ফিরে দেখা ২০১৭

অর্থনীতিতে অস্বস্তি বছরজুড়েই

  মিজান চৌধুরী ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফিরে দেখা ২০১৭
ছবি:সংগৃহীত

বছরজুড়ে নানা বাধা-বিপত্তির কারণে অস্বস্তির মধ্য দিয়েই গেছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনীতির সূচকগুলো সারা বছরই ওঠানামা করেছে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষকে বেকায়দায় ফেলেছে। অর্থনীতির কাঁধে চেপে বসেছে অপ্রত্যাশিত রোহিঙ্গা ইস্যু। আগাম ও মৌসুমি বন্যায় বিপর্যস্ত কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো। এতে খাদ্যের ঘাটতি এবং বাজার অব্যবস্থাপনায় বেড়ে যায় চালের দাম। আলোচনার টেবিলে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ব্যাংকিং খাতের সংকট। বিশেষ করে বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংকের লুটপাটের হোতা বাচ্চুকে দুদকে তলব, ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পর্ষদ সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনা মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দেয়ায় ফারমার্স ব্যাংকও ছিল আলোচনার তুঙ্গে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি কমেছে। একই সঙ্গে বেড়ে গেছে গ্রামে আয়ের বৈষম্য। দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমেছে। তারা মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যাতে সামগ্রিক অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না হয়। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা আছে।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে অর্থনীতির সূচক ভালো ছিল। রেমিটেন্সপ্রবাহে কিছু সমস্যা থাকলেও তা কেটে গেছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। তবে সরকারি বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিও ভালো রয়েছে।

আজ শুরু হল নতুন বছর ২০১৮। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর অর্থনীতিতে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের প্রতিকার, নির্বাচনী বছরের কারণে টাকা পাচার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে শ্লথগতির আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রফতানি-রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি ঘটানো।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের বড় শক্তি হচ্ছে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবস্থান। এ অবস্থানকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, এরপরও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটেনি। রেমিটেন্স ও রফতানিতে ধস ছিল। বিবিএসের তথ্য তুলে ধরে বলেন, বিগত দু’দশকের তুলনায় সম্প্রতি দারিদ্র্য বিমোচন হারের গতি কমেছে। একই সঙ্গে গ্রামে আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। কমেছে কর্মসংস্থানও। তার মতে, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ বা এর বেশি অর্জন করে তা ধরে রাখতে চাইলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের বিদ্যমান গতি দিয়ে সম্ভব নয়। এটা আরও বাড়াতে হবে।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির পরিবেশ ভালো ছিল। কিন্তু বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে চালের মূল্য বেড়েছে। এর বাইরে ব্যাংকিং খাতে সমস্যা ঘনীভূত হয় এবং আরও হচ্ছে। যদিও এটি এক বছরে সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু ২০১৭ সালে প্রথম এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি ভালো থাকলেও আমদানি ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি বেড়ে গেছে। এতে মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি সহজে যাবে না। এটা কাটাতে টাকার অবমূল্যায়ন করার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি মনে করেন, সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান ভালো হচ্ছে না। বিশেষ করে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান নেই। আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি গত পাঁচ মাসে কমেছে। এটি বিনিয়োগ কমার একটি বড় সূচক।

ব্যাংক কেলেঙ্কারি বছর মনে করা হচ্ছে বিদায়ী এ বছরকে। কারণ সংকট দীর্ঘদিনের হলে ২০১৭ সালেই আলোচনায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে ব্যাংকিং খাত নিয়ে। বছর শেষে ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিবর্তন আলোচনায় আসে। পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেন ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পর্ষদের একাধিক সদস্য। ২০১৪ সালে ব্যাপক লুটপাটের পর বেসিক ব্যাংকের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে এর চেয়ারম্যান বাচ্চুকে নিরাপদে পদত্যাগের সুযোগ করে দেয়া হয়। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অনিয়মের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি তোলা হলেও তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরেই ছিলেন।

তবে বছরের শেষদিকে দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এ ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকে কু-ঋণের পরিমাণ ও পুঁজির ঘাটতি বেশি দেখা দেয়া এ বছর।

ব্যাংকিং খাতের বাইরে অর্থনীতিতে আঘাত আনে আগাম ও মৌসুমি বন্যা। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষি খাত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চাল ও সবজির উৎপাদন। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতির কারণে মজুদ কমে যাওয়া। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়। এতে চাপ সৃষ্টি হয় রিজার্ভের ওপর। বাজার স্বাভাবিক রাখতে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণে বাড়ছে ভর্তুকির পরিমাণ। এর বাইরে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে মূল্যস্ফীতিও। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বন্যায় এক লাখ ৪ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতি হয়। আংশিক ক্ষতি হয় ৫ লাখ হেক্টর জমি। বন্যার কারণে সব মিলিয়ে ৩০ লাখ টন চালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

এসব কারণে চাপের মুখে পড়েছে মূল্যস্ফীতি। যা শেষ পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক। এই দাতা সংস্থার মতে, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়েই ছিল।

বিবিএসের সর্বশেষ শ্রম সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে ২০১৪-১৬ এই দু’বছরের মধ্যে মাত্র ১৪ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে বছরে ২০ লাখ শ্রমশক্তি যোগ হচ্ছে।

এদিকে বিগত দু’দশকে দারিদ্র্য বিমোচন হার ছিল ২ দশমিক ৫। এর ফলে গরিরের হার ২৪ দশমিক ৩ নেমে আসে। কিন্তু সর্বশেষ প্রকাশিত খানা জরিপে দেখা গেছে, ২০১০-১৬ সাল এই সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ১ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। অথচ ২০০৫-১০ সাল এ সময়ে এ গতির হার ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এ হার কমেছে দশমিক ৫ শতাংশ।

বছরের মাঝামাঝির পর রোহিঙ্গা সংকট সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারের গণহত্যা ও সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গার পুনর্বাসন ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বেড়ে গেছে অপ্রত্যাশিত ব্যয়।

বন্যাসহ কয়েকটি কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের গতিও শ্লথ ছিল। বন্যায় গ্রামীণ অকাঠামোর মধ্যে সাড়ে চার হাজার প্রতিষ্ঠান, সাড়ে ৯শ’ কালবার্ট, ৮৯০ কিমি. রাস্তা ও ১৩২ কিমি. বেড়িবাঁধ ও এক লাখ ৪ হাজার ঘরবাড়ি পুরোপুরি ক্ষতি হয়েছে। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ঘরবাড়ি, ১০ হাজার ৫০০ কিমি. রাস্তা, ৬৬৪ কিমি. বেড়িবাঁধ। এসব রাস্তাঘাট মেরামত ও নির্মাণের জন্য প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বরাদ্দ চাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এদিকে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগের বৃদ্ধির গতি এখনও মন্থর। যেখানে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের মধ্যে সরকারি বিনিয়োগের অবদান ছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা নেমে এক চতুর্থাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাপের পাশাপাশি রেমিটেন্স ও রফতানি আয়ের প্রবাহে স্থবিরতার কারণে বহির্খাতেও চাপ বাড়ছে। সরকার নানামুখী উদ্যোগ নেয়ার পর সম্প্রতি রেমিটেন্সপ্রবাহ বেড়েছে।

এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানির প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। তবে গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বৃহৎ পরিমাণে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাল আমদানি হয়েছে। যে কারণে অর্থবছরের প্রথম চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) আমদানি প্রবৃদ্ধি ২৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানি খাতে ব্যয় হয় ১ হাজার ৩১৮ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরে একই সময়ে ব্যয় হয় ১ হাজার ২৬৯ কোটি ডলার।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.