বাংলা বর্ণমালার উৎসব পৃথিবী জুড়ে

  লুৎফর রহমান রিটন ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বইমেলা-২০১৯
বইমেলা-২০১৯

একুশের গ্রন্থমেলাকে আমরা বলি প্রাণের মেলা। এই প্রাণের মেলায় শামিল হতে প্রতিবছর আমি বারো হাজার তিনশ’ কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডা থেকে উড়ে আসি বাংলাদেশে।

একুশের গ্রন্থমেলা যেন বর্ণমালার উৎসব। নতুন বইয়ের পাতায় পাতায় বাংলা বর্ণমালার অপরূপ মিছিল আমাকে উদ্দীপ্ত করে। প্রাণিত করে। বাংলা ভাষার একজন লেখক হিসেবে আমি খুব গৌরব অনুভব করি।

কারণ আমি যে ভাষায় কথা বলি, যে ভাষায় লিখি, সেই ভাষার প্রতিটি বর্ণমালা ভাষাশহীদদের পবিত্র রক্তস্নাত বর্ণমালা। পৃথিবীর আর কোনো ভাষার আর কোনো লেখকের এ গৌরবটি নেই।

প্রতিদিন অজস মানুষ বইমেলায় আসেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশের হাতেই কোনো বই দেখা যায় না। এ নিয়ে অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করেন- বইমেলায় আসা মানুষেরা প্রত্যেকে যদি একটি করেও বই কিনতেন তাহলে মেলায় একটি বইও অবশিষ্ট থাকত না।

তাদের উদ্দেশে বলি- আমাদের বাংলা একাডেমির একুশের গ্রন্থমেলাটি নিছক বই কেনাবেচার মেলা তো নয়! বইমেলায় এলেই বই কিনতে হবে? বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় আসা মানে বাংলা-বাঙালি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে সৌহার্দ স্থাপন করা।

বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় আসা মানে চেতনাকে শানিত করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার চেতনা, বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় এলে চেতনার নবায়ন ঘটে। একুশ মানে মাথানত না করা। বাঙালির চিন্তা-চেতনায় মননে ও মেধায় এ মাথানত না করার মন্ত্রটি রোপণ করে দেয় একুশের গ্রন্থমেলা।

যত দূরেই যাক বাংলাদেশের বাঙালি, দেশ তার সঙ্গে সঙ্গে যায়। প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ে বাংলাদেশ থাকে অষ্টপ্রহর। বাংলাদেশকে বুকে নিয়েই সে ঘুমায়, জাগে। শরীরটা প্রবাসে থাকলেও মন তার পড়ে থাকে প্রিয় বাংলাদেশেই। কায়ার সঙ্গে ছায়া হয়ে জড়িয়ে থাকে প্রিয়তম স্বদেশ, দিবানিশি।

অভিবাসী বাঙালি বাংলা ভাষাকে তার প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে লালন করে পরম মমতায়। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে- সিংহভাগ বাঙালির পারিবারিক ভাষাটা এখনও বাংলা। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বাস করলেও বাংলাদেশের আদলে একুশে ফেব্রুয়ারি রাত বারোটায় তারা শহীদ মিনারে যান পুষ্পস্তবক হাতে।

গেল বছরের ১৩ অক্টোবর বিকালের যাই যাই রোদের একেবারে শেষ বিভাটুকু ফুরিয়ে যাওয়ার লগ্নে হিউস্টনের ক’জন বন্ধু আমাকে নিয়ে গিয়েছিল হিউস্টন শহরের রেন রোডের সাইনটের কর্নারে নাইজেরিয়ান চার্চের পাশে বাংলাদেশ সেন্টারের সবুজ ঘাসের চত্বরে।

এখানকার স্বপ্নবান বাঙালিরা বাংলাদেশ আমেরিকান সেন্টারের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেশ ক’বছর আগে। অতঃপর ৩-৪ একর জমি তারা কিনে নিয়েছিলেন, দৃশ্যমান একটা বাংলাদেশ সেন্টার গড়বেন বলে।

বিশাল জায়গাটা প্রায় অব্যবহৃতই পড়ে আছে এখনও। তবে সেখানে মাথা উঁচু করে গৌরবের সৌরভ ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেছে শ্বেতশুভ্র শহীদ মিনার। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে।

২০০৯ সালে এ শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছে। নিউইয়র্কবাসী শিল্পী ও ভাস্কর তানভীর সারওয়ার রানার মমতা আর দক্ষতার মিশেলে নির্মিত হয়েছে চমৎকার এ স্থাপনাটি।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে মিনারের পেছনে টুকটুকে লাল সূর্যের বৃত্তটিও বাদ যায়নি। মূল মিনারের সঙ্গে শাদার প্রেক্ষাপটে কালো অক্ষরে চিত্রিত হয়েছে- ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ’মরি বাংলা ভাষা।’

পেছনে উডেন সীমানাপ্রাচীরে মোটা ব্রাশের নিপুণ টানে শিল্পী রানা শাদা রঙের দ্যুতিময় বিন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলা ভাষার অপরূপ বর্ণমালার নিদর্শনগুলো। অ আ থেকে চন্দ্রবিন্দু এবং আকার একার ওকার হ্রস্ব উকার থেকে যতি চিহ্নের সব ক’টা অবয়ব যেন বা অপূর্ব সিম্ফনি তুলে সম্মিলিত কণ্ঠে ঘোষণা করছে আমাদের ভাষা শহীদদের অমর কীর্তিগাথা।

এখানেই দেখা হল অলি মোহাম্মদ নামের এক দেশপ্রেমিক বাঙালির সঙ্গে। ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিবাস ছিল একদা। দেশ ছেড়েছেন ১৯৮৪ সালে। হিউস্টন শহীদ মিনার কমিটির চেয়ারম্যান তিনি।

অলি মোহাম্মদের মতো বাঙালিরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আছেন বলেই আমাদের অস্তিত্বের আমাদের চেতনার আমাদের পরিচয়ের স্মারক একুশের শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে টোকিওতে, নিউইয়র্কে, নিউজার্সিতে এবং সিডনিতে। কানাডার টরেন্টোতেও নির্মিত হচ্ছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের গৌরব এ শহীদ মিনার।

সন্ধ্যার আগমনির আবছা হয়ে আসা আলোয় বাংলাদেশ সেন্টারের শান্তসৌম্য মাঠে একুশের ভাষাশহীদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের পাশাপাশি আমার মস্তিষ্কে অনুরণিত হচ্ছিল আরও কয়েকটি নাম- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, হামিদুর রহমান, নভেরা- আহা কী উজ্জ্বল থোকা থোকা নাম! নক্ষত্রপ্রতীম এই নামগুলো এবং তাদের মুখচ্ছবি আমার চারপাশে কেমন ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল।

হিউস্টনের সেই বিকালটায় চমৎকার মৃদু ঠাণ্ডার ছোঁয়াচ লাগানো একটা বাতাস বইছিল, এলোমেলো। সেই বাতাসে কেমন একটা বিষণœতার প্রলেপ মাখানো ছিল। আর সেই বিষণ্ণ বাতাসের সঙ্গে আলতাফ মাহমুদের করুণ অর্কেস্ট্রা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

চার্চসঙ্গীতের আবহে পিয়ানো এবং ভায়োলিনের অভূতপূর্ব সম্মিলনিতে আলতাফের সুরের মূর্ছনায় হিউস্টনের বাতাস আমার কানে কানে গেয়ে উঠছিল রক্তে শিহরণ জাগানিয়া গান- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি...। অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

ঘটনাপ্রবাহ : বইমেলা ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×