মনন-সৃজন-উদ্ভাবনার চেতনাই একুশের প্রাণশক্তি

  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মনন-সৃজন-উদ্ভাবনার চেতনাই একুশের প্রাণশক্তি

একুশ এলেই আমাদের চোখের সামনে সবচেয়ে বড় যে ছবিটি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে, ১৯৫২ সালের ছবি। যেখানে কিছু তরুণ অকাতরে নিজের প্রাণ দিচ্ছেন- মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য। সেখান থেকে আমরা কত দূরে চলে এসেছি! মাতৃভাষা- শুধু বাংলা ভাষা নয়- ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।

বায়ান্ন সাল যে আমাদের কতভাবে অনুপ্রাণিত করেছে তা-তো আমরা একাত্তরে এসে বুঝেছি এবং একাত্তরের পরও আমাদের যত আন্দোলন তার সব শক্তি জুগিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ মিনার। এমনকি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের সবারই আশ্রয়, শেষ ঠিকানা- একুশের সংগ্রামী চেতনা।

একুশে ফেব্রুয়ারি তো সারা পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছে সেটা আমাদের একটা বিশাল অর্জন। সেই শহীদ- যারা তাদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, তাদের সে আত্মদান নিশ্চয়ই বৃথা যায়নি। কিন্তু আমার দুঃখ হয়- যখন আমি বাংলা নিয়ে কিছু করতে যাই। আমি দেখতে পারছি আমরা বাংলা ভাষাকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছি।

আমাদের ভাষা ব্যবহারের শৃঙ্খলা নেই। আমি একটা কথা সবসময় বলে থাকি, যে জাতির ভাষা ব্যবহারের শৃঙ্খলা নেই, সে জাতির চিন্তাতেও শৃঙ্খলা থাকে না। কারণ আমার চিন্তা তো আমার মাতৃভাষায় হয়। আমি যতই ইংরেজি জানা, ফারসি জানা পণ্ডিত হই না কেন, দিনের শেষে তো আমার মা-বাবাকে ডাকতে হয় এবং মাতৃভূমির দিকে একবার ফিরে তাকাতে হয়। দৈনন্দিন সেই মাতৃভাষাকেই ব্যবহার করতে হয়। তাহলে আমাদের সেই ভাষা ব্যবহারে এত বিশৃঙ্খলা কেন? ইংরেজির এত অনুপ্রবেশ কেন?

যে কোনো টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে দাঁড়িয়ে ছোট্ট এক দেড় মিনিটের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে গিয়ে ১০ জনের ভেতর ৯ জন প্রতিবেদক গুছিয়ে তিন বাক্যও শুদ্ধ বাংলায় বলতে পারেন না। অভিজ্ঞতার আলোকে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি।

এরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন, এদের অনেকে বাংলার শিক্ষার্থী ছিলেন- তারা তিনটি বাক্য নির্ভুলভাবে বলতে পারেন না মাতৃভাষায়। সমাপ্ত করতে পারেন না, একটি বাক্য অসমাপ্ত রেখে অন্য বাক্যে চলে যান।

বর্তমানে দুটি শব্দের পেরেক ক্রমাগতভাবে বিদ্ধ করছে আমাদের ভাষাকে- একটা হচ্ছে ‘কিন্তু’ আর একটা হচ্ছে ‘আসলে’। এখন এ দুটি শব্দ ছাড়া আমরা কোনো বাক্য বলতে পারি না। যেমন দুটি ক্রাচে ভর দিয়ে যেসব মানুষের চলৎশক্তির অসুবিধা তাদের চলতে হয়, তেমনি গণমাধ্যমের প্রতিবেদক থেকে শুরু করে আমাদের টকশো’র বক্তারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত ও দুই ক্রাচ ছাড়া চলতে পারেন না।

“আমি ‘কিন্তু’ ‘আসলে’ দাঁড়িয়ে আছি কার্জন হলের সামনে”- কথাটার মানেটা কী? অর্থহীন একটা কথা। এই যে বিশৃঙ্খলভাবে আমরা ভাষা ব্যবহার করছি এটি আমাদের চিন্তা ও চেতনার বিশৃঙ্খলারই সার্বিক বহিঃপ্রকাশ। আমাদের নদী শাসনে বিশৃঙ্খলতা, চলাচলের রাস্তায় বিশৃঙ্খলতা, আমাদের রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চিন্তাক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলতা- তারা শুধু সরকারকে তোষামোদ করবেন নাকি বিরোধী দলের লোকজনকে তোষামোদ করবেন- সারাক্ষণ সেই চিন্তাতেই ব্যস্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে সকাল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিসিএস পরীক্ষার গাইড পাঠের জন্য ভিড় করছেন- এটাও শিক্ষাক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলতার একটা নমুনা। সরকারি কর্মকর্তারা অনিয়ম-দুর্নীতিতে লিপ্ত, তারা সবসময় চিন্তামগ্ন কীভাবে বাড়ি-ফ্ল্যাট কিনবেন- এটাও একটা বিশৃঙ্খলা।

এমনকি আমরা ধর্ম নিয়েও বিশৃঙ্খলায় লিপ্ত। অথচ ধর্মীয় অনুশাসনগুলো হচ্ছে সবচেয়ে বিধিবদ্ধ অনুশাসন- সেখানেও আমরা বিশৃঙ্খলা করি। ফলে আমাদের ভাষা ব্যবহারে সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

মাঝে একবার শুরু হয়েছিল- ‘আইতাছি’, ‘যাইতাছি’, ‘খাইতাছি’র দৌরাত্ম্য। অনেকে দাবি করছিল- এটা হবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা, কারণ পশ্চিবঙ্গের ভাষা থেকে আমাদের পৃথক হতে হবে। আমি এর বিরোধিতা করেছি। এসব প্রচেষ্টা বাংলা ভাষাকে ভীষণভাবে দুর্বল করার প্রয়াস। আমি মনে করি, আমাদের একটা প্রমিত বাংলা ব্যবহার করতে হবে। আমি নিজে ২৫টা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারি- সিলেটি ভাষায়, হবিগঞ্জের ভাষায়, বরিশালের ভাষায়, চট্টগ্রামের ভাষায়, নোয়াখালীর ভাষায়, রংপুরের ভাষায় প্রভৃতি। আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যকে আত্মস্থ করে আমাদের একটি সমৃদ্ধ প্রমিত বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। যেন পরবর্তী শতকে যারা লিখতে বসবেন তাদের হাতে থাকে অজস্র শব্দ ভাণ্ডার। জ্ঞানের সব শাখার, সব ভাবনা-চিন্তাকে সুশৃঙ্খল ও সুচারুরূপে যাতে তারা প্রকাশ করতে সক্ষম হন।

কিছু কাজ আমাদের আশুকরণীয় বলে আমি মনে করি, যেমন- আমাদের একটি ভাষানীতি করা প্রয়োজন। বাংলা একাডেমিতে একটি অনুবাদ বিভাগ হওয়া উচিত। সেখান থেকে ইংরেজি ভাষায় আমাদের বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী সম্ভার ভাষান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে আমাদের সাহিত্য পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে।

এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা হিসেবে আমাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয়া। আরেকটি বিষয়, অমর একুশের গ্রন্থমেলা মাসব্যাপী না করে ১০ কিংবা ১৫ দিনের করা- সে ক্ষেত্রে মেলার সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা করা যেতে পারে। একুশের গ্রন্থমেলার পরপরই আয়োজন করা যেতে পারে আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার। তাতে আমাদের সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণ সম্ভব হবে। এতে লেখক এবং প্রকাশকরা উপকৃত হবেন।

বাঙালি জাতির মনন-সৃজন ও উদ্ভাবনার চেতনাই একুশের প্রাণশক্তি। সেই প্রাণশক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুশৃঙ্খল চিন্তার বিকল্প নেই।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×