ঢামেক হাসপাতালে দগ্ধদের দেখার পর প্রধানমন্ত্রী

রাসায়নিক গুদাম না সরানো দুর্ভাগ্যজনক

এবার নিশ্চয়ই মালিকরা সরে যেতে আপত্তি করবে না * পুরান ঢাকার অলিগলি নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে

  বাসস ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী,

সরকার পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে উদ্যোগী হলেও মালিকরা তা না মানার বিষয়টিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, চকবাজার ট্র্যাজেডি পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম মালিকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। আমি আশা করি, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদামগুলো সরিয়ে নেয়ার যে দাবি উঠেছে, তাতে আর কেউ আপত্তি করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের দেখার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজারের চুরিহাট্টা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬৭ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর আগে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে এক রাসায়নিক গুদাম থেকে সৃষ্ট আগুনে অন্তত ১২৪ ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী চকবাজারের ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যায়িত করে এ ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি চকবাজার বা নিমতলীর মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটতে না পারে সেজন্য সচেতন থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা আহত তাদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জাতীয় শোক পালন করা হবে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী ফায়াস সার্ভিস কর্মী, পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং চিকিৎসকদের সচেতনতার এবং রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানান।

পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম রেখে দেয়ার বিষয়ে ক্ষোভ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নিমতলীতে যখন আগুন লাগল সে সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এখান থেকে যত কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ রয়েছে তার সব সরানো হবে। সেজন্য কেরানীগঞ্জে একটি জায়গাও আমরা ঠিক করলাম, উদ্যোগটা নিলাম এবং সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হল- এখানকার কেমিক্যালের যত গুদাম আছে সেগুলো কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। যাতে করে এখানে আর এ ধরনের ঘটনা ঘটতে না পারে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তাদের অনেকেই (মালিকপক্ষ) এতে রাজি হননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেরানীগঞ্জে সরকার বহুতল ভবন করে আধুনিক গোডাউন তৈরি করে দিতে চাচ্ছিল। যাতে করে এগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো রকম দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে। আবার ঘটলেও যেন একটা ব্যবস্থা নেয়া যায়। সেভাবেই আধুনিক একটি পদ্ধতিতে এসব সরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু যেহেতু মালিকরা রাজি হননি তাই এটা আর কার্যকর করা যায়নি। এটাই হচ্ছে সব থেকে দুর্ভাগ্যের বিষয়। তিনি বলেন, আশা করি এ দুর্ঘটনার পর যারা তখন আপত্তি জানিয়েছিলেন তারা এখন আর সেই আপত্তি করবেন না।

তিনি এ সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে রাসায়নিকের গুদাম পুরান ঢাকা থেকে স্থানান্তরে সরকার উদ্যোগ নিলে তা কাজে আসেনি বলে জানান।

পুরান ঢাকার সঙ্কীর্ণ রাস্তাগুলো নতুনভাবে গড়তে হবে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, এই অলিগলি রাস্তাগুলোকে আমাদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে ফায়াস সার্ভিস বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে। তিনি বলেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস যে গাড়ি নিয়ে আসবে- এত ছোট রাস্তা, তার ওপর উৎসুক জনতা ভিড় করে। সবাই এক বালতি করে পানি আর বালি আনলেও ভালো হতো। কিন্তু কেউ সেটা আনেনি। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঢাকার ধোলাইখাল, শান্তিনগর খাল, সেগুনবাগিচা খাল থেকে শুরু করে ঢাকার অনেক খাল এবং জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, পুকুর খাল এগুলো যেন আর বন্ধ করা না হয়। এগুলো যেন রক্ষা পায়। কারণ এ ধরনের আগুন লাগলে পানির অভাবটা যেন আর না থাকে। সে বিষয়টি খেয়াল করেই সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করবেন।

উৎসুক জনতার জনসমাগম সংশ্লিষ্টদের কাজের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উৎসুক্যের কারণে যারা আগুন নেভানোর কাজে সম্পৃক্ত থাকেন তাদের কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়।

অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কিছু সংবাদকর্মীর আচরণ নিয়েও আপত্তি জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি জানি না এই সময়টা কোনো প্রশ্ন করার সময় কিনা বা সেখান থেকে একটা উত্তর কিভাবে আশা করা যায়?

এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সবাইকে মূল কাজ আগুন নেভানোর বিষয়ে আগে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভদ্রলোক (ফায়ার সার্ভিস কর্মী) কাজে যাবেন, তাকে ধরে রেখে একের পর এক প্রশ্ন, কোনো কোনো চ্যানেল এই কাজটি করেছেন। ভবিষ্যতে দয়া করে সেটা না করে সুস্থভাবে তারা যেন তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে সেই ব্যবস্থাটা সবাই নেবেন। সেটাই আমরা চাই।

শেখ হাসিনা এ সময় দায়িত্ব পালনের নামে হাসপাতালে রোগীর কাছে মিডিয়া কর্মীদের ভিড় করার সমালোচনা করে বলেন, এসব রোগীর ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টা না পার হলে তাদের কাছে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া, তাদের দেখানো বা তাদের ছবি তোলা- এসব বন্ধ করতে হবে। আমি দেশবাসীকেও বলব, এ বিষয়গুলোর দিকে একটু বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

কয়েক দিন আগেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করায় সেখানে আল্লাহর রহমতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এখনও তদন্ত চলছে।

এ সময় নতুন রাস্তাঘাট, স্থাপনাসহ বিভিন্ন ভবন নির্মাণের সময় সেসব জায়গায় যেন পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকে সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন, উপমন্ত্রী এনামুল হক শামিমসহ ঢাকা মেডিকেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

‘বঙ্গবন্ধু উপাধি’র সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ডাকটিকিট অবমুক্ত : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু উপাধি’তে ভূষিত হওয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের দু’টি স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবনে বিকালে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি উদ্বোধনী খাম ও পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা কার্ড অবমুক্ত করেন। এতে বিশেষ সিলমোহর ব্যবহার করা হয়। ডাক বিভাগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব অশোক কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডলসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও ডাটা কার্ড শনিবার থেকে ঢাকা জিপিওতে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে দেশের সব ডাকঘর থেকে বিক্রি করা হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×