প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও উপেক্ষিত

অবকাঠামো পরিবর্তন ছাড়া পুরান ঢাকার দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয় : ফায়ার সার্ভিস * রি-ডেভেলপমেন্ট ফর্মুলায় পুরান ঢাকার ঝুঁকি কমিয়ে বাসযোগ্য করা সম্ভব : রাজউক

  মতিন আব্দুল্লাহ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

যখনই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তখনই তৎপর হয়ে ওঠেন প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নেয়া হয় নানা কর্মসূচি ও পদক্ষেপ। ঢাকঢোল পিটিয়ে কিছুদিন মহাব্যস্ত সময় কাটান তারা।

এরপর ঝিমিয়ে পড়ে সবকিছু। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নেয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। কর্তৃপক্ষ বলছে - এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হবে সব কেমিক্যাল গোডাউন। যেটি বলা হয়েছিল ২০১০ সালের ৩ জুনের নিমতলীর ট্র্যাজেডির সময়ও।

ওই ঘটনায় আগুনে পুড়ে মরেছিল ১২৪ জন। তখন বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রীও বেশকিছু সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু অদ্যাবধি সেটি উপেক্ষিত। রহস্যজনক কারণে এখনও তা বাস্তবায়ন করেননি প্রশাসনের কেউ।

লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ নিয়েই শেষ করেছেন তাদের দায়িত্ব। নির্বিঘ্নে আগের মতোই ঝুঁকি নিয়ে চলেছে রমরমা কেমিক্যাল ব্যবসা। এতে যা হওয়ার তা-ই হল। বুধবার নিমতলী থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে চুড়িহাট্টায় ঘটল একই ধরনের অগ্নিকাণ্ড। ফের আগুনে ঝরলো তরতাজা ৭৮ প্রাণ। ইতিহাসের ভয়াবহতম এ দুই অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হল ২০২ জনের।

সে ফ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই মূলত এ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শুধু পুরান ঢাকাই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ১৭৪টি হাসপাতালও আছে মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে।

এ ঝুঁকির কথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স প্রায় দেড় বছর আগে উত্থাপন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এরই মধ্যে ঘটে গেছে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না অগ্নিকাণ্ডের প্রতিরোধমূলক নির্দেশনা। এখনই এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া না হলে যে কোনো মুহূর্তে আরও বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিমতলীর ট্র্যাজেডির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, পরিকল্পিতভাবে কেমিক্যাল শিল্পজোন করে পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নিতে হবে।

পাশাপাশি দাহ্য কেমিক্যাল আনা-নেয়া বন্ধসহ নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিগত সাড়ে আট বছরেও প্রধানমন্ত্রীর সেসব নির্দেশনার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।

এখনও প্রকাশ্যে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ব্যবসা চললেও নির্বিকার রয়েছে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। নিমতলীর ঘটনার পর কিছুদিন কেমিক্যাল কারখানার ট্রেড লাইসেন্স বন্ধ ছিল।

কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ওইসব কেমিক্যাল কারখানার ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর ৫টি প্রতিষ্ঠানকে এই ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হয়।

এক্ষেত্রে শর্ত দেয়া হয়েছে ক্ষতিকারক ২৯টি দাহ্য পদার্থ এসব কারখানায় বিক্রি করা যাবে না। এটা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার পর তারা যে দাহ্য কেমিক্যাল ব্যবহার করবে না, সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এ কারণে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ব্যবসা একেবারে বন্ধ করতে হবে। সেটা করা সম্ভব না হলে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি জনপদে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে থাকবে বলে শঙ্কা তাদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরান ঢাকাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করতে হলে বর্তমান অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আর কেমিক্যাল কারখানাসহ ক্ষতিকর কারখানাগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। এজন্য উন্নত বিশ্বের আদলে রি-ডেভেলপমেন্ট ফর্মুলার প্রয়োগ করে নতুন করে পুরান ঢাকাকে গড়ে তোলা সম্ভব।

২০১০ সালের ৩ জুনের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় নিমতলীর কেমিক্যাল কারখানায় ঘটেছিল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ওই ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রাণ হারান ১১৭ জন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও ৭ জন।

সবমিলিয়ে ওই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৪ জন। ঘটনার সময় মুহূর্তেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চারদিকে পড়ে ছিল লাশগুলো। ওই ঘটনার দু’দিন পর রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।

ঘিঞ্জি অলিগলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা বা শিল্পকারখানা কতটা বিপজ্জনক, সাড়ে আট বছর আগে তা দেখেছে মানুষ। কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেয়নি কেউ। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পর ৮০০ রাসায়নিক গুদামের তালিকা করা হয়। কিন্তু সেসব অপসারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।

বুধবার ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কেমিক্যাল গুদামের অগ্নিকাণ্ডে আরেকবার চরম খেসারত দিতে হল নিরীহ-নিরপরাধ ৭৮ জনকে। আহত শতাধিক। ঘটনাটি ঘটেছে নিমতলী থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের চকবাজারের চুড়িহাট্টাতে।

প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, ট্রান্সফরমার বা গাড়ির সিল্ডিার বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুন কেমিক্যাল গুদামে ছড়িয়ে আগুনের লেলিহান শিখা আশপাশের কয়েকটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে।

চকবাজারের ওই এলাকাটি মূলত প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল বেচাকেনার কেন্দ্র। কেমিক্যাল গুদাম ও সুগন্ধি কারখানাগুলোর কারণে আগুনের ভয়াবহতা বাড়িয়েছে।

পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক জরিপ বলছে, পুরান ঢাকায় এখনও ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। যেগুলোয় দাহ্য পদার্থ গুদামে রাখা হয়। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার গুদাম আবাসিক ভবনের মধ্যে।

ডিএসসিসির হিসাব অনুযায়ী, মাত্র আড়াই হাজারের কেমিক্যাল কারখানার ট্রেড লাইসেন্স ছিল, সেগুলোরও নবায়ন বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে কত কেমিক্যাল গুদাম রয়েছে, তারও কোনো তথ্য জানা নেই ডিএসসিসির।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের বলেছেন, পুরান ঢাকায় কোনো কেমিক্যাল গুদাম রাখা হবে না। এসব কেমিক্যাল গুদাম কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে, সে লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

আর ডিএসসিসি সেমাবার থেকে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম অপসারণের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করেছে, এটা অব্যাহত থাকবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠিরশিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তর করার জন্য কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল শিল্পজোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

এরই মধ্যে আমরা শিল্পজোনের সাইট নির্বাচন করেছি, এখন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ডিসি অফিসের দায়িত্ব জমি অধিগ্রহণ কাজ, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে আমরা সবার্ধিক গুরুত্ব দিয়ে কেরানীগঞ্জের কেমিক্যাল শিল্পজোন তৈরির কাজ পরিচালনা করব।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেছেন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়েছে।

পুরান ঢাকাকে অবকাঠামোগতভাবে নতুন করে সাজাতে না পারলে অদূরভবিষ্যতে এ এলাকার মানুষকে আরও বেশি মূল্য দিতে হবে। আবাসিক এলাকায় বেআইনিভাবে প্লাস্টিক দানা ও কেমিক্যালসহ বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যেসব পদার্থ নিজ থেকেই বিস্ফোরকে পরিণত হচ্ছে। এখনই এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া না হলে যে কোনো মুহূর্তে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব নয়। দুর্যোগে এ এলাকা যে কত ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে, তা সবার কাছে পরিষ্কার।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের পক্ষ থেকে আমরা পুরান ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ফর্মুলা উপস্থাপন করেছি। এটা স্থানীয় জনগণসহ জনপ্রতিনিধিদের কাছেও উপস্থান করেছি। এ ফর্মুলা বাস্তবায়িত হলে পুরান ঢাকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হতে পারে।

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×