্র্মীর বিস্তারিত পরিচয় জানা গেছে।

রেশমার বয়স ৩০ বছর, গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারীর মজুরদিয়া গ্রামে, বাবার নাম আবদুর রশিদ। স্বপ্নার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনার রায়টুটি গ্রামে, বাবার নাম আবদুল করিম। গৃহকর্মী সরবরাহকারী রুনু সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। সে বিভিন্ন বাসায় কমিশনের বিনিময়ে গৃহকর্মী সরবরাহ করে। তার বাসা হাজারীবাগে।

নিউ মার্কেট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মতলুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দুই গৃহকর্মীকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু হয়েছে। তবে রুনুর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের গ্রেফতার করা গেলে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। আশা করছি শিগিগির তারা ধরা পড়বে।

বাসা লণ্ডভণ্ড : মাহফুজার পরিবার বলছে, ১৫ ও ১৬ তলার নিজেদের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে স্বামী ইসমত কাদির গামাকে নিয়ে বসবাস করতেন মাহফুজা। ৫৫ বছর বয়সী আরেক গৃহকর্মী রাশিদা দীর্ঘদিন ধরে এ বাসায় কাজ করছিলেন। ১ মাস আগে রেশমা ও স্বপ্না কাজে যোগ দেয়।

মাহফুজার স্বামী এজাহারে বলেছেন, তিন গৃহকর্মীকে বাসায় রেখে রোববার সকালে কাজে বের হয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার আগে মাহফুজার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাসায় ফিরে ফ্ল্যাটে নক করে কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। অনেক ডাকাডাকির পর গৃহকর্মী রাশিদা এসে জানান, ভেতর থেকে দরজা সিটকিনি দিয়ে আটকানো, কিন্তু লকে চাবি নেই।

সিটকিনি খোলার পর আমি ভেতরে ঢুকে রেশমা ও স্বপ্নাকে ডাকতে থাকি, কোনো সাড়া না পেয়ে নিচ তলায় এসে বাসায় ঢোকার মূল দরজা খোলা ও চাবি দরজার লকে ঝুলছে দেখতে পাই। চাবি নিয়ে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে মাহফুজার শয়নকক্ষের দরজা খুলে দেখি সে খাটের ওপরে চিত অবস্থায় সোয়া, হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত খাটের বাইরে ঝুলছে। কম্বল দিয়ে মাথা থেকে বুক পর্যন্ত ঢাকা। কম্বল সরালে দেখা যায়, দুই হাত বাঁকানো, গলায় ওড়না পেঁচানো ও ঠোঁটে হালকা রক্ত ছিল। পুরো ঘর তখন লণ্ডভণ্ড।

মাহফুজার পরিবার জানায়, মাহফুজা দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে অভিক মেডিকেল কোরে সেনাবাহিনীর মেজর এবং অমিত একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। তবে তারা বাবা-মার সঙ্গে থাকতেন না। মাহফুজা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

২০১১ সালে তিনি অবসর নেয়ার কথা থাকলেও আরও ৩ বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। ২০১৪ সালে তিনি অবসর নেন। তার স্বামী ইসমত কাদির গামা বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতা এবং ’৭০ দশকের প্রথম দিকে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এদিকে সোমবার বিকালে জানাজা শেষে মাহফুজার লাশ বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মাহফুজাকে হত্যা করেছে : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ধারণা করছি দুই বা ততোধিক ব্যক্তি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তার মুখ, ঠোঁট ও আঙুলে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। হাতের একটি আঙুল ভাঙা ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি এ হত্যার সঙ্গে জড়িত।

ঘটনাপ্রবাহ : ইডেনের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন খুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×