চট্টগ্রামে বস্তিতে আগুন : ৮ জনের মৃত্যু

সব হারিয়ে শুধুই আহাজারি

গভীর রাতে চারশ’ বস্তিঘর পুড়ে ছাই, খোলা আকাশের নিচে দুই সহস্রাধিক মানুষের মানবেতর জীবন * নিহতদের মধ্যে দুই পরিবারেরই সাত জন * চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

  চট্টগ্রাম ব্যুরো ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সব হারিয়ে শুধুই আহাজারি
চট্টগ্রামের চাক্তাই ভেড়া মার্কেটসংলগ্ন বস্তিতে শনিবার রাতে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্বজনের আহাজারি। ছবি: যুগান্তর

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতীরে একটি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের ৭ জনসহ ৮ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পুড়ে গেছে চার শতাধিক বস্তিঘর। শনিবার গভীর রাতে বাকলিয়া থানাধীন চাক্তাই ভেড়া মার্কেট এলাকায় আগুনে সব হারিয়ে এখন সেখানে শুধুই আহাজারি।

নিহতদের মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ওসমানপুর গ্রামের সুরুজ মিয়ার স্ত্রী রহিমা খাতুন (৫০) পরিবারেরই ৪ সদস্য পুড়ে কয়লা হয়ে গেছেন। সুরুজ মিয়া ও তার বড় মেয়ে আসমা বেঁচে থাকলেও তার কান্না থামছে না।

এই রহিমাই গভীর রাতে বস্তির সবাইকে আগুন লাগার খবর চিৎকার করে জানিয়ে নিজের সন্তানদের জাগাতে ঘরে ঢুকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। রহিমা ছাড়াও তার মেয়ে নাজমা (১৪), ছোট মেয়ে নার্গিস (৪) ও ছেলে জাকির হোসেন বাবু (৯) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

বস্তির পাশে একটি দোকান চালাতেন রহিমা। বড় মেয়ে আসমা বেগম স্বামী নিয়ে পাশের একটি ঘরে থাকতেন। এ ছাড়া কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানার লিমসাখালীর সামশুল আলমের স্ত্রী হাসিনা আক্তার (৩৫) পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

অপর দু’জন হচ্ছেন হাসিনার বোন ও ভোলা সদর উপজেলার রিপন উদ্দিনের স্ত্রী আয়েশা আক্তার (৩৭) ও ভাগিনা সোহাগ। রিপন আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। এ ছাড়া এক বছর বয়সী একটি শিশুর দ্বিখণ্ডিত লাশ পাওয়া গেলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত তার পরিচয় জানা যায়নি। একটি সূত্র বলেছে, শিশুটি আয়েশার সন্তান। আয়েশার পরিবারের সবাই মারা যাওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। পুড়ে যাওয়া বস্তিতে আর্তনাদ আর আহাজারির শব্দে বাতাস ভারি। আগুনে দেহ বিকৃত ও শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় লাশের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। লাশের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যেও।

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন রোববার যুগান্তরকে বলেন, দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় অল্পে রক্ষা পেয়েছে চাক্তাইর বিশাল মার্কেট। ভোররাত ৩টা ৩২ মিনিটের অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাই।

দ্রুততার সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ১০টি গাড়ি নিয়ে। সোয়া ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। এ সময়ে পুড়ে যায় বস্তির দুই শতাধিক ঘর। তবে আগুনের সূত্রপাত তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এতে দুই সহস্রাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। কারণ জানা যায়নি। আমরা প্রথমেই রাস্তায় বেষ্টনী দিয়ে সাধারণ লোকজনের প্রবেশ বন্ধ করে দেই। ফলে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়নি ফায়ার সার্ভিসকে। আশপাশে বেশ কয়েকটি মার্কেট ও পোশাক কারখানা আছে।

দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় সেগুলো রক্ষা পেয়েছে। তবে ৯টি তাজা প্রাণ চলে গেছে। পরে অবশ্য জানা যায় মৃতের সংখ্যা ৮। একটি দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

রোববার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাশহুদুল কবীরকে আহ্বায়ক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আলী আকবরকে সদস্য সচিব করে ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের একজন করে কর্মকর্তা আছেন। নিহতদের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়ারও ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে রহিমা খাতুন বস্তির সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সবাই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। একপর্যায়ে ঘরের ভেতরে রাখা কিছু জমানো টাকার কথা মনে পড়ে রহিমার।

মেয়ের বিয়ের জন্য একটু একটু করে জমানো টাকা আনতে ও সন্তানদের বের করে আনতে গিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আটকা পড়েন রহিমা। রহিমার প্রতিবেশী রুমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, ‘আগুন লাগার পর সবাই রহিমার চিৎকার শুনে জেগে উঠি।

তিনি পরে নিজের ঘরে যান মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা আনতে। আমি নিষেধ করেছি কিন্তু শোনেনি। শেষে তিন সন্তানসহ রহিমা পুড়ে মরেছে। যে আমাদের সবাইকে বাঁচাল অথচ সে-ই মারা গেল, এটাই আমাদের জন্য বড় আফসোস।’ রুমা বলেন, আমার মনে হচ্ছে শত্রুতা করে কেউ আমাদের বস্তিতে আগুন লাগিয়েছে।

একটি সূত্রের দাবি, সরকার বেশ কিছু দিন ধরেই কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে। উচ্ছেদের সঙ্গে আগুন লাগার যোগসূত্র থাকতে পারে। উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ সুযোগ নিয়েছে কিনা তদন্তে সে দিকটি খতিয়ে দেখা দরকার।

সূত্রটি বলছে, ৬ জনের নিয়ন্ত্রণে ছিল ৪ শতাধিক বস্তিঘর। এরা হল- আক্তার ওরফে কসাই আক্তার, ফরিদ সওদাগর, আবদুস সত্তার, মোরশেদুল আলম, বেলাল এবং ‘হুজুর’। কর্ণফুলী নদীর তীরে সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধ বস্তিঘর তুলে ভাড়া দিয়েছিল এরা।

খেটে খাওয়া ও দিনমজুরসহ নিুবিত্তের লোকজন কম ভাড়ার এই বস্তি খুঁজে নেন। এর মধ্যে কসাই আক্তারের দেড়শ’, ফরিদ সওদাগার ও সত্তারের দুই শতাধিক ও মোরশেদের নিয়ন্ত্রণে শতাধিক ঘর। অপর দুই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণেও বেশ কিছু ঘর রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, আগুনে অন্তত চারশ’ বস্তিঘর ভস্মীভূত হয়েছে। এতে অন্তত দুই সহস্রাধিক মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তবে ফায়ার সার্ভিসের দাবি- আগুনে দুই শতাধিক বস্তিঘর পুড়েছে। বাকিগুলো অক্ষত রয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শামসুল আলম বলেন, ‘বাইরে চিৎকার শুনে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। তালাবদ্ধ দরজার বড় আকারের ফাঁক গলে আমি কোনো মতে বের হতে পারলেও আমার স্ত্রী হাসিনা বেগম স্বাস্থ্যবান হওয়ায় তাকে টেনে বের করা যায়নি।

পরক্ষণে ঘরের চালা ভেঙে তার ওপর পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটে তার শরীর আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় আমার চোখের সামনেই।’ স্ত্রীকে হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ শামসুল পেশায় একজন দিনমজুর। তিনি জানান, ৬ বছর ধরে ওই কলোনির কক্ষটি মাসিক ১৮শ’ টাকায় ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলাম।

এগিয়ে এলেন মেয়র : দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম। মেয়র আগুনে সর্বস্ব হারানো বস্তিবাসীদের খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টানিয়ে থাকার ব্যবস্থা ও তিন দিনের খাবার সরবরাহের ঘোষণা দেন। তিনি এ ঘটনায় হতাহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×