কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ

পথচারী, যাত্রী-চালকও রেহাই পাননি * প্রাণোচ্ছল এলাকায় শোকের আহাজারি

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কাজী জেবেল ও আহমদুল হাসান আসিক

পুরে ছাই বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা ও আবাসিক ভবন। ছবি-যুগান্তর

পুরান ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম চকবাজারের চুড়িহাট্টা সড়কে রয়েছে নানা পণ্যের মার্কেট, গোডাউন, ফার্মেসি ও বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা ও আবাসিক ভবনও রয়েছে।

বুধবার রাতে চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনের পাঁচ রাস্তার সংযোগস্থলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিকট শব্দ হওয়ার পরপরই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের মুহুর্মুহু শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে ৮১ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় দিগ্বিদিক ছুটে অসংখ্য মানুষ প্রাণে বাঁচলেও দগ্ধ ও আহত হয়েছেন।

ভয়াবহ আগুনে চুড়িহাট্টা সড়কের অন্তত পাঁচটি ভবন পুড়ে গেছে। রাস্তায় থাকা অর্ধশতাধিক গাড়ি পুড়ে গেছে। মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানায়, হঠাৎ সৃষ্ট আগুনে কোলাহলপূর্ণ চুড়িহাট্টা যেন মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগুন লাগার পর ফোন করা হলেও দ্রুত আসেনি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তবে ফায়ার সার্ভিসের বিপুল সংখ্যক সদস্য আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। তারাই বের করে আনেন একের পর এক লাশ। তাদের সহযোগিতা করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও বাসিন্দারা।

আগুনের ভয়াবহতা সম্পর্কে চুড়িহাট্টা সড়কের ‘হোটেল আনাস’- এর কর্মচারী মো. আলী বলেন, এ সময় তিনি হোটেলের দোতলায় কর্মচারীদের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাত ১০টার কিছু সময় পর হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে তিনি বাইরে তাকিয়ে দেখেন আগুনের লেলিহান শিখা।

নিচে আগুনের কুণ্ডলি দেখে তিনি ছাদে চলে যান। এরপর হোটেলের ধোঁয়া বের হওয়ার পাইপ বেয়ে নিচে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, বিকট শব্দের পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো এলাকায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সব কিছুই নিমেষে শেষ হয়ে যায়।

হোটেলের আরেক কর্মচারী হাসান বলেন, আমিও একইভাবে ছাদে উঠি এবং উঁকি দিয়ে নিচের অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। তিনি বলেন, এ সময় পাশের ভবনের ১০-১২ বছরের একটি ছেলে নিচের দিকে উঁকি দিতেই নিচে পড়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে তার চোখ ছানবড়া হয়ে যায়। এরপর ভবনের কার্নিশ ধরে ধরে নিচে নেমে আসি।

তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে হাতে ধরে বাঁচিয়েছেন। নইলে অন্যদের মতো আমিও পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতাম। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার সময় চুড়িহাট্টা মসজিদ মোড়ে যানজটে একটি বিয়ের গাড়িও আটকে ছিল। যানজটের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে হেঁটে চলাও মুশকিল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, চুড়িহাট্টা মোড়ে অবস্থিত চারতলা ভবন ওয়াহেদ মঞ্জিল। এ ভবনের নিচতলায় রয়েছে প্লাস্টিকের গুদাম। দোতলায় রয়েছে বডি স্প্রেসহ বিভিন্ন পারফিউমের গোডাউন। তিন ও চার তলাতেও কেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন পণ্যের গোডাউন।

আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া ফায়ার ফাইটার আজিজুল ইসলাম বলেন, ওয়াহেদ মঞ্জিলের ঢোকার সরু পথেই ছিল ২৪ জনের মৃতদেহ। একটা লাশের ওপর ছিল আরেকটা লাশ। আগুন ছড়িয়ে পড়ায় এসব হতভাগ্য ব্যক্তি সেখানে আটকে পড়েছিলেন। তারা আগুনে পুড়ে মরেনি। তবে সবাই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনের তাপে সিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ওই ভবনের সামনের রাস্তায়ও পড়েছিল একের পর এক লাশ। এগুলো আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশ। কোনো কোনো লাশ আবার রিকশা বা ভ্যানের নিচে চাপা পড়েছিল। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন হাত-পা। এ এক বীভৎস দৃশ্য। এ যেন এক মৃত্যুপরী।

ছলছল চোখে আজিজুল আরও বলেন, মোড়ে একটি ভ্যানের নিচে চাপা পড়েছিল দুটি লাশ। এমনভাবে পুড়েছে দেখে চেনার উপায় নেই এগুলো মানুষের লাশ। গলে যাওয়া প্লাস্টিকে লাশ দুটি আটকে ছিল।

উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক মো. বশির উদ্দিন বলেন, ওয়াহিদ ম্যানসনের পশ্চিমপাশে মদিনা ফার্মেসির ভেতর থেকে ভোরে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। মাটিতে বসা এসব মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছিল। তারা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চকবাজারের চুড়িহাট্টা জামে মসজিদের সামনের মোড়ে বিভিন্ন দিক থেকে পাঁচটি সরু গলি এসে মিশেছে। অগ্নিকাণ্ডে মোড়টি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে এ মোড়ের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ৩০টিরও বেশি লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। মোড়ের দক্ষিণ পাশে চারতলা ওয়াহিদ ম্যানসনের দোতলায় ছিল কেমিক্যালের গোডাউন। ওই ভবন থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ওয়াহিদ ম্যানসনের নিচতলায় একটি ডেকোরেটরের দোকান, একটি মোবাইল রিচার্জের দোকান এবং বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক দানার দোকান ছিল। ওই ভবনের পাশের একটি ছয়তলা ভবন, উল্টোপাশে দুটি চারতলা ভবন এবং পশ্চিম পাশে আরেকটি দোতলা ভবনে আগুন লাগে। এতে ওয়াহিদ ম্যানসন ও উল্টোপাশের চারতলা ভবন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বৃহস্পতিবার ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়।

তাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশ, রোভার স্কাউট ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের। সেখানে স্বজনরা প্রিয়জনের খোঁজ করছিলেন। তাদের কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। ওয়াহেদ ম্যানসনের উল্টো পাশের ভবনের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেতরে তেমন ক্ষতি হয়নি।

সেখানে ড্রামের পর ড্রাম ভর্তি কেমিক্যাল ছিল। ওই ভবনে ঢুকতেই প্রচণ্ড ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, ওই ভবনের ভেতরে আগুন ঢুকলে তীব্রতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ত।

ঘটনাস্থলে দেখা যায়, বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পিকআপ, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, রিকশা ও ঠেলাগাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আশপাশের ভবন থেকে ধসেপড়া ইটও ছিল রাস্তায়। এমনকি বডি স্প্রে, এয়ার ফ্রেশনার, বেবি পাউডার এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের কাঁচামাল (দানা) পড়েছিল রাস্তায়।

উত্তর দিক থেকে আসা গলির মুখে একটি প্রাইভেটকারের ধ্বংসস্তূপ পড়েছিল। এর সামনে দুটি অটোরিকশা, চারটি রিকশার ধ্বংসাবশেষ ছিল। মসজিদের সামনে মোড়ের ঠিক মাঝখানে একটি প্রাইভেটকার ও একটি পিকআপের ধ্বংসাবশেষ পড়েছিল।

দক্ষিণ দিকের গলির মুখে শত শত কেমিক্যালের বোতল পড়েছিল। ওই গলির মুখে পড়েছিল প্লাস্টিকের দানা। সবজি ও পেঁয়াজ দেখিয়ে স্থানীয় রহিম শেখ বলেন, মসজিদের সামনের ফুটপাতে একজন সবজি বিক্রি করত। কয়েকটি ডিম দেখিয়ে তিনি বলেন, এখানে একজন ডিম বিক্রি করতেন। জানি না তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে।

এক মিনিটেই সব শেষ : প্রত্যক্ষদর্শী আশিক উদ্দিন সৈনিক বলছিলেন, ঘটনার সময় তিনি পূর্বদিকের গলির মুখ থেকে একটু দূরে ছিলেন। হঠাৎ করে বিকট শব্দ হয়। তাকিয়ে দেখি, একটি পিকআপ ভ্যান শূন্যে উড়ছে। এরপর আগুনের ফুলকি দেখতে পাই।

কেমিক্যালের গোডাউনে একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছিল। এক মিনিটের মধ্যেই চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দৌড়ে সেখান থেকে সরে যাই। যারা যানজটে আটকা পড়েছিলেন তারা কেউই বের হতে পারেনি। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়েছে, যা কল্পনারও বাইরে।

ভিড় ঠেলে বাবাকে খুঁজছেন নাসরিন : অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় ঠেলে বাবা জয়নাল আবেদিন বাবুলকে খুঁজছিলেন মেঝ মেয়ে নাসরিন আক্তার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা নাসরিনের হাতে ছিল বাবার ছবি।

বিভিন্নজনকে সেই ছবি দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বন্ধুর ফোন পেয়ে বুধবার রাত ১০টার দিকে তার বাবা চা খেতে এসেছিলেন চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনে। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতাল ঘুরেও বাবার সন্ধান পাননি। বাবাকে খুঁজে দিতে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে তিনি অনুরোধ করেন।

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত নিয়ে বিতর্ক : কীভাবে আগুন লাগল- গাড়িতে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার, নাকি রেস্তোরাঁর গ্যাস সিলিন্ডার, নাকি দাহ্য পদার্থ থেকে এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও লোকজনের মধ্যে ছিল বিতর্ক।

ঘটনাস্থলের ৫০০ গজের মধ্যে উর্দু রোডের ব্যবসায়ী মো. শামিম বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে না থাকলেও লোকমুখে শুনেছেন গাড়ির সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ওই সময়ে প্রচণ্ড যানজট ছিল। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুনে পুড়ে যানজটে থাকা যাত্রীরাও মারা গেছেন।

আরেক ব্যবসায়ী মো. আবদুস সালাম বলেন, ওয়াহেদ ম্যানসনের দোতলায় থাকা বডি স্প্রে ও পারফিউমের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ওই ভবনের নিচে থাকা গাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তীব্রতা আরও বাড়ে। প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক মো. ফয়সাল বলেন, সিলিন্ডারবাহী গাড়ি থেকে বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে আগুন লাগে। মুহূর্তেই সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।