আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

জনগণ ভালো থাকলে কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন

বাঙালি বিশ্বে মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেয়া জাতি * জনগণের যে আস্থা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছি তা রক্ষা করতে হবে * মনোনয়ন বাণিজ্য করে তারা ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে কিভাবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ একটু ভালো থাকলে কিছু মানুষ আছেন যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। দেশে যদি কোনো ‘মার্শাল ল’ জারি হয়, অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতা দখল করে, তখন এ গোষ্ঠী খুবই ফুর্তিতে থাকে, তাদের মূল্য বেড়ে যায়।

জনগণের মূল্য তাদের কাছে কিছু না। একটু ক্ষমতার বাতাসের আশায় তারা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় ব্যস্ত থাকে। জনগণের যে আস্থা নিয়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি তার মর্যাদা রাখতে হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধারা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শুরুতে প্রধানমন্ত্রী চকবাজারের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। শুরুতে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সূচনা বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের প্রচার, প্রকাশনা সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাসের বর্ণনা দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সে সময় তারা নির্বাচন ঠেকানোর নামে অগ্নিসন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করেছিল। ২০১৩, ’১৪ ও ’১৫ সালে তারা জঙ্গিবাদী আচরণ, মানুষ হত্যা এবং মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। সে সময় ৩ হাজার ৮০০ মানুষ অগ্নিদগ্ধ হন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে পাঁচশ’র মতো মানুষ মারা যান। অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আজও। তাদের প্রতি কারও সহানুভূতি দেখি না। তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুড়িয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাস-রেল-ট্রাক পুড়িয়েছে, রাস্তা কেটে ফেলেছে, যত ধ্বংসাত্মক কাজ আছে করেছে। সেই ভয়াল স্মৃতি সবারই মনে আছে। জনগণ তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এজন্য তাদের ভোট দেয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, টানা ১০ বছর সরকারে থেকে দেশের উন্নয়ন করেছি বিধায় জনগণ আবার আমাদের ক্ষমতায় এনেছে। এ কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্ববাসীর কাছে মর্যাদা পেয়েছে এবং উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে। তাদের ভোটের মর্যাদা আমাদের রাখতে হবে। আমরা বাংলার মানুষকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিতে কাজ শুরু করেছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিটি গ্রামের মানুষ যেন উন্নত জীবন পায় সেভাবে আমরা দেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।

নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন বিক্রির নমুনা বর্ণনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, নির্বাচনের সময় তারা প্রতি সিটে ২-৩ জনকে নমিনেশন দিয়েছে। ৩০০ আসনে এ সংখ্যা ৯শ’র কাছাকাছি। যে টাকা বেশি দিয়েছে তাকেই নমিনেশন দেয়া হয়েছে। নমিনেশন তারা অকশনে তুলেছিল। বিদেশেও সিট অকশনে বিক্রি হয়েছে। নমিনেশন ফরম নিয়ে অনেকে অ্যাম্বাসিতেও গেছেন। তিনি বলেন, অ্যাম্বাসি নমিনেশন পেপার গ্রহণ করবে কিভাবে? যারা নমিনেশন নিয়ে এ ধরনের বাণিজ্য করেছে তারা ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে কিভাবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার থেকে বড় কথা যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে নমিনেশন দেয়া হয়েছে। এতে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এ দেশের মানুষ ভোট দেবে না এবং দেয়নি। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আবদুর রহমান, একুশে পদকপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আক্তারুজ্জামান, মেরিনা জাহান কল্পনা, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বাঙালি জাতি বিশ্বের মধ্যে মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেয়া জাতি। আজ এ বাংলা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। ভারত ভাগে বেশি অবদান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। অথচ তারা (পাকিস্তান) প্রথম আঘাত করল বাংলা ভাষার ওপর। বাংলা ভাষায় কথা বলা যাবে না, বাংলা ভাষায় চিন্তা করা যাবে না।

তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন জাতির পিতা শেখ মুজিব। সেই সংগঠনের মাধ্যমে ভাষার আন্দোলন-সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু। সেই থেকে যাত্রা শুরু। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশে। আন্দোলন বেগবানে সংগঠনের নেতারা প্রতি জেলা সফর করেন। আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু বারবার গ্রেফতার হতে থাকেন। সে সময় শাসকগোষ্ঠী আমাদের ওপর নতুন নতুন ফর্মুলা চাপিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, একবার বলা হল আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে, আবার বলা হল রোমান হরফে বাংলা লিখতে হবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়েছে। প্রতিবারই ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছে।

মাতৃভাষা বাংলা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দু’জন প্রবাসী বাঙালি রফিক এবং সালাম ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা করার প্রথম উদ্যোগ নেয়। সংগঠনও গড়ে তোলে। তারা জাতিসংঘে আবেদন করেছিল। পরে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করি। সেখান থেকে ঘোষণা দেয়া হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে জাতিকে নিঃশেষ করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫-এর পর যারা ক্ষমতায় আসে, তারা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, এমনকি এ জাতির অস্তিত্বেই বিশ্বাস করত না। সেজন্য তারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন দেশের কোনো উন্নতি হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশ ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন হয়েছে। সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই জনগণের প্রতি। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে আমরা সরকার গঠন করে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলাম। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু করেছিলাম। সেই যাত্রায় বেশিদিন যেতে পারিনি। ২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী দেশের মানুষ ও আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর নির্মম অত্যাচার শুরু করে। ঠিক যেভাবে একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যাচার করেছিল নিরীহ বাঙালিদের ওপর। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, এ নির্বাচনে জনগণ আমাদের ভোট দেয়, সরকার গঠন করি। সেই নির্বাচনে ৮৬ ভাগ ভোট পড়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট তখন মাত্র ২৮টি আসন পেয়েছিল। এটা হয়তো অনেকেরই মনে নেই।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×