কাতর চোখ মর্গে খোঁজে প্রিয়মুখ

আহাজারি, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছোটাছুটি * ৩৮ লাশ শনাক্ত, ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত করা হবে বাকিদের : ডা. সোহেল মাহমুদ * ‘মেয়েটা যেন না ঘুমায়, আমি ওষুধ আনতেছি’

  ইকবাল হাসান ফরিদ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বজনদের আহাজারি
স্বজনদের আহাজারি। ছবি-যুগান্তর

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের পর নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে। এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন দগ্ধ অন্যরাও। তাদের খোঁজে এখানে ভিড় করছেন স্বজন।

বিশেষ করে মর্গে থরে থরে সাজানো লাশ থেকে প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে আকুল হয়ে আছেন তারা। একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে প্রিয় মানুষটিকে চিনতে না পারা- কোনোমতেই নিজেদের সামলে রাখতে পারছেন না। উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, গড়াগড়ি খাচ্ছেন মাটিতে। কান্না আর আহাজারিতে বৃহস্পতিবার সারা দিন ভারী ছিল এখানকার বাতাসও।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডিউটি অফিসার রাসেল শিকদার বিকালে যুগান্তরকে জানান, চুড়িহাট্টায় দগ্ধ হয়ে ৮১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৭০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর ৬১ জন পুরুষ, পাঁচজন নারী ও চারজন শিশু। সব লাশই পাঠানো হয়েছে ঢামেক হাসপাতাল মর্গে।

ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বিকালে যুগান্তরকে বলেন, আমরা এ পর্যন্ত ৬৮ জনের লাশ পেয়েছি। এ পর্যন্ত ৩৮ জনের লাশ স্বজন শনাক্ত করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে এসব লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ডা. সোহেল বলেন, যেসব লাশ মর্গে এসেছে, সেগুলোর অধিকাংশ এতটাই পুড়ে গেছে যে এদের শনাক্ত করা কঠিন। এরপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। তাও সম্ভব না হলে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সেক্ষেত্রে একটু সময় লাগবে।

মর্গ চত্বরে মজিবর হাওলাদারের লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন তার ছেলে মামুন। থেকে থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। একটু পরপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। চেতনা ফিরলেই আহাজারি করছেন, ‘বাবা তুমি কেন কাল কাজের পরেও বাড়ি ফিরলা না।’ পাশেই নিথর দাঁড়িয়ে রয়েছেন মামুনের আরেক ভাই। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

সন্তানের লাশের জন্য আহাজারি করছেন রাজীব মৃধা। আগুন লাগার ১০ মিনিট আগেও ছেলের সঙ্গে কথা হয় মোবাইল ফোনে। রাজীব মৃধার একই কথা, ‘আমার ছেলে মরতে পারে না। আমার ছেলে কই?’ আছিয়া বেগম হারিয়েছেন ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইকে। মোবাইল ফোনে ছবি দেখিয়ে আহাজারি করছেন। বলছেন, ‘আমার ভাইডারে আনে দাও। আমার ভাই স্কুলে যাবে।’ তাসলিমা আক্তার হারিয়েছেন তার ২ দুই ভাই ও ভাইয়ের ২ বাচ্চাকে। তখন পর্যন্ত লাশ শনাক্ত করতে পারেননি তিনি। ভাইয়ের খোঁজে এসেছেন কাজী এনামুল হক। লাশ শনাক্ত করতে পারেননি তিনিও।

বুধবার মধ্য রাত থেকে চাচা কাজী এনামুল হক অভির খোঁজে মর্গ ও জরুরি বিভাগে চারবার এসেছেন কাজী জহির। তিনি জানান, তার চাচা সিটি কলেজ থেকে বিবিএ পাস করে রূপালী লাইফ ইনসুরেন্সে চাকরি করছিলেন। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড়কাটারা মাদ্রাসার ছাত্র মো. আতাউর রহমান বলেন, আমার ওস্তাদ (শিক্ষক) মাওলানা ওমর ফারুকের খোঁজ পাচ্ছি না।

মর্গের সামনে কথা হয় শাহাদত হোসেনের সঙ্গে। ছোট ভাই আনোয়ার হোসেনকে (৩৫) খুঁজতে এসেছেন তিনি। জরুরি বিভাগের সামনে টাঙানো আহতদের তালিকা কিংবা মর্গে রাখা লাশ- কোথাও তিনি পাচ্ছেন না ভাইয়ের সন্ধান। শাহাদত হোসেন জানান, তাদের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে।

এক ছেলে ও এক মেয়েসহ পরিবার নিয়ে আনোয়ার থাকতেন পুরান ঢাকায়। মেয়েটা অসুস্থ ছিল। বুধবার রাতে বাসায় ফেরার পথে মেয়ের জন্য ওষুধ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার। বাসায় কথাও বলেন তিনি। ফোন করে বলেন, ‘মেয়েটা যেন না ঘুমায়, আমি ওষুধ আনতেছি।’ ওষুধের দোকানেই ছিলেন তিনি। সেই দোকান থেকে আর বের হতে পারেননি। সেখান থেকে বের হয়েছে তার লাশ।

হাজী বান্নু রোডে থাকতেন নোয়াখালীর শাহীন (৪৫)। বিভিন্ন পণ্যের ‘ব্রোকার’ হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার সন্ধানে ঢামেক মর্গে এসেছেন স্ত্রীর বড় ভাই আকতার হোসেন।

চকবাজারে কাজ শেষে তিন ভাই অপু, আলী ও ইদ্রিস দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এক বন্ধুর ফোন পেয়ে ছোট ভাই ইদ্রিস দোকানের চাবি বড় ভাইদের বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যান। পাশেই খেলা করছিল বড় ভাই অপুর (৩২) তিন বছরের ছেলে আরাফাত। এমন সময় ঘটে বিস্ফোরণ, ছড়িয়ে পড়ে আগুন। মারা যায় পরিবারের তিন সদস্যই।

বুধবার রাত ৩টার ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ উদ্ধার করতে গিয়ে অপু ও আলীর মরদেহ আলাদা করতে পারেননি উদ্ধারকারীরা। তারা দু’জন একে অপরকে জড়িয়ে ছিলেন। এ অবস্থায়ই একটি বডি ব্যাগে (মরদেহ যে সাদা ব্যাগে বহন করা হয়) করে ঢামেকে পাঠানো হয়।

হাসপাতালে পাঠানোর পর দেখা যায়, দুই ভাইয়ের মরদেহের মাঝে রয়েছে শিশু আরাফাতের লাশ। চিকিৎসকদের ধারণা, ‘আগুনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই হয়তো দুই ভাই আরাফাতকে মাঝে রেখে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।’ লাশ শনাক্ত করে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইদ্রিস। জানান, ওয়াহিদ মঞ্জিলে তাদের কেমিক্যালের দোকান ছিল।

ফিরোজ নামে এক যুবক জানান, বুধবার রাতে আগুল লাগা ভবনের পাশে হায়দার মেডিকেল ডিসপেনসারিতে তার ভাই হীরা পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আগুনে তারা সবাই সেখানে আটকা পড়েন। স্থানীয় লোকজন বলেছেন, হায়দার মেডিকেল থেকে কয়েকটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব লাশ এখন কোথায় আছে, কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। হীরার বাকি পাঁচ বন্ধুর নাম জানাতে পারেননি ফিরোজ।

মো. সেলিম নামের একজন বন্ধু রেজাউল ইসলামকে খুঁজছেন। রেজাউল আহত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন সেলিম। রেজাউল ওয়্যার হাউসে কাজ করেন। তার বাড়ি কেরানীগঞ্জে।

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×