নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফের উত্তাল

সড়কে আর কত লাশের মিছিল

রাজধানীতে জেব্রাক্রসিংয়ে বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহত : ১০ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ-বিক্ষোভ * আজ আবার অবরোধ, ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে শরিক হতে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান * এক বাসের চালক গ্রেফতার ও নিবন্ধন বাতিল * চালকের ফাঁসিসহ ৮ দফা দাবি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কে আর কত লাশের মিছিল

রাজধানীর প্রগতি সরণির জেব্রাক্রসিংয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ফের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী রাস্তা পার হওয়ার সময় পাল্লাপাল্লি করে আসা দুই বাসের চাপায় প্রাণ হারান।

এ ঘটনার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় ১০ ঘণ্টা ওই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিইউপি ছাড়াও নর্থসাউথ, ইনডিপেনডেন্ট, ইস্ট ওয়েস্ট ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। এ সময় তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে চালকের ফাঁসিসহ ৮ দফা দাবি জানান।

‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘টনক তুমি নড়বে কবে’ ইত্যাদি স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা প্রগতি সরণি এলাকা। একই দাবিতে আজ সকাল ৮টা থেকে আবারও আন্দোলন শুরু করবেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ক্লাস বর্জন করে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্যও সারা দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এদিকে ঘাতক বাস দুটি জব্দ করেছে পুলিশ। তবে গ্রেফতার করা হয়েছে এক চালককে। বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে বাতিল করেছে বিআরটিএ। সরেজমিন দেখা গেছে, দিনভর অবরোধের ঘটনায় ওই সড়কে যান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এতে অন্য সড়কগুলোতেও তীব্র যানজট দেখা দেয়।

উত্তাল সড়কের দু’পাশেই অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সড়ক ছাড়বে না বলে ঘোষণা দেয় তারা। আন্দোলনে আটকে পড়া সুপ্রভাত পরিবহনের একটি গাড়িতে আগুন ধরানো হলে শিক্ষার্থীরা পানি এনে আগুন নেভান। এ সময় আগুন লাগানোর অভিযোগে তারা একটি বাসের চালককে ধরে মারধর করেন।

দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে আন্দোলনকারীরা রাস্তা থেকে সরে গেলে ওই এলাকার যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। গত বছরের জুলাইয়ে রাজধানীর রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হন। এ ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। সেই আন্দোলনে সক্রিয় থেকে নিরাপদ সড়কের দাবি জানিয়েছিলেন আবরার আহমেদ চৌধুরী।

আবরারের বন্ধু ও পরিচিতজনদের প্রশ্ন- যে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবরার আন্দোলন করেছে, কথা বলেছে, সেই সড়কেই তার প্রাণ গেল। তাহলে সড়ক কতটুকু নিরাপদ হয়েছে? শুধু তাই নয়, রাজধানীতে ‘ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ’ চলার মধ্যেই সড়কে প্রাণ গেল আবরারের। তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন।

নিহত আবরার আহমেদ চৌধুরী (২০) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে। আবরার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বিইউপির একটি বাস প্রগতি সরণিতে দাঁড়িয়েছিল। ওই বাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল আবরারের।

বাসে ওঠার জন্য নিয়ম মেনেই জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন তিনি। ওই সময় পাল্লাপাল্লি করে আসা সুপ্রভাত পরিবহনের দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়েন আবরার। গুরুতর আহত আবরারকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুর্ঘটনার পর নিহত আবরারের সহপাঠীরা বাসটি আটক করেন। এ সময় চালক ও হেলপার পালানোর চেষ্টা করেন। পরে চালক সিরাজুল ইসলামকে (২৯) ধরে ফেলেন শিক্ষার্থীরা।

আবরার নিহত হওয়ার ঘটনায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই কুড়িল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত ছয়টি জায়গায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। রাস্তায় শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল, বিশ্বরোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।

তারা বাসচাপায় নিহত সহপাঠীর বিচার দাবিতে নানা স্লোগান দেন। উই ওয়ান্ট জাস্টিস/জেব্রাক্রসিংয়ে মৃত্যু কেন/টনক তুমি নড়বে কবে/ কয়লার রাস্তা না রক্তের রাস্তা/নিজের সিরিয়ালের অপেক্ষা করুন/আর কত প্রাণ নিবি ইত্যাদি প্লেকার্ড নিয়ে তার সহপাঠীরা আন্দোলন করছেন।

জেব্রাক্রসিংয়ের মধ্যে আবরারের রক্তের দাগের দুই পাশে শুয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে অনেককে। রাস্তা অবরোধের কারণে সড়কে যান চলাচল একেবারেই বন্ধ ছিল।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের কাছে যান ঢাকা উত্তর সিটি মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া যত দ্রুত সম্ভব মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে ‘যৌক্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, ‘তোমরা আমার সঙ্গে থাকলে আমি সব সমস্যার সমাধান করে ফেলব। বাসের মালিক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়মের ভেতরে আনা হবে। ঢাকা সিটিতে ছয়টি কোম্পানির বাস চালানো হবে। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সমাধান করব। দু-তিন মাসের মধ্যে নিহত আবরারের নামে বসুন্ধরা গেটে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করব।’ এরপর মেয়র রাস্তা ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে সেখান থেকে চলে যান মেয়র।

নুরুজ্জামান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাস্তার বিপরীত দিক থেকে চিৎকার শুনতে পান। এরপর রাস্তা পার হয়ে দুটি বাসের মধ্য থেকে একটা ছেলের দেহ বের করতে দেখেন। দুই বাসের মধ্যে পড়ে থেঁতলে গিয়েছিল তার শরীর। দুটি বাসের মধ্যে পিষ্ট হওয়ার পর ছেলেটিকে নিয়েই বেশ কিছুটা রাস্তা অতিক্রম করে বাস দুটি।

দুপুর আড়াইটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে সরে যেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অনুরোধ করলেও তারা তা মানেননি।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আন্দোলন তুলে নিতে ও নিয়মের কথা বলছেন, তাহলে আমরা মরছি কেন? এ পরিস্থিতির সমাধান কবে?’ এ সময় জয়েন্ট কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম ও উপ-কমিশনার (গুলশান) মোস্তাক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

জয়েন্ট কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের মতো আমরাও ব্যথিত। তোমরা জেনেছ, ঘটনার পরই আমরা ঘাতক বাস ও চালককে আটক করেছি।

তোমরা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করছ, আমরাও এতে অনুপ্রাণিত। কারণ, আমরাও নিরাপদ সড়ক ও যানজটমুক্ত রাজধানীর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, তোমাদের এ আন্দোলন আমাদের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং কাজকে বেগবান করবে। তোমরা জান, রাজধানীর ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ছিল।

আমরা সেখান থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেছি। হয়তো আমরা সবকিছু শেষ করতে পারিনি কিন্তু ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা উত্তরণে বেশকিছু সফলতা পেয়েছি। রাতারাতি সব হয় না, আমাদের সময় দাও।

মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৫টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে প্রগতি সরণিতে পৌঁছেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূর। তবে তার এই আগমনকে স্বাভাবিকভাবে নেননি আন্দোলনকারীরা। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে চাইলে তাকে থামিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে দেন মায়েশা নূর নামে বিইউপির এক ছাত্রী।

তিনি বলেন, ‘নূর আপনাকে আমরা অ্যাকসেপ্ট করতে পারছি না।’ মায়েশার এই বক্তব্যে সমর্থন দেন উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মায়েশা বাধা দেয়ার পর উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ভিপি নূরকে ‘ভুয়া, ভুয়া’ এবং ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দেন। ভিপি নূরুল হক সাধারণ শিক্ষার্থীদের থামানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন।

একপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপ তাকে জটলার মাঝ থেকে বাইরে নিয়ে আসে। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ব্যর্থ হয়ে নূরুল হক নূর একটু সামনে এগিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় নূর বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে আছে। কোনোভাবেই এই আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যাবে না।’ ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনে আঘাত করা হলে ‘দাঁতভাঙা’ জবাব দেয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। সন্ধ্যা ৬টার দিকে এদিনের মতো বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ করার ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের পক্ষে বিইউপির শিক্ষার্থী মাইশা নূর বলেন, আমাদের এ আন্দোলনকে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মতো চালিয়ে যাব। বুধবার (আজ) সকাল ৮টায় আমরা আবার এখানে উপস্থিত হব।

বাংলাদেশের সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ করব ক্লাস বর্জন করতে। সব অভিভাবককে বলব আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে। কারণ আজ যে ছেলেটা মারা গেছে, সে-ও কোনো বাবা-মায়ের সন্তান ছিল। প্রতিটি স্টুডেন্টকে আইডি কার্ড নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এই আন্দোলন চলবে।

এটা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন না। আমরা কোনো হেলমেট বাহিনী চাই না, আমরা পুলিশের সুরক্ষা চাই। আমরা পুলিশ বাহিনী থেকে সাপোর্ট চাইব। এ ব্যাপারে শুধু আশ্বাস নয়, কাল থেকে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে চাই। ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে যেখানে আছেন, আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সামনে আমাদের আন্দোলনে শরিক হবেন।

আমরা এখনই আন্দোলন স্থগিত করছি না। করা হলে আপনারা জানতে পারবেন। আমাদের মেয়র বলেছেন, এখানে (প্রগতি সরণি) ফুটওভারব্রিজ হবে। কাল থেকে কাজ শুরু হবে।

আমাদের দাবি, মেয়রের উপস্থিতিতে যেন বুধবার (আজ) এটি উদ্বোধন হয়। আমরা মেয়রের কথার প্রতিফলন দেখতে চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এখানে আজ (মঙ্গলবার) সন্ধ্যার পরে অবস্থান করছি না। কাল (বুধবার) সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে আন্দোলন।

আমরা ৮ দফা আন্দোলনের প্রথম দফায় ঘাতক চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি বলতে ফাঁসি বুঝিয়েছি। আমরা এবার নিরাপদ সড়কের বাস্তবায়ন চাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, জাবালে নূরের রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছিল। এখন জাবালে নূর চলছে। পারমিট ক্যানসেল হওয়া যানবাহনগুলো কাল থেকে রাস্তায় দেখতে চাই না।

আরেক শিক্ষার্থী ফয়সল এনায়েত বলেন, ঢাকা উত্তরের মেয়র তাদের জানিয়েছেন, বুধবার (আজ) সকালে ফুটওভারব্রিজটি উদ্বোধন করা হবে। এটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন নিহত আবরারের বাবা। মেয়র বলেছেন, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’জন করে ছাত্র নিয়ে একটি কমিটি করা হবে। এ সময় অন্য ছাত্ররা বলেন, না না না কোনো কমিটি আমরা চাই না।

রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে একের পর এক তরুণ-তাজা প্রাণ। মঙ্গলবার এ ঘটনা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়কে আরও ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

গত বছরের ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে সার্ক ফোয়ারার কাছে দুই বাসের রেষারেষিতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুরুতে পত্র-পত্রিকায় বিচ্ছিন্ন হাতের সেই ছবি দেখে আঁতকে ওঠেন সাধারণ মানুষ। চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে ঘটনাটি।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ এপ্রিল রাতে রাজীব মারা যান। এর তিন দিনের মাথায় ২০ এপ্রিল রাতে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় একটি বিআরটিসি বাস রোজিনা নামে এক তরুণীর ডান পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে তার একটি পা হাঁটু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ এপ্রিল মারা যান তিনি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রগতি সরণির নদ্দা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের ছাত্র শাকিল আহমেদ তূর্য (২২) নিহত হন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত বছরের ২৯ জুলাই আন্দোলন শুরু হয়।

রাস্তায় নেমে আসেন সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ, একপর্যায়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ শুরু করেন তারা। এ সময় মিছিল করতে গিয়ে ৫ আগস্ট রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ‘হেলমেট বাহিনী’র হামলার শিকার হতে হয়েছিল আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ওই আন্দোলন চলাকালে ২ আগস্ট আবরার তার ফেসবুক প্রোফাইলে নিজের ছবি প্রকাশ করেন। যার নিচে লিখা ছিল, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।

৮ দফা দাবি : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে এলে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ১২ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। পরে গুছিয়ে আট দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবিগুলো হল- ১. পরিবহন সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং প্রতি মাসে বাসচালকের লাইসেন্সসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেক করতে হবে। ২. আটক চালক ও সম্পৃক্ত সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৩. আজ (মঙ্গলবার) থেকে ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালককে অপসারণ করতে হবে। ৪. ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সব স্থানে আন্ডারপাস, স্পিড ব্রেকার এবং ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। ৫. চলমান আইনের পরিবর্তন করে সড়কে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৬. দায়িত্ব অবহেলাকারী প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৭. প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্টপেজ এবং যাত্রীছাউনি করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ৮. ছাত্রদের হাফ পাস (অর্ধেক ভাড়া) অথবা আলাদা বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।

বনানীতে চিরনিদ্রায় আবরার : বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সুপ্রভাত বাসের চাপায় নিহত বিইউপি ছাত্র আবরার আহমেদ। মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে বনানী কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর সেনানিবাসে বিইউপি এডিবি গ্রেড গ্রাউন্ড মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আবরার আহমেদের বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরী, বিইউপির ভিসি মেজর জেনারেল মো. এমদাদ-উল বারী, ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, আবরার আহমেদের সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আত্মীয়-স্বজন অংশ নেন।

দুর্ভোগ : মঙ্গলবার অবরোধের কারণে প্রগতি সরণিতে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় হেঁটে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষ। ওই সময় মালিবাগ-রামপুরার দিক থেকে আসা গণপরিবহনসহ সব যানবাহন নতুনবাজার এলাকা থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়।

অন্যদিকে উত্তরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতের দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। নতুনবাজার থেকে রামপুরা সড়কে এবং কুড়িল বিশ্বরোড থেকে খিলক্ষেতের রাস্তায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। আব্দুর রহমান নামের এক পথচারী বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত কাজে উত্তরা থেকে মালিবাগ যাচ্ছিলাম। কিন্তু ছাত্রদের আন্দোলনের কারণে বাস বন্ধ করে দিলে আমি কুড়িল বিশ্বরোড থেকে হেঁটে এসেছি।

বাসসহ সব যানবাহন বন্ধ থাকায় নতুনবাজার পর্যন্ত হেঁটে যাব। সেখান থেকে বাস চলাচল করছে।’ তিনি বলেন, বাস বন্ধ থাকায় আমাদের মতো সাধারণ পথচারীদের ভোগান্তি হচ্ছে। তবুও আমরা চাই সড়ক নিরাপদ হোক। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসুক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×