জামায়াত ছাড়লেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক

একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্তির পরামর্শ * ‘মতবিরোধ’ নাকি ‘কৌশল’ তা নিয়ে রয়েছে গুঞ্জন

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্তির পরামর্শ দিয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তিনি দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।

শুক্রবার দলের আমীর মকবুল আহমদকে চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। তবে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নাকি কোনো ‘কৌশলের’ অংশ হিসেবে তিনি পদত্যাগ করেছেন, তা নিয়ে নানা মহলে রয়েছে গুঞ্জন।

রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়ে এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকসহ আমরা দীর্ঘদিন একই সঙ্গে এই সংগঠনে কাজ করেছি। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। দলে তার সব অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

তিনি বলেন, তার পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যে কোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। আমরা দোয়া করি, তিনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আমরা আশা করি, তার সঙ্গে আমাদের মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী নেতাদের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক গত ছয় বছর ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তিনি পদত্যাগপত্রে দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, জামায়াত ’৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি এবং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে এবং অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

অ্যাসেক্সের বারকিং থেকে ঢাকায় পাঠানো পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক জামায়াতের আমীরকে ‘পরম শ্রদ্ধেয় মকবুল ভাই’ সম্মোধন করে লিখেছেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সব সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে।

রাজ্জাক লিখেছেন, গত প্রায় দুই দশক তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

দলীয় ফোরামে কবে কখন কীভাবে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন তার একটি তালিকা তুলে ধরে পদত্যাগপত্রে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জানুয়ারিতে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেই। অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্ত করে দিন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমার তিন দশকের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

রাজ্জাক লিখেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য গ্রহণযোগ্য বক্তব্য প্রদানের ব্যর্থতা এবং ক্ষমা না চাওয়ার দায়ভার এখন তাদেরও নিতে হচ্ছে যারা তখন ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল না, এমনকি যাদের তখন জন্মও হয়নি। এই ক্রমাগত ব্যর্থতা জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে জামায়াত জনগণ, গণরাজনীতি এবং দেশবিমুখ দলে পরিণত হয়েছে।

জামায়াতে যোগ দেয়ার পর দলের ভেতর থেকেই সংস্কারের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানিয়ে রাজ্জাক বলেন, দলের কাঠামোগত সংস্কার, নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জামায়াতের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে ‘আমূল পরিবর্তন’ আনতে তার প্রস্তাবগুলো গত ৩০ বছরে ইতিবাচক সাড়া পায়নি।

পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক বলেন, অতীতে অনেকবার পদত্যাগের কথা ভাবলেও তিনি নিজেকে বিরত রেখেছেন এই ভেবে যে, দলের সংস্কার করা সম্ভব হলে এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চাইলে তা হবে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই। সেইসঙ্গে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব।

পদত্যাগের কারণ ‘মতবিরোধ’ নাকি ‘কৌশল’, এ নিয়ে গুঞ্জন : এদিকে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। কেউ বলছেন দল নিয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

আবার কেউ কেউ এ-ও বলছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী’ নামের পরিবর্তন করে নতুন নামে আসতে চাইছে দলটি। তরুণ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ (শিবিরের সাবেক নেতা) এর পক্ষে রয়েছেন। তারা দল নিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গেও একমত। নতুন দল গঠন হলে দলের নেতৃত্বে ব্যারিস্টার রাজ্জাককেই দেখতে চান তারা।

এ জন্য ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনই দল থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন। যাতে নতুন দলের নেতৃত্বে এলে কোনো বিতর্ক না ওঠে এবং জামায়াতের তকমাও এড়ানো যায়। অবশ্য লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক একটি গণমাধ্যকে জানান, জামায়াত থেকে পদত্যাগ করে নতুন কোনো সংগঠনে যুক্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

জামায়াতের একটি সূত্র জানায়, যে পরামর্শ দিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন তার সঙ্গে দলের দুই শীর্ষ নেতার একজন একমত ছিলেন। তবে দলের আরেক শীর্ষ নেতার জামায়াতে ইসলামী নামের পরিবর্তে নতুন নামকরণের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে।

জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা যুগান্তরকে বলেন, শীর্ষ দুই নেতার একজনের যুক্তি হচ্ছে- দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরকার যেভাবে নির্যাতন নিপীড়ন চালাচ্ছে নতুন নামে এলেও একই আচরণের শিকার হতে হবে। সুতরাং যে যুক্তিতে নাম পরিবর্তন করার মতামত এসেছে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকবে না।

প্রায় ৯ বছর আগে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মতো একই রকম প্রস্তাব দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তিনি ২০১০ সালে গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন পর কারাগার থেকে দেয়া এক চিঠিতে প্রস্তাব করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন দায়িত্বশীলদের হাতে যেন জামায়াতকে ছেড়ে দেয়া হয়।

তিনি একাধিক বিকল্পের মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতের নামও বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে মতিউর রহমান নিজামীর পরিবারসহ তখনকার সিনিয়র নেতাদের বাধার কারণে সেটা এগোয়নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলের তরুণ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নতুন করে ওই প্রস্তাব ও আলোচনা সামনে এনেছে।

তরুণ নেতাদের একজন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। জামায়াতের নানা ভুল নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরে সম্প্রতি তিনি ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন।

স্ট্যাটাসের একটি অংশে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বড় ভুল হল- বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আমাদের অস্বচ্ছ, বিভ্রান্তিকর অবস্থান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত অংশ নেয়নি বরং বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতা করে জামায়াত কি সঠিক করেছে, না ভুল করেছে? দলীয়ভাবে এ বিষয়টি তারা এখনও সুরাহা করতে পারেননি। হ্যাঁ, জামায়াত যদি ’৭১ সালের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করত, ক্ষমা চাইতো এবং সবার আগে আমাদেরকে অর্থাৎ দলীয় কর্মীদের সে বিষয়ে দীক্ষা দিত তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গ এলে রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধী এমন কোনো গালি নেই যা আমাদের দেয়া হয় না। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে এবং নেতৃত্বের দোদুল্যমানতায় অযথা আমরা সমাজের ২য় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে আছি। আপনি যদি ভুল করে থাকেন আর সেটা স্বীকার না করে নানা ধানাই-পানাই করে যুক্তি দেন, তাহলে সেটা কখনোই প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না। এটা ইসলামিক পদ্ধতিও নয়। বরং এতে আপনার বিরুদ্ধ প্রচারণাটাই প্রতিষ্ঠা পাবে। আর যদি আপনার ভূমিকা হয় সঠিক, ন্যায়ানুগ এবং যুক্তিপূর্ণ; কিন্তু আপনি পরিস্থিতির কারণে সুবিধা পাওয়ার জন্য বলেন, না আমি ঠিক করিনি, আবেগ নির্ভর ছিল বা ভুল ছিল-সেটা আরও মারাত্মক।’

সূত্র জানায়, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য সম্প্রতি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয়। দলের তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে সভায় একাত্তরের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত নামক দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে দলকে নিয়োজিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা মজলিশে শূরায় অনুমোদন পায়নি।

তবে জামায়াতের একটি সূত্র জানায়, নতুন নামে দল গঠনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে জামায়াতে ইসলামীতে। নতুন নামে দল গঠনের প্রস্তাব আসে জামায়াতের মজলিসে শূরা থেকেই। প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দলের নির্বাহী পরিষদকে। চলতি বছরেই নতুন দল গঠিত হতে পারে। তবে দলের নাম চূড়ান্ত হয়নি।

সিদ্ধান্ত হয়েছে, নতুন দল ধর্মভিত্তিক হবে না। নতুন দল গঠিত হলেও বিলুপ্ত হবে না নিবন্ধন হারানো জামায়াত। দলটি থাকবে ‘আদর্শিক সংগঠন’ হিসেবে, কিন্তু ভোটে থাকবে না। ভোটের রাজনীতিতে থাকবে নতুন দল।

এদিকে জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি নেতারা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। এ নিয়ে জানতে চাইলে জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তবে দলটির একজন যুগ্ম মহাসচিব যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ধারণা এ ঘটনা সরকারের একটি ‘গেম’। আমরা সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছি। তবে জামায়াতে ইসলামীকে দুই ভাগ করার একটা চেষ্টা চলছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×