স্পিকার ও সিইসির উদ্দেশে ড. কামালের চিঠির খসড়া

সুলতান মনসুরের সদস্য পদ বাতিলের অনুরোধ

সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ভঙ্গ করার পাশাপাশি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়েছেন * আজ-কালের মধ্যে চিঠি দেয়া হবে * গণফোরামের সম্মেলন ২৭ এপ্রিল

  শেখ মামুনূর রশীদ ১০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সদস্য পদ

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার ও সিইসিকে চিঠি দিতে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ গ্রহণ এবং সংসদে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ভঙ্গ করার পাশাপাশি নৈতিকতাও বিসর্জন দিয়েছেন- এমন অভিযোগ এনে ওই চিঠির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই এ চিঠি দেয়ার কথা। সূত্র জানায়, শনিবার গণফোরামের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ চিঠির খসড়া তৈরি হয়।

এরপর রাতে আরও কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠকের পর এটি চূড়ান্ত করা হয়। ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে চিঠির খসড়া তৈরি করা ছাড়াও গণফোরামের কেন্দ্রীয় সম্মেলন পিছিয়ে ২৭ এপ্রিল নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত অনুমতি না মেলায় সম্মেলন পেছানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আগামী ২৩ ও ২৪ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলনটি হওয়ার কথা ছিল।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামে নাম লিখিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মৌলভীবাজার-২ আসনে জয়ী হন সুলতান মনসুর। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত এবং দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

এই নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এছাড়া তাদের জোট ও দল থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই ৭ মার্চ শপথ নেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। বেলা সাড়ে ১১টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তার সংসদ ভবনের কার্যালয়ে তাকে শপথ পড়ান। এর আগে ২ মার্চ স্পিকার বরাবর চিঠি দিয়ে শপথ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ।

শপথ গ্রহণের দিন বিকালেই তাকে বহিষ্কার করে গণফোরাম। এর আগে তার কাছে একটি চিঠিও পাঠানো হয়। এসব আমলে না নিয়ে শপথ গ্রহণের দিনই সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ।

সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সুলতান মনসুরের সংসদে যোগ দেয়ার বিষয়টিকে দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী, সংবিধান লংঘন এবং নৈতিকতাবিবর্জিত উল্লেখ করে স্পিকার এবং সিইসিকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গণফোরাম। দলের পক্ষে ড. কামাল হোসেন এই চিঠি দেবেন। এর সঙ্গে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের গণফোরামের ফরম পূরণ করে দলটির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণের প্রমাণ, শপথ নেয়ার কারণে দল থেকে বহিষ্কারাদেশ এবং এর আগে তার বরাবর পাঠানো চিঠির অনুলিপিও সংযুক্ত করা হবে। চিঠিতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য বলা হবে।

চিঠির খসড়ায় উল্লেখ করা হয়, সংবিধান ও নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সংসদ সদস্য হওয়ার ও থাকার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ ও আরপিওর ১২(১) ধারা অনুযায়ী সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে এবং পদে থাকতে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ নির্বাচনের আগে গণফোরামের প্রাথমিক সদস্যপদের ফরম পূরণ করে দলটিতে যোগ দিয়েছেন। দলের হয়ে জোটের প্রতি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এবং দলে থাকা পর্যন্ত তিনি দলের কাছেই দায়বদ্ধ। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ভঙ্গ করেন। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে তিনি নৈতিকতাবিবর্জিত কাজ করেছেন।

খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ১৭৮ অনুযায়ী কোনো সাংসদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্পিকার তা নিষ্পত্তির জন্য বা অধিকতর শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারবেন। এতে বলা হয়, দল থেকে বহিষ্কার হলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও আরপিওর ১২(১) বিধি অনুযায়ী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের সদস্য পদ থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘১৯৫৪ সালে রাজনৈতিক দলের নেতারা সকালে-বিকালে একদল ছেড়ে অন্যদলে চলে যেতেন। এটাকে ওই সময় বলা হতো ‘হর্স ট্রেডিং’। একদল থেকে নির্বাচিত হয়ে চলে যাচ্ছেন আরেক দলে। নির্বাচিতরা সুপ্রিম সিদ্ধান্ত মানছেন না। রাজনীতির নামে এটা অপরাজনীতি। পরে বঙ্গবন্ধু যখন সংবিধান প্রণয়নের নির্দেশ দেন, তখন ড. কামাল হোসেনকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘সাংবিধানিকভাবে এটা বন্ধ করো।’ মূলত সে লক্ষ্যেই সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ করা হল।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ কতদূর যাবে? এখন যা বলা আছে, তাতে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবে না। আমি ব্যাখ্যা করছি, দলীয় সিদ্ধান্ত ভায়োলেট করে তিনি সংসদে যাচ্ছেন। আমরা তাকে বরখাস্ত করেছি। তাহলে তিনি কোন দল থেকে নির্বাচিত? তার তো কোনো দলই নেই। ফলে তিনি ধানের শীষেরও এমপি নন, আবার গণফোরামেরও নন। যদিও তিনি ভোট করেছেন বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে, গণফোরাম থেকে মনোনীত হয়ে। আমাদের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগযোগ্য। আর নীতিনৈতিকতার প্রশ্ন তো আছেই।’

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু শনিবার যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে চিঠির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে এখনও এটি চূড়ান্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা স্পিকার এবং সিইসিকে চিঠি দেব। এতে সাংবিধানিক ব্যাখ্যাসহ পুরো বিষয়টি উল্লেখ থাকবে।’

মূলত সংসদ নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ এবং শপথ নেয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক ডাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি প্রথম একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে।

সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে বা স্পিকারকে অবহিত না করলে বিজয়ীদের আসন শূন্য হওয়ার বিধানও রয়েছে সংবিধানে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে গণফোরামের দু’জন এবং বিএনপির ছয়জনসহ মোট আটজন জয়ী হন নির্বাচনে। এদের মধ্যে সাতজন এখন পর্যন্ত শপথ নেননি। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত কোনো সদস্য সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ না করলে তার সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।

সেই হিসাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত বাকি সাতজনের শপথ গ্রহণের সময় রয়েছে এপ্রিল পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার যুগান্তরকে বলেন, তারা এখনও শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে অটল আছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×