একুশ অনিঃশেষ চেতনা প্রবাহ

  হাসান আজিজুল হক ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একুশ বাঙালির বিদ্রোহী সত্তার প্রথম বহিঃপ্রকাশ। এমনকি দুই বাংলার ইতিহাসেও। ১৯০৫-এ যখন বঙ্গভঙ্গ হল, তখনও আন্দোলন হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য। তাতে অনেক বড় বড় লেখক, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁরা সব প্রতিবাদ করেছিলেন, অংশগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১১-তে বঙ্গভঙ্গ রদ হল। তখন তো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা সব একসঙ্গে ছিল- এগুলোকে আলাদা আলাদা, খণ্ড-বিখণ্ড করাই ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের একটা পরিকল্পনা। বাংলাকে খণ্ড খণ্ড করে নিলে সুবিধা হবে শাসন করতে, এটাই ছিল তাদের লক্ষ্য। বাঙালি সেটা মানেনি। আমরা সেই বঙ্গভঙ্গের চক্রান্ত মানিনি। ১৯৪৭-এ যে দেশ বিভক্তি হল। তাও তো জনগণের সম্মতিতে হয়নি। ১৯০৫-এর সাম্রাজ্যবাদীদের কৌশলী যে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল ১৯৪৭-এ তারা সেই পরিকল্পনাটাকেই উপমহাদেশের মানুষের কাঁধে জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দিয়ে গেল। বলা যায়, তারা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে উপমহাদেশ ত্যাগ করল। তাদেরকে রাজনীতির এ মারপ্যাঁচের কাজে সহযোগিতা করল নেহেরু; তার সঙ্গে সঙ্গে প্যাটেল এদিকে জিন্নাহ্ প্রমুখ উপমহাদেশীয় রাজনীতিকরা। প্যাটেল তো আরও অনেক কিছু চেয়েছিল- ‘এক্সচেঞ্জ অব হিন্দুস অ্যান্ড মুসলিমস’- হলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত! মাঝে মাঝে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তার অনেক সাক্ষ্য রয়ে গেছে।

এসব কণ্টকাকীর্ণ ইতিহাস পেরিয়ে এসে ১৯৫২ সালে বাঙালি তার আসল রূপ দেখাল- পাকিস্তানি শাসকদের গণবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে, বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সেদিন বাঙালি তরুণদের রক্তে শুধু ঢাকার রাজপথই রঞ্জিত হয়নি- মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনায় সেদিন সারা বাংলাদেশের মানুষ রঞ্জিত হয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালি জাতির বিদ্রোহী চেতনায় রঞ্জিত হওয়ারও দিন। রক্ত দিয়ে যেমন বাংলাভাষা, বাংলাদেশের নাম লিখেছি আমরা বাঙালিরা একই সঙ্গে বিদ্রোহী চেতনার অক্ষরেও লিখেছি বাংলাদেশের নাম। আর একুশ সেই চেতনার অক্ষরে লেখা বলেই সে আজ স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। একুশ আজ আর শুধু আমাদের নয়- সারা পৃথিবীর মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষের। একুশ আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। পৃথিবীর সব জাতিকে তার মাতৃভাষার মার্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার দিন। মাতৃভাষাকে ভালোবাসার দিন।

একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিকে সামনে রেখে আমাদের দেশে যে মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন হয়ে থাকে সেটা সব মিলিয়ে একটা সাংস্কৃতিক উৎসব- আমাদের প্রাণকে স্পন্দিত করে। এক সময় খবুই ছোট্ট পরিসরে একজন প্রকাশক, মুক্তধারার শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা, সামান্য কয়েকটি বই নিয়ে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানের পাশে বসে বই বিক্রির যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য প্রকাশক, লেখক এবং পাঠকদের সম্মিলিত আগ্রহ ও ঐকান্তিকতায় বর্তমানে একটা মহীরুহে পরিণত হয়েছে বইমেলা। এ আয়োজন আমাদের আবেগকে সংহত করছে। আমাদের জীবন চর্চার ভেতর একুশের চেতনাকে সঞ্চারিত করছে। মাতৃভাষার প্রতি দায়িত্ব, মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব, সর্বোপরি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা নানাভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে। একুশের বইমেলা শুধু ঢাকা শহরে আবদ্ধ নেই আজ। দেশের আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে তো হচ্ছেই, হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও। যেখানেই বাঙালিরা আছেন, বাংলাভাষীরা আছেন, সেখানেই একুশ তাদেরকে এক অচ্ছেদ্য সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করছে।

একুশের মেলা এক অনিঃশেষ চেতনা প্রবাহ বলে আমি মনে করি। এটা একটা প্রবাহের মতো কখনও আটকাবে না, বদ্ধ হয়ে যাবে না; নিত্যনতুন পানি এসে, চারপাশ থেকে পানি এসে ঢুকে নদীর মূল প্রবাহকে যেমন স্ফীত, দুরন্ত গতিবান করে, দিগন্ত ছাপিয়ে যায়; তেমনই একুশের চেতনা ক্রমাগত বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হবে।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির অস্তিত্বের জায়গা। কেননা বাংলা ভাষাই আমাদের অস্তিত্ব। বাংলা ভাষাই আমাদের পরস্পরের মধ্যে একান্ত আপনতা তৈরি করে দেয়। একুশ শতকে বাঙালি জাতির সেই আপনতা আত্মীয়তায় বোধ পৃথিবীব্যাপী মানবিকতার বার্তা ছড়ানোর উপযোগী করে তোলা প্রয়োজন। আর সেজন্যই বাংলা ভাষার সাহিত্য, সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা ও প্রসারের উদ্যোগ চাই। চাই জাতিতে জাতিতে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উদ্যোগ। একুশের চেতনা হোক দেশে এবং পৃথিবীব্যাপী মানবিক বোধের উন্মেষের চেতনা। অনুলিপি : শুচি সৈয়দ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×