আন্তর্জাতিক অফিসে কার্গো নিয়ে হরিলুট

বিমানের লোকসান লাভ ব্যক্তির

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় ১০ বছরে কার্গোতে ৩৬০ কোটি টাকা লোপাট

  মুজিব মাসুদ ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিমানের লোকসান লাভ ব্যক্তির
বাংলাদেশ বিমান। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক স্টেশনগুলোতে কার্গো পণ্য পরিবহনে চলছে হরিলুট। লন্ডন, জেদ্দা, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর স্টেশনের অবস্থা ভয়াবহ। প্রধান কার্যালয়ের কার্গো শাখা, মার্কেটিং বিভাগ ও শীর্ষ পর্যায়ের একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে স্টেশন ম্যানেজার, কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্থানীয় জিএসএর (জেনারেল সেলস এজেন্ট) কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে যুক্ত পরিচালনা পর্ষদেরও দু-একজন অসাধু পরিচালক। কার্গো পণ্য লুটপাটের কারণে অনেক সময় ফ্লাইট পরিচালনাও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে।

দুর্নীতি করতে এ পণ্যগুলো ফ্লাইটে উঠানো হচ্ছে হিসাবের বাইরে ‘গোপন কার্গো’ হিসেবে। ফলে ওজন স্বাভাবিক রাখতে যাত্রী সিট খালি রেখেই ফ্লাইট ছাড়তে হচ্ছে। অপরদিকে ‘হিডেন কার্গো’ নিয়ে উড়োজাহাজ ফ্লাই করলে ‘টেল স্কেইড’সহ আকাশে উড়োজাহাজ ‘ক্রাশড’ করার ঝুঁকি থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ অবৈধ বাণিজ্যের কারণে বিমান বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। আর আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তি-কর্মকর্তা।

এ বাণিজ্য এতটাই লাভজনক যে বিমানের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব স্টেশনে গিয়ে আর ফেরত আসছেন না। অনেকে নিজেরাই কার্গো বাণিজ্য শুরু করেছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক টিম অনুসন্ধান শেষে বিমানের দুর্নীতিসংক্রান্ত রিপোর্টে বলেছে, আন্তর্জাতিক অফিসগুলোতে বিমানের সবচেয়ে বড় আয়ের খাত কার্গো সার্ভিস। কিন্তু এ খাতে বিমানের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে।

আমদানি ও রফতানি পণ্যের ওজন ও ভলিয়ম কম দেখিয়ে বেশি কার্গো বিমানে উঠানো হচ্ছে। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কার্গো চার্জ নেয়া হচ্ছে। এ খাতের লাখ লাখ টাকা বিমানে জমা না দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিমান পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ কার্গো উড়োজাহাজে তোলা হয় পাইলটকে হুবহু সে পরিমাণ ওজনের কথা জানাতে হবে। অন্যথা ফ্লাইট উড্ডয়নের সময় ‘টেল স্কিড বা রানওয়ের সঙ্গে বিমানের লেজে আঘাত লাগার ঘটনা ঘটার শঙ্কা থাকে। এছাড়া আকাশে ফ্লাইট সমন্বয় রাখা সম্ভব হবে না। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

বিমানের লন্ডন অফিসে এ ধরনের এক ঘটনায় তোলপাড় চলছে। অভিযোগ, লুটপাট চালাতে দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে কোনো কার্গো জিএসএস নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। নামসর্বস্ব পছন্দের একটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে কার্গো পণ্য আনা-নেয়া হচ্ছে। আর ওই এজেন্টকে নানা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি কমিশন বাণিজ্য করছে সিন্ডিকেট। লন্ডন রুটে কার্গো পণ্য সরবরাহের জন্য একাধিক কোম্পানি ও ব্যবসায়ী সংস্থার লন্ডন অফিস ও প্রধান কার্যালয়ে নানাভাবে চেষ্টা করেও সুযোগ পাচ্ছে না। এ অবস্থায় কার্গো ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে ওই অফিসে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, কার্গো এজেন্ট (জিএসএ) হিসেবে গ্লোবাল এয়ার দায়িত্ব পালনকালে বিমান ৬ মাসে (২০১৭-এর ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মে মাস পর্যন্ত) আয় করেছিল ২৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। অপরদিকে ‘জেএমজি’র মাধ্যমে কার্গো পণ্য বুকিং দেয়ার পরবর্তী ৬ মাসে আয় কমে হয়েছে ২২ লাখ টাকা। বিমানের হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, দিন দিন এ আয় আরও কমছে। একই সঙ্গে নানা সমস্যাও যোগ হচ্ছে।

জানা গেছে, সিন্ডিকেট লন্ডন রুটে জেএমজি নামের এ ট্রাভেল এজেন্টকে এখন একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বিমানে সরাসরি কার্গো বুকিং দিতে চাইলেও নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। মার্কেটিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এক সময় এ জেএমজি বিমানের কার্গো এজেন্ট হতে নানা চেষ্টা-তদবির করেও ব্যর্থ হয়েছিল। আরএফপিতে দরপত্র আহ্বান করেও তারা ননরেসপন্সিভ হয়।

তখন নিয়োগ দেয়া হয়েছিল লন্ডনভিত্তিক কার্গো এজেন্ট গ্লোবাল এয়ার নামে একটি কোম্পানিকে। কিন্তু জেএমজি ও বিমানের লন্ডন অফিসের সিন্ডিকেটের কারণে গ্লোবাল এয়ারও টিকতে পারেনি বেশি দিন। একপর্যায়ে গ্লোবাল এয়ারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর তাদের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। এরপর একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করে জেএমজি। তাদের অলিখিত পার্টনার হয় স্থানীয় অফিসের দুই কর্মকর্তা যাদের একজনকে সম্প্রতি ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। অপরজনকে চাকরিচ্যুত করার পর ফের চাকরি দিলেও তিনি এখন চাকরি ছেড়ে লন্ডনে কার্গো ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন।

নিয়ম অনুযায়ী লন্ডন থেকে কোন যাত্রী যদি নিয়মিত লাগেজে অতিরিক্ত পণ্য আনে তাকে প্রতি কেজির জন্য ৮ পাউন্ড অর্থাৎ ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকা চার্জ দিতে হয়। অপরদিকে সেই পণ্য যদি কার্গো কনটেইনারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জিএসএর মাধ্যমে আনা হয় তবে খরচ পড়ে প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। আর ২০ কেজির বেশি পণ্য হলে খরচ নেমে আসে অর্ধেকের কম। এ নিয়মের সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে কেজি প্রতি ৯০০ টাকা নিলেও সেই পণ্য পাঠানো হচ্ছে কার্গো পণ্য হিসেবে। কিন্তু অতিরিক্ত আদায় করা এ টাকা বিমানের অফিসে জমা হচ্ছে না। এটি ভাগ-বাটোয়ারা করে সিন্ডিকেট নিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, লন্ডন অফিসে এভাবে প্রতি ফ্লাইটে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেট। ফ্লাইট খালি গেলেও জেএমজি ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি কার্গো দিতে পারে না বিমানে। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে বেশি টাকায় জেএমজির মাধ্যমে কার্গো পাঠাতে হয়। এছাড়া জেএমজিকে বাল্ক কার্গোর নামে কম দামে পণ্য পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েও বছরে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

জেএমজির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সিলেট কাস্টমস অফিসের কতিপয় কর্মকর্তাকে অবৈধ সুযোগ দিয়ে সিলেট থেকে পণ্য খালাস করছে। পরে সেই মাল সড়ক পথে ঢাকায় পাঠাচ্ছে। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে তারা যাত্রীর নামে কমার্শিয়াল পণ্য পাঠাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি বিমানে কার্গো পণ্য পাঠানো ওপেন থাকত আর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১০-১২টি এজেন্সির মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর সুযোগ পেত। সেক্ষেত্রে বিমান সংস্থা ও কাস্টমসের এ লোকসান হতো না।

অভিযোগ আছে, বিমানের লন্ডন অফিসের এ সিন্ডিকেটের নাটের গুরু ছিলেন তৎকালীন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আতিকুর রহমান চিশতী ও একজন কান্ট্রি ম্যানেজার। তাদের নানা ভাবে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা অফিসের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সাবেক এক পরিচালক। অনিয়ম-দুর্নীতি আর দীর্ঘদিন চাকরিতে অনুপস্থিত থাকায় চিশতীকে চাকরিচ্যুত করা হলেও নানা কৌশলে তিনি দ্বিতীয় দফায় ফের চাকরি বাগিয়ে নেন।

এতে কোনো ধরনের চাকরির নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হয়নি। ডিজিএম থেকে জেনারেল ম্যানেজার পদে পনোন্নতি পান। অভিযোগ আছে, চিশতী এ কার্গো ট্রাভেল এজেন্টের বর্তমানে একজন অলিখিত শেয়ার হোল্ডার। অপরদিকে একজন কান্ট্রি ম্যানেজারের মাধ্যমে জেএমজি অবৈধভাবে বিমান থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যাত্রীর কাছ থেকে টিকিটের টাকা নিলেও ওই কান্ট্রি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি এ টাকা বিমানের কোষাগারে জমা দেননি। টাকা না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় একটি ট্রাভেল এজেন্টকে ব্লাক লিস্ট করে বিমানের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল।

অভিযোগ ওই কান্ট্রি মানেজারের নেতৃত্বে লন্ডন অফিস ওই টাকা উদ্ধার করলেও সে টাকা বিমান অফিসে জমা দেয়নি। এনিয়ে তদন্ত হলেও পরিচালনা পর্ষদের সাবেক একজন প্রভাবশালী পরিচালকের হস্তক্ষেপে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। সম্প্রতি ওই কান্ট্রি ম্যানেজারকে ঢাকা অফিসে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া বিমানের জেদ্দা অফিসের কার্গো নিয়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আছে। এ স্টেশনের জিএসএ নিয়োগ নিয়েও বড় ধরনের আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংয়ের অভিযোগ আছে বিমানের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

অপরদিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো শাখায় বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হয়েছে বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে অনির্ধারিত মালবাহী ফ্লাইটে (নন-শিডিউল ফ্রেইটার) আসা এবং বিদেশে যাওয়া মালামাল থেকে আদায়যোগ্য মাশুল ৯০ লাখ ২৬ হাজার মার্কিন ডলার (৭২ কোটি টাকার বেশি) বিমানের কোষাগারে জমা পড়েনি। নিরীক্ষা শাখার এক কর্মকর্তা জানান, এ টাকা মূলত কয়েকজন মিলে লোপাট করেছে। ২০০৮ সাল থেকে এটা চলছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী, দুই বছরে ৭২ কোটি টাকা করে ধরলে ১০ বছরে এ খাত থেকে অন্তত ৩৬০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে এ এক খাত থেকেই।

এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এএম মোসাদ্দিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি জানার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নন সিডিউল ফ্রেইটার থেকে কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ বাবদ অর্থ আদায় না হওয়ার বিষয়টি বিমানের সাম্প্রতিক এক অডিটে উঠে এসেছে। বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সার্কুলার না থাকার কারণে চার্জ আদায় হয়নি বলে যে দাবি করছে কার্গো কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ সেটি আরও তদন্ত করে দেখা হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক যুগান্তরকে বলেন, বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় ১০ বছর ধরে কার্গো সেক্টর নিয়ে যে মহা লুটপাট হয়েছে সেজন্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে দুর্নীতি

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×