চকবাজার ট্র্যাজেডি

‘এক মিনিটেই সব শেষ’

আগুনের তাপমাত্রা দুই হাজার ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে * এ ধরনের ‘ফায়ার ডিনামাইট’ নিয়ন্ত্রণের উপায় আবিষ্কৃত হয়নি আজও * ঘটনার মূলে ছিল কেমিক্যাল গোডাউন

  উবায়দুল্লাহ বাদল ও আহমদুল হাসান আসিক ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চকবাজার,

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেল কমপক্ষে ৬৭ জনের। বুধবার রাতের ওই ঘটনার ৩ দিন পরও বিশ্লেষণ চলছে কিভাবে ঘটল এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণই বা কি। সবারই একটাই জিজ্ঞাসা- কিভাবে ৫-১০ সেকেন্ডের মধ্যেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় আগুনের গোলা ছড়িয়ে পড়ল? তাপমাত্রা কিভাবে এত দ্রুত দুই হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছল যে ১ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল? কি ছিল চুড়িহাট্টার ওই ভবনগুলোতে?

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেসন্স অ্যান্ড মেইন্টেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ শনিবার এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, মাত্র ৫-১০ সেকেন্ডের মধ্যে চারটি পর্যায়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। বিস্ফোরণ হওয়া মাত্রই সামনে যা পেয়েছে তাকে পারমাণবিক বোমার মতো আঘাত করেছে। এর মধ্যে রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাওয়ায় আরও কয়েকশ’ গুণ তীব্রতায় আঘাত হেনেছে।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে যে বিস্ফোরণ হয়েছে এতে বাতাসের মতো প্রচণ্ড একটা ‘ওয়েভ’ গেছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের টিন ও লোহার জিনিসপত্র ছিল, ইটের দেয়াল ছিল। সব টুকরো টুকরো হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বলা যায়, বোমা বিস্ফোরণের মতো বিস্ফোরণ ঘটেছে।

যা ঘটার তা চোখের নিমিষেই ঘটেছে মন্তব্য করে মেজর শাকিল বলেন, প্রতিরোধ তো দূরের কথা, যিনি এ আগুনের আওতার মধ্যে পড়বেন সঙ্গে সঙ্গে তিনি অঙ্গার হয়ে যাবেন। কারণ ওই আগুনের তাপমাত্রা ছিল এক হাজার থেকে দুই হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ আগুনের গোলা বিদ্যুৎগতিতে সামনের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ আগুনের মতো উপরের দিকে কম উঠেছে। যাকে সামনে পেয়েছে তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। লোহা বা শক্ত কিছু সামনে পড়লে তা স্পি­ন্টার আকারে সামনের বস্তুতে আঘাত করেছে। মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিটের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেছে। ঘটনাস্থলে থাকা মানুষ ১ মিনিটের মধ্যেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন। যারা আশপাশের দোকানে অবস্থান করছিলেন তারাও পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক বলেন, চুড়িহাট্টা মোড়টিতে গাড়ি ছিল ৪-৫টি। মোটরসাইকেল ছিল ২০-২৫টি। একটি গ্যাসের সিলিন্ডার ভর্তি গাড়ি ছিল। গাড়ির জ্বালানি হচ্ছে তেল ও গ্যাস। মোটরসাইকেলের জ্বালানি হচ্ছে অকটেন। ওয়াহেদ ম্যানশনে অতি দাহ্য কেমিক্যাল ছিল। এর মধ্যে নেইলপলিশ, বডি স্প্রে, অ্যারোসল, সেভিং ফোম ও থিনার ছিল। এরকম একটি ‘মাল্টি হ্যাজার্ড সিচুয়েশনে’ সেখানে যেভাবেই হোক ‘স্পার্ক’ হয়েছে। তারপর সেই আগুন একটা উপাদান থেকে আরেকটা উপাদানে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর এতেই মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছে।

তিনি বলেন, এখানে পানি বা অন্য কিছু দিয়ে প্রতিরোধ বা কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষ কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘটনা ঘটেছে। যারা মাটিতে শুয়ে পড়েছেন তারাই কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার কোনো পদ্ধতি বিশ্বে আজও আবিষ্কার হয়নি। হলে লন্ডনে অগ্নিকাণ্ডে পুরো বিল্ডিং পুড়ত না। মানুষকে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হতো না।

তাহলে কি এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের কিছুই করার নেই এমন প্রশ্নের উত্তরে মেজর শাকিল বলেন, যেখানে মাত্র ৫-১০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনা ঘটেছে সেখানে মানুষের কি করার আছে। যেখানে সেকেন্ডের ব্যাপার সেখানে আমি বা আপনি থাকলেও মারা যেতাম।

ঘটনার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে সংবাদ পাওয়ার ৭ মিনিটের মাথায় ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জানিয়ে মেজর শাকিল বলেন, রাস্তায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারের সব প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা দিয়েছে। এ কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। মানুষের হতাহতের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। আর এ ৬৭ জনের মৃত্যুর দায় দেশের সবাইকে নিতে হবে। এককভাবে কেউই দায়ী নয়। এ ধরনের ফায়ার ডিনামাইট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কারোই কিছুই করার থাকে না।

নিমতলীর ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছি মন্তব্য করে মেজর শাকিল বলেন, ওই সময়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে আজ জাতিকে এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখতে হতো না। এ ঘটনার মূলে ছিল কেমিক্যাল গোডাউন। এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এ বিষয়ে সামাজিক জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়িভাড়া বেশি পাওয়ার আশায় বাড়ির মালিকরা কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন। তাদেরও সচেতন হতে হবে। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিমালা মেনে রাস্তাঘাট প্রশস্ত করতে হবে।

বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য সমর্থন করে যুগান্তরকে বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ হল, সেখানে হাজার হাজার বডি-স্প্রে ছিল। এসব বডি-স্প্রের মধ্যে থাকা লিকুইড কোনোভাবে বাষ্প হয়ে বাতাসে ছিল। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস ছিল। এগুলো খুবই দাহ্য পদার্থ। যে কোনো কারণেই হোক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এটি সাধারণ অগ্নিকাণ্ড নয়।

আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বলা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইয়াসির আরাফাত খান যুগান্তরকে বলেন, বাতাসের সঙ্গে যদি জ্বালানির মিশ্রণ (এলপিজি) দুই শতাংশের বেশি থাকে তবে ‘সামান্য স্পার্ক’ হলেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে। চুড়িহাট্টার বাতাসে সেই মিশ্রণ থাকার সম্ভাবনা বেশি। সেই মিশ্রণে আগুনের স্পর্শ পেয়ে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। এটি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নয়। কারণ সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ডে সেকেন্ডের মধ্যে এতবড় কুণ্ডলী হতে পারে না। আগুনের সূত্রপাতের পর সেটা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার জন্য জ্বালানির পর্যাপ্ত জোগানে পেতে হয়। চুড়িহাট্টায় পর্যাপ্ত জোগান ছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল মজুদ করা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুুহূর্তেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া কেমিক্যালের গোডাউনে থাকা হালকা দাহ্য পদার্থের কনটেইনারে কোনো লিকেজ থাকলে বাতাসে জ্বালানির মিশ্রণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ফায়ার সার্ভিস মনে করছে ঘটনাস্থলে এক থেকে দুই হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টিকে তিনি সমর্থন করে বলেন, সেটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কেননা সেখানে যে পরিমাণ কেমিক্যাল ছিল এবং বিস্ফোরণ হয়েছে তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে। কেমিক্যালের কনটেইনার বিস্ফোরণ হলে সেখানে ‘ফায়ার বল’ তৈরি হয়। এতে করে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, কেমিক্যালের পরিবহন এবং মজুদে সব সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল মজুদ করা যাবে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যারা কেমিক্যাল আমদানি করবে এবং ব্যবহার করবে সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে মজুদকারীদের কেমিক্যালের নিরাপদ মজুদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীরাও বলছেন, ১ মিনিটেই সব শেষ : চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। ঘটনার সময় যানজট ছিল। যারা চুড়িহাট্টা মোড়ে ছিলেন তারা ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাননি। মুহূর্তেই আগুনের কুণ্ডলী চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী আশিক উদ্দিন সৈনিক পূর্বদিকের গলির মুখ থেকে একটু দূরে ছিলেন। তিনি বলেন, হঠাৎই বিকট শব্দ। তাকিয়ে দেখি একটি পিকআপ ভ্যান শূন্যে উড়ছে। তারপর আগুনের ফুলকি দেখতে পাই। একের পর এক শব্দে কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণ হচ্ছিল। ১ মিনিটের মধ্যেই চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। আমরা দৌড়ে সেখান থেকে সরে যাই। যারা যানজটে আটকা পড়েছিলেন তারা কেউই বের হতে পারেননি। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়েছে যা কল্পনারও বাইরে।

পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা বিপজ্জনক কেমিক্যালে ঠাসা : পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বিপজ্জনক কেমিক্যালের গোডাউন গড়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই এসব কেমিক্যাল মজুদ করা হচ্ছে। চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় এবং বেসমেন্টে বিপজ্জনক কেমিক্যালের মজুদ ছিল। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাতাসে বিপজ্জনক কেমিক্যালের উপস্থিতি এবং ওয়াহেদ ম্যানশনে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় সেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই অগ্নিকাণ্ডে ৬৭ জন মারা যান। পুরান ঢাকায় যেসব বিপজ্জনক কেমিক্যাল মজুদ করা হয় এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- থিনার, এসিটন, জাইলিন, টলুইন, কেলিটন, এমিকে, হাইপো, এডহেসিভ, প্যারানল, পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট, মিথানল, ফসফরাস, নাইট্রিক এসিড, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, পটাশ, সালফিউরিক এসিডসহ বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল। এসব কেমিক্যাল জুতার কারখানা, নেইলপলিশ ও পারফিউম তৈরির কারখানা, টেক্সটাইল, ট্যানারি, প্লাস্টিক কারখানা, সুগন্ধিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×