জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

অনভিজ্ঞ কাউকে ব্যাংকের পরিচালক করা হবে না

দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে কর্মকর্তাদের শপথ করানো হবে * জড়িতদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না * জনতা ব্যাংকের কয়েকটি সূচকে ধস -গভর্নর * ব্যাংকটির খেলাপির পেছনে অনেক কারণ আছে, বিস্তারিত বলব না -চেয়ারম্যান

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থমন্ত্রী

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ যাতে কোনোভাবেই আর বাড়তে না পারে সে বিষয়ে ব্যাংকারদের সতর্ক করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পর্ষদে পরিবর্তন আনার ব্যবস্থা করা হবে। যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা দেবেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না।

বুধবার ঢাকার কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

একই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের আর্থিক চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, ‘২০১৮ সালে ব্যাংকটি বেশ কিছু সূচকে উন্নতি করেছে, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ব্যাপকভাবে ধস নেমেছে। বিশেষ করে মূলধন ঘাটতি সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া পরিচালন মুনাফা ভালো করলেও নিট মুনাফায় ব্যাংকটি অনেক লোকসানে পড়েছে।’

জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বার্ষিক সম্মেলনে অর্থ বিভাগের সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বক্তব্য দেন। এ সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদসহ ব্যাংকের পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সবাইকে তিনি ‘সঠিক পথে’ নিয়ে আসবেন। ‘কোনো ক্ষেত্রেই যেন নন-পারফর্মিং লোন না বাড়ে (খেলাপি ঋণ)। যারা বোঝে না তাদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাখব না, এটা খেলার জায়গা নয়। না বুঝলে হবে না।’ পরিচালক নিয়োগে অনেক সুপারিশ সামলাতে হয় জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একজন একজন করে দেখে দেখে ইন্টারভিউ নিয়ে ব্যাংকের পর্ষদে পাঠাব। অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো পরিচালক নিয়োগ দেয়া হবে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এ সময় ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় হওয়ায় বর্তমানে তা ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। এছাড়া ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের একটি অংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ কম দেখাতে ফেব্রুয়ারিতে ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) নীতিমালা শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০১৮ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে স্বীকার করে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘যদিও এটি জনতা ব্যাংকের একার বিষয় নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতে এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এ টাকা যেন আর বৃদ্ধি না হয়।’

ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শীর্ষ খেলাপিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পলিসি গ্রহণ করতে হবে। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে প্রথমে মামলা না করে আদায়ের চেষ্টা করবেন। মামলা করবেন অবশ্যই, তবে কুইক ডিসপোজেবলের জন্য নয়। ঋণ দেয়ার সময়ই সতর্ক হয়ে দিতে হবে।’ তিনি বলেন, জনতা ব্যাংকের লোকসানি শাখা ৫৬টি। এটি কমিয়ে আনতে হবে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় পৃথক এক প্রশ্নে সাংবাদিকদের গভর্নর বলেন, চুরি যাওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরত পেতে বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) ‘মানহানির’ যে মামলা করেছে, তাতে কোনো সমস্যা হবে না।

তিনি বলেন, ‘বুধবার আমি এ বিষয়টি পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। এতে কোনো অসুবিধা নেই, মানহানি মামলা তারা করেছে।’ ৩ বছর আগে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের আশায় ২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর আরসিবিসি ৬ মার্চ ফিলিপিন্সের সিভিল কোর্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে একটি মামলা করে বলে মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘তারা (আরসিবিসি) বেকায়দায় আছে আমাদের নিউইয়র্কের মামলার জন্য।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেশের অর্থনীতির ‘সবচেয়ে দুর্বল জায়গা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একজন অসাধু অফিসার আপনাদের সাফল্য ম্লান করে দেবে। ১০টি ভালো কাজ করেন, একটি খারাপ কাজ হলে বলবে- ‘সব নিয়ে চলে গেছে।’ যিনি অন্যায় করেন আর অন্যায়কে সহায়তা করেন- অপরাধ তো একই রকম।’

মন্ত্রী জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন সব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলবে- এ বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন। এ কারণে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি না করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শপথ করাতে চান তিনি। ‘হাত তুলে শপথ করতে হবে যে আপনারা দুর্নীতিকে ‘নো’ বলবেন, নিজে দুর্নীতি করবেন না, অন্য কাউকে দুর্নীতি করতে সহায়তা করবেন না। অসৎ কাজ থেকে সব সময় দূরে থাকতে হবে।’

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘যারা অসাধু ব্যবসায়ী, তাদের সঙ্গে কিন্তু আমরাও থাকি। আমরা যারা আছি তাদেরও কিন্তু কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না। যারা তাদের প্রশ্রয় দিয়েছে তাদের বের করা খুব কঠিন নয়।’

তবে অপরাধ স্বীকার করলে ক্ষমা করে দেয়া হবে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবাইকে সঠিক করে ঠিক পথে নিয়ে আসব। কেউ অপরাধ করে আসলে ভিন্ন পথে যদি টাকা নিয়ে থাকে- তা যদি ফেরত দিতে পারে, গোপনে আমাকে বললেও মাফ করে দেব।’

লিজ ফাইন্যান্সিং (নন-ব্যাংক) প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নিরীক্ষার আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দু-একটি বাদ দিলে কোনো প্রতিষ্ঠানেই ফোন করে কাউকে পাওয়া যায় না।

‘প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে স্পেশাল অডিট করব। তবে কাউকে ছোট করার জন্য নয়, কাউকে জেলে পাঠানোর জন্য নয়। প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত পদক্ষেপ নেব না।’

আর্থিক খাতে অপচয় কমাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে আসার কথাও বলেন মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘ব্লকচেইন টেকনোলজি নিয়ে আসতে হবে। একটি কমপ্রিহেনসিভ টেকনোলজিতে আনতে হবে, যাতে সবাই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের টেকনোলজি ব্যবহারে অপচয় বাড়ে।’

যারা ব্যবসার পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে ‘খারাপ অবস্থানে’ চলে গেছেন, তাদের সহায়তা করারও প্রতিশ্রুতি দেন অর্থমন্ত্রী। ‘একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করা অনেক কঠিন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার জন্য আসিনি। যারা ভালো ব্যবসায়ী তাদের অনেক সহায়তা করব। আমরা যা করব, সততার মধ্যে করব। এমনভাবে পলিসি করব যাতে সবাই উপকৃত হয়।’

দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে আনতে কাজ করব- এমন মন্তব্য করে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘একদিনে এসব সম্ভব নয়, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ধীরে ধীরে করা হবে। তবে আমি পারব। ব্যাংকে রাখা গরিব মানুষের টাকা আত্মসাৎ করলে দুনিয়া-আখেরাতে কোথাও মুক্তি পাবেন না।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ। এটা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। জনতা ব্যাংকে যোগ হয়েছে বেশ বড় অংকের খেলাপি ঋণ। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে আমি বিস্তারিত বলব না। তবে যেটা না বললেই নয়, সেটা হল খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ এবং অ্যাননটেক্স গ্রুপের কথা। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ১৯৮০ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। বেশ কিছু অনিয়মের কারণে গ্রুপটির অনেক ঋণ বর্তমানে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। অনেক আলোচিত অ্যাননটেক্স গ্রুপও ২০০৫ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্রুপটি ২২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রকল্প ঋণ ও চলতি মূলধন ঋণ দেয়া হয়েছে। দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, পর্ষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’ আমাদের পাওয়া অনিয়ম এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাওয়া অনিয়মগুলো নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলে কাজ করছি এবং এটা চলমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৬১ কোটি টাকা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×