বাংলাদেশ বিমান: কেলেঙ্কারির হোতা পাচ্ছেন কেন্দ্রীয় কার্গোর দায়িত্ব!

অনিয়ম তদন্ত করবে দুদক

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কেলেঙ্কারির হোতা পাচ্ছেন কেন্দ্রীয় কার্গোর দায়িত্ব!

বাংলাদেশ বিমানের লন্ডন অফিসের কার্গো কেলেঙ্কারির মূল হোতা সেই কান্ট্রি ম্যানেজারকে ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্গোর দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে বিমানজুড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘যার বিরুদ্ধে কেলেঙ্কারির অভিযোগ, তাকে লন্ডন থেকে ঢাকায় এনে পুরো কার্গোর দায়িত্ব দেয়া রহস্যজনক। যেখানে কর্তৃপক্ষের উচিত লন্ডনের কার্গো ও টিকিট কেলেঙ্কারির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। সেখানে উল্টো কেলেঙ্কারির হোতাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।’

তারা বলেন, ‘সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিমানের কার্গোসহ ৮টি শাখার দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন দিয়ে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে উল্টো দুর্নীতিবাজদের ভালো পোস্টিং দিয়ে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।’

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিমান কর্তৃপক্ষ লন্ডন স্টেশনের কার্গো পণ্য পরিবহনের অনিয়ম তদন্ত না করলেও তারা তদন্ত করবে। এ নিয়ে কমিশন কাজও শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে লন্ডনে বিমানের তালিকাভুক্ত দুটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে এ পর্যন্ত কত টাকার কার্গো পণ্য পরিবহন ও টিকিট বিক্রি হয়েছে সেটাও তথ্য-উপাত্ত প্রদানের জন্য বিমানের কাছে চিঠি দেয়া হবে।

এজেন্সি দুটির মধ্যে একটির নাম জেএমজি ট্রাভেল। অপরটির নাম এয়ার এক্সপ্রেস। অভিযোগ আছে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিমানের লন্ডন অফিসের সিন্ডিকেট অতিরিক্ত ব্যাগেজ পরিবহন ও টিকিট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে লন্ডন অফিসের সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার আতিকুর রহমান চিশতীর দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ নিয়েও তদন্ত করবে কমিশন। চিশতীর দ্বিতীয় দফার নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র এবং তাকে চাকরিচ্যুতির সব ধরনের ডকুমেন্ট জমা দেয়ার জন্যও বিমানের কাছে চিঠি দেবে কমিশন। আর এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিমানের প্রধান কার্যালয়ের কারা কারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের সঙ্গেও কথা বলবে দুদক।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু লন্ডন নয়, বিমানের সব আন্তর্জাতিক স্টেশনের কার্গো নিয়ে অনিয়ম তদন্ত করা হবে। জড়িত প্রমাণিত হলে সে যত বড় কান্ট্রি ম্যানেজার হোক ছাড় পাবেন না।’ তিনি বলেন, ‘কার্গো শাখা নিয়ে দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করছে মন্ত্রণালয়।’

দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘১ কোটি টাকা বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে লন্ডনে এয়ার এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রাভেল এজেন্টকে বিমানের পক্ষ থেকে ব্ল্যাক লিস্ট করা হয়েছিল। অপরদিকে কার্গো ট্রাভেল এজেন্ট জেএমজির সঙ্গে কোনো ধরনের বৈধ চুক্তি না করেই লন্ডন অফিস প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি এক্সেস ব্যাগেজ লেনদেন করেছে।

এয়ার এক্সপ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ১ কোটি টাকার বেশি টিকিট বিক্রির অর্থ বকেয়া রেখে পালিয়ে গেছে। বিমানের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার শফিকুর রহমান ও আতিকুর রহমান চিশতীর সঙ্গে যোগসাজশে এই টাকা হাতিয়ে নেয় এয়ার এক্সপ্রেস। এরপর শফিকুর রহমান বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টাকা আদায় করলেও সেই টাকা বিমানের কোষাগারে জমা দেননি।

জানা গেছে, জেএমজির সঙ্গে সিন্ডিকেটের এতটাই দহরম-মহরম ছিল যে, তাদের পণ্য পরিবহনকে বৈধ করার জন্য জিএমজির সঙ্গে বিমানের একটি গোপন চুক্তি করা হয়েছিল। যদিও তদন্তের পর ওই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এ নিয়ে বিমানের সাবেক একজন পরিচালনা পর্ষদ সদস্য লন্ডন পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

দুদক সূত্রে জানা যায়, তাদের কাছে অভিযোগ আছে ধামাচাপা দিতে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেয়া হয় চাকরিচ্যুত কান্ট্রি ম্যানেজার আতিকুর রহমান চিশতীকে।

চাকরি দেয়ার পাশাপাশি তাকে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। নিয়োগ পেয়ে মাত্র ৬ মাস চাকরি করেই চিশতী পদত্যাগ করে আবার লন্ডন চলে যান। বর্তমানে তিনি লন্ডনে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলেও অভিযোগ আছে।

জানা গেছে, চিশতী যে ৬ মাসে অফিস করেছেন ওই সময়ে তিনি ৫ থেকে ৬ বার বিমানের খরচে লন্ডন ভ্রমণ করেন। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ লন্ডন যাওয়ার সুযোগে তিনি জেএমজি ও এয়ার এক্সপ্রেসের যাবতীয় অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দেন।

এক্ষেত্রে চিশতীকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন বিমানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। ঠিক একইভাবে এখন কান্ট্রি ম্যানেজারকে কেন্দ্রীয় কার্গোর দায়িত্ব দেয়ার মাধ্যমে কার্গো শাখার যাবতীয় অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে ওই সিন্ডিকেট।

দুদকের দেয়া প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ব্যাগেজ চার্জ আত্মসাৎ রোধে মনিটরিং জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে যাত্রীদের বুকিং ট্যাগ ও বহনকৃত ওজন পরীক্ষা করে মিল না পাওয়া গেলে বোর্ডিং পাস ইস্যুকারী কর্মকর্তাসহ আন্তর্জাতিক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্টেশন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কিন্তু বিমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দুদকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দুদকের প্রতিবেদনে এ নিয়ে একটি নিরপেক্ষ টিম গঠন করে কার্যকর রাখার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই টিমও গঠন করা হয়নি।

ঘটনাপ্রবাহ : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে দুর্নীতি

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×