৩৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন

খেলাপি ৮০ হাজার কোটি টাকা আদায় অনিশ্চিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন : খেলাপির বোঝা দেড় লাখ কোটি টাকা * এক বছরে বেড়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা * প্রভিশন ঘাটতিতে ১৫ ব্যাংক, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবলোপন

  হামিদ বিশ্বাস ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংকিং খাতে আদায় অযোগ্য খেলাপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণ অবলোপন। গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতিতে পড়েছে ১৫টি ব্যাংক।

অপরদিকে ঋণ অবলোপন করা হয় ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় বাদ দিয়ে এখনও আটকে আছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। তবে অবলোপনের এ কারসাজি ক্রমেই বাড়ছে।

এমনকি খেলাপিদের সুবিধা দিতে সম্প্রতি অবলোপন নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। আগে যে খেলাপি ঋণ ৫ বছর পর অবলোপন করার নিয়ম ছিল, এখন এ সময়সীমা কমিয়ে এনে ৩ বছর করা হয়েছে। এর ফলে বড় ঋণখেলাপিরা সহজে আড়ালে চলে যাবে।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে যে খেলাপি ঋণ আড়াল করে গোপনীয় খাতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, ব্যাংকিং ভাষায় তাকে রাইট অফ বা ঋণ অবলোপন বলা হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূলত ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একরকম দায়মুক্তি পেয়ে যায় ঋণখেলাপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

এদিকে ব্যাংক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত রাঘববোয়ালদের শাস্তি না নিশ্চিত না হওয়ায় ব্যাংকিং সেক্টরে এ রকম দুরবস্থা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, যতদিন সরকার চিহ্নিত বড় বড় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে না, ততদিন খেলাপি ও অবলোপন বাড়তেই থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

এছাড়া ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের একটি অংশ খেলাপি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। যার মধ্যে আদায় অযোগ্য খেলাপি বা কুঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা; যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা।

সে হিসাবে ১ বছরের ব্যবধানে কুঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ বিপুল অঙ্কের ঋণের অর্থ আদায় দুরূহ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব ঋণ দেয়া হয়েছে। যেগুলোর বিপরীতে কোনো জামানত পর্যন্ত নেই। আবার বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।

এছাড়া খেলাপিদের একটি বড় অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে বছরের পর বছর টাকা ফেরত দেয়া থেকে বিরত আছে। এসব মামলা নিষ্পত্তিতে রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষও তেমন সক্রিয় নয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের কুঋণ ৪১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের কুঋণ ৩২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা, বিদেশি ৯ ব্যাংকের কুঋণ ২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা এবং সরকারি বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের কুঋণ ৪ হাজার ৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এদিকে মাত্রাতিরিক্ত কুঋণের প্রভাবে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ১৫টি ব্যাংক; যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে ছিল ৯টি ব্যাংক। অর্থাৎ কুঋণ বাড়ার কারণে এক বছরে ৬টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল শেষে যে ১৫টি ব্যাংক সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংক ছাড়াও রূপালী এবং বেসিক ব্যাংক রয়েছে।

বেসরকারি খাতের ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ঢাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ও ট্রাস্ট ব্যাংকও রয়েছে। আবার আগের মতো বাংলাদেশ কমার্স, এবি, ন্যাশনাল, প্রিমিয়ার, শাহজালাল, সোস্যাল ইসলামী, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালে কার্যক্রমে আসা সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকও এবার চাহিদা অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে সরকারি লোকের দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বেশকিছু ঋণ দেয়া হয়েছিল; যা পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখা হয়েছিল।

এ ধরনের মন্দ ঋণগুলো এখন খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকেও কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে। তাদের দাপটে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছিল, তা এখন ‘মন্দ খেলাপি’ ঋণে পরিণত হয়েছে। ফলে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থা চলছে। যেভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। তার মতে, খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতি বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ঋণ অবলোপনের পরিমাণও।

আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ঋণের শ্রেণীমান বিবেচনায় প্রতি ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত।

আর যথাসময়ে আদায় না হওয়া নিুমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি- এ তিন ধরনের খেলাপি ঋণের বিপরীতে যথাক্রমে ২০, ৫০ ও ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর অর্জিত মুনাফা থেকে এ অর্থ রাখার নিয়ম রয়েছে। মূলত ব্যাংকিং খাতের কুঋণ বা মন্দমানের খেলাপি ঋণই বেশি। এগুলোর বেশিরভাগই রয়েছে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছে।

জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া যে ঋণ দেয়া হয়েছে তা খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা বেশি। এসব খেলাপির কোনো জবাবদিহিতা নেই।

বরং উল্টো তারা সুযোগ-সুবিধা বেশি পায়। অনেক ক্ষেত্রে খারাপ গ্রাহকরা পুরস্কৃত হচ্ছেন। আর তিরস্কৃত হচ্ছেন ভালো গ্রাহকরা। মূলত বিচারহীনতার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে প্রভিশন ঘাটতি বাড়ে। এছাড়া ব্যাংকের লেজার বুক পরিষ্কার করতে হলেও প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংক।

২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের পক্ষ থেকে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকেরই রয়েছে চার খেলাপি প্রতিষ্ঠান- সুপ্রোভ স্পিনিং, সুপ্রোভ রোটর স্পিনিং রিমেক্স ফুটওয়্যার ও ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদে জানিয়েছেন, ঋণখেলাপির যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে কিছুসংখ্যক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকারি দলের সদস্য ওয়ারেসাত হোসেনের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী দেশের শীর্ষস্থানীয় ২০ ঋণখেলাপির নাম-ঠিকানাও প্রকাশ করেন।

অর্থমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ জন। তবে কে কত টাকার ঋণখেলাপি, তা উল্লেখ করা হয়নি।

ওই সময় অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমস লিমিটেড, সামান্নাজ সুপার অয়েল লিমিটেড, বিআর স্পিনিং মিলস লিমিটেড, রাইজিং স্টিল লিমিটেড, কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড, বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড, রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেড, সিদ্দিক ট্রেডার্স, রূপালী কম্পোজিট লেদার ওয়্যার লিমিটেড, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড এবং এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রডাক্টস লিমিটেড।

--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×