বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য: নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই

রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন হলে ফল ভালো হয় না -ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ * স্বজনপ্রীতির জন্য নতুন ব্যাংকের অনুমোদন -ড. মইনুল ইসলাম * আমানতের সুদের চাপে ঋণের সুদ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে -এবিবি চেয়ারম্যান

  হামিদ বিশ্বাস ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে কয়েকটি নতুন ব্যাংকের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বিশেষ করে ফারমার্স ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাট ও ঋণ জালিয়াতির কারণে একপর্যায়ে ব্যাংকটি অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের আমানত পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছিল না।

দিশেহারা হয়ে বর্তমানে ব্যাংকটির নাম বদলে ‘পদ্মা ব্যাংক লি.’ রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোববার বেসরকারি আরও তিনটি নতুন ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে সোমবার কয়েকজন বিশেষজ্ঞ যুগান্তরকে বলেন, নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। কেন দিল, তার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হলে সেটার ফল খুব বেশি ভালো হয় না। আমি মনে করি, বর্তমানে যে ব্যাংকগুলো আছে, অর্থনীতির আকার অনুযায়ী তা যথেষ্ট।

তিনি বলেন, নতুন ব্যাংক নিয়ে অর্থমন্ত্রী কী বলেছেন, সেটা আমি জানি না। তবে আমি বলব, গ্রাহকদের জন্য নতুন কী সেবা পণ্য নিয়ে আসছে, এমন কী নতুনত্ব আছে যে আরও তিনটি নতুন ব্যাংক আসছে। চলমান নতুন ৯টি ব্যাংকের দিকে তাকালে বোঝা যাবে তাদের পরিস্থিতি কতটা খারাপ। পেশাদারিত্ব, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয় নতুন ব্যাংক পরিচালনার জন্য।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বেসরকারি খাতে আরও তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন এমন সময় দেয়া হল, যখন ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। জালিয়াতি ও লুটপাটে ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের আদালত থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বুধবার আদালত থেকে এক কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপিদের ঠিকানাসহ তালিকা চাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার এবং সেগুলো ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, সে বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়।

এছাড়া ২০ বছরে ব্যাংকিং খাতে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, সুদ মওকুফ সংক্রান্ত অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রয়োজন নেই। তবু স্বজনপ্রীতির জন্য নতুন ব্যাংক দেয়া হয়েছে। কাছের কিছু ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেয়ার জন্য এ উদ্যোগ। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতের টানাটানি আরও বাড়বে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সুদের হারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যাংকগুলোর যখন এমন দুরবস্থা, তখন নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ায় ফল কী দাঁড়াবে, সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি না বাড়ানো হলে এ খাতে আরও বিপর্যয় দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেননা এ সরকারের আমলে যে নতুন নয়টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে সেগুলোও জাল-জালিয়াতির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ফলে এগুলোর অবস্থাও নাজুক। এর আগে নতুন ব্যাংক এলেও ব্যাংকিং খাতে কোনো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারেনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নতুন তিনটি ব্যাংক দেয়ার যৌক্তিকতা নেই। অর্থনীতি বিবেচনার বাইরে গিয়ে ব্যাংক দেয়ার অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। জানা গেছে, বর্তমান সরকার নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে।

ব্যাংকগুলো হচ্ছে ইউনিয়ন ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, এনআরবিজি ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া এসব ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে।

অথচ কার্যক্রমে আসার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কবলে পড়েছে এসব ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হচ্ছে ফারমার্স ব্যাংকের। এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৭১ কোটি টাকা। আর ৩৫০ কোটি টাকা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে এনআরবিসি ব্যাংক এবং ২৩৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে মেঘনা ব্যাংক।

শুধু তা-ই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা থাকায় এবং প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে কিছু ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকে পড়ে। তারই মাশুল দিয়ে যাচ্ছে এখন। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়া তো দূরের কথা, কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এমনকি ফারমার্স ব্যাংক তো দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হওয়ার পর কোনোমতে একে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দক্ষ জনবল ও সুশাসন নিশ্চিত না করে নতুন ব্যাংক দেয়া আরেকটি ভুল হবে। এছাড়া বর্তমানে স্বল্প সুদে আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন ব্যাংকের কারণে আমানতে আরও চাপ বাড়বে। এতে ঋণের সুদ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন তিন ব্যাংকের কারণে ব্যাংকিং খাতে অসম প্রতিযোগিতা যেন না বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে অসুবিধা হবে না।

একটি ব্যাংকের সাবেক এমডি যুগান্তরকে বলেন, ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তা না করে আরও তিনটি নতুন ব্যাংক দেয়া এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে আমানত সংগ্রহে অসম প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে ঋণের সুদ আরও বেড়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় বেসরকারি খাতে আরও তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো হল- বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটিজেন ব্যাংক ও পিপলস ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশে তফসিলি ব্যাংক ৬২টিতে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×