চুড়িহাট্টায় কাটছে না আতঙ্ক

ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলের বিরুদ্ধে মামলা * তিন তদন্ত কমিটির পরিদর্শন * দায় নিতে নারাজ ব্যবসায়ীরা, বিক্ষোভ

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগুন,

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আতঙ্ক কাটেনি। এখনও সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ভয়াবহ আগুনের বিভীষিকাময় দুঃসহ স্মৃতি যেন পিছু ছাড়ছে না স্থানীয়দের। এলাকার প্রায় ঘরে ঘরে রাসায়নিক মজুদ থাকায় তাদের আতঙ্ক কাটছে না। রাসায়নিক পণ্য সরাতে চকবাজারের বাসায় বাসায় শনিবার নোটিশ টানিয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন নিজেই রাসায়নিক পণ্য অপসারণের কাজ শুরু করেন।

তিন দিন আগে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা চুড়িহাট্টা আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও কেউ এর দায় নিচ্ছে না। এদিকে স্থানীয় রাসায়নিক পণ্য ব্যবসায়ীদের দাবি, গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই এ অজুহাতে এখান থেকে রাসায়নিক পণ্যের গুদাম সরানো যাবে না। এ দাবির পক্ষে কয়েকজন ব্যবসায়ী চকবাজারে বিক্ষোভ করেন। আবার আতঙ্কে কেউ কেউ রাসায়নিক পণ্য সরাতে শুরু করেছেন।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলেকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার একই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। এ মামলার কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। এদিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এছাড়া দিলীপ বড়–য়ার নেতৃত্বে ১৪ দলের নেতারা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিস্ফোরক পরিদফতরের তদন্ত কমিটি পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

শনিবার সরেজমিন চুড়িহাট্টায় দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় বাড়িঘর ছেড়ে যারা নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। তবে তাদের আতঙ্ক কাটছে না। বীভৎস সেই রাতের কথা মনে হলেই শিউরে উঠছেন তারা। স্থানীয় মঈন উদ্দিন জানান, তার সামনের ভবনে আগুন লাগায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে যান। তার বাড়ির অর্ধেক ভাড়াটিয়া ফিরে এলেও অন্যরা আতঙ্কে ফিরছেন না। ফিরে আসতে ভরসা পাচ্ছেন না তারা। স্থানীয় আনোয়ার হেসেন বলেন, আমরা এখনও ঘুমাতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও কান্নার আওয়াজ পাই।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় একসঙ্গে ২৪টি দগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। সিঁড়ি ঘরের ফ্লোরে দলা পাকানো অবস্থায় ছিল দগ্ধ ওই লাশগুলো। অনেক চেষ্টা করেও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাননি হতভাগ্য মানুষগুলো। অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহগুলো বের করতে সহযোগিতা করেছিলেন মোহাম্মদ সুরুজ। মঞ্জুর ফার্মেসি, মদিনা ডেকোরেটরস আর সড়ক থেকে ৩০টি লাশ তিনি নিজ হাতে উদ্ধার করেন। শুক্রবার দুপুরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নন্দকুমার দত্ত লেনে। দুর্ঘটনার বর্ণনা শোনার পর তার দুই শিশুকন্যার মনেও বড় প্রভাব পড়েছে।

ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলের বিরুদ্ধে মামলা : ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাড়ির মালিকের দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। চকবাজার মডেল থানায় মামলাটি করেন মো. আসিফ। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামীম অর রশীদ তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে চকবাজার থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন।

এ প্রসঙ্গে চকবাজার থানার ওসি শামীম তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, এখনও কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। এ ঘটনার অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনি। তবে দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

পুরান ঢাকার রাসায়নিক পণ্যের মজুদ সরানো শুরু : চুড়িহাট্টা মোড়ের অগ্নিকাণ্ডে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির বেজমেন্টে বেআইনিভাবে রাখা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য সরাতে কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা অপসারণের কাজ শুরু করা হবে বলে মন্তব্য করেন মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের অভিযানে কারও বাড়িতে অবৈধ রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দুপুরে ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টের রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম ঘুরে দেখেন মেয়র খোকন। এরপর দুই দফায় দুটি ট্রাকে করে রাসায়নিক দ্রব্য সরানোর কাজ শুরু হয়। কারও কাছে রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের তথ্য থাকলে তা সিটি কর্পোরেশন অফিস, কাউন্সিলর অফিস বা থানায় জানাতে অনুরোধ করেন মেয়র। এছাড়া এলাকার বাসায় বাসায় রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরাতে নোটিশ দেয়া হয়েছে। তবে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে এলাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এ আগুনের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য নয়, গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণই দায়ী। পূর্বপুরুষ থেকে তারা এ ব্যবসা করে আসছেন।

চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুরাদ জানান, সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে রাসায়নিক দ্রব্য সরানো হচ্ছে। এগুলো কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় নিয়ে রাখা হবে।

স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর কাজ চলছে : চুড়িহাট্টা মোড়ের রাস্তা থেকে পোড়া আবর্জনা সরিয়ে নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। এদিকে চারটি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সতর্কবার্তা টানিয়ে দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত শতাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী আবর্জনা সরানোর কাজ করেন। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এখনও সেখানে অবস্থান করছে। উৎসুক মানুষের ভিড় ঠেকাতে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। আশপাশের ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। চুড়িহাট্টা শাহী জামে মসজিদের দক্ষিণ এবং উত্তর-পূর্ব কোণে নতুন দুটো বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হচ্ছে। বুধবারের আগুনে ওই এলাকার চারটি বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কাজ চলছে তদন্ত কমিটির : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিস্ফোরক পরিদফতরের তদন্ত কমিটি পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দি নিচ্ছি। এরই মধ্যে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছি। সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বড় ধরনের বিস্ফোরণ ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা একটি ভিডিও ফুটেজ পেয়েছি। সেটা বিশ্লেষণ চলছে। এখনই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা সকালে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। এ কমিটির আহ্বায়ক মো. আকরাম হোসেন জানান, শনিবার কমিটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে করণীয় নির্ধারণে কাজ চলছে। এছাড়া নিখোঁজদের একটি তালিকাও তৈরি করছে তদন্ত কমিটি। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আকরাম হোসেন বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় প্লাস্টিকের দানা আর প্রচুর স্প্রে বোতল ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ এটি। আরেকটি কারণ হল- এখানে রাস্তা সরু এবং এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। আগুন লাগার পর যানবাহন দ্রুত সরতে পারেনি।

রাসায়নিকের গুদামগুলো যেন মৃত্যুকূপ : চুড়িহাট্টার পাশের নন্দকুমার দত্ত লেনের চাল ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন মনে করেন, প্লাস্টিক, রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের কারণে আগুনের দ্রুত বিস্তার ঘটে। তিনি বলেন, আমরা অনেকবার বলেছি, আবাসিক এলাকা থেকে এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য সরিয়ে নিন। থানা পুলিশের সামনে এসবের ব্যবসা চলছে। থানায় অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। এলাকার বাড়িওয়ালারা বেশি টাকার লোভে আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক পণ্যের গুদাম ভাড়া দেয়।

ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র জানায়, ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে যেসব কেমিক্যাল দ্রব্য পাওয়া গেছে সেগুলোর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে এগুলোর মধ্যে থিনার, আয়রন অক্সাইড, আয়রোনিক ইয়োলো, ইঞ্জিনিয়ারিং কার্বন, অক্সাইড রডবার ও এসিড গ্রিন রয়েছে। বেজমেন্টে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো আশপাশের আরও ৮ থেকে ১০টি ভবন। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, ওয়াহেদ ম্যানশনে দাহ্য পদার্থ মজুদের শেষ নেই। ওই ভবনের দোতলায় ছিল পারফিউমের গুদাম। এসব পারফিউম উচ্চমাত্রায় দাহ্য পদার্থ। আগুনের সামান্য স্পর্শেই এগুলোর বিস্ফোরণ ঘটে। ভবনের বেজমেন্টে বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল পণ্যের পাউডার মজুদ ছিল।

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টোদিকের ভবনের মালিকানা চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের। সেই ভবনের পেছনে ছোট ঘরে হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডারগুলো মজুদ করা হতো বলে এলাকাবাসী জানায়। নন্দকুমার দত্ত লেনের বাসিন্দা আশিক উদ্দিন সৈনিক বলেন, ওই ভবনে বেআইনিভাবে মজুদ করা সিলিন্ডারগুলো বের করে দেয়ার জন্য একবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। বাড়ির পাশে এসব সিলিন্ডার রাখা মানেই বোমা-বারুদের সঙ্গে বসবাস।

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টোদিকে আনাস হোটেল। তার পেছনের ভবনের মালিক দুই ভাই সোহেল ও ইসমাইল। এ ভবনের নিচতলায়ও রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম রয়েছে বলে জানান পাশের বাড়ির বাসিন্দারা। তারা বলেন, সরকারের কাছে আমাদের আকুল-আবেদন এসব কেমিক্যালের গোডাউন যেন আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। আমাদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি যেন সরকার চিন্তা করে।

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×