ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল

সহপাঠীরা ডাকত সিজিপি-৪ * সন্তানকে কবরে শুইয়ে দেয়ার কষ্টের তুলনা কোনো কিছুর সঙ্গে হয় না : বাবা-মা

  যুগান্তর রিপোর্ট ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাসচাপায় নিহত আবরার।
বাসচাপায় নিহত আবরার। ছবি: ফেসবুক

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সন্তান আবরার আহমেদ চৌধুরীর স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর ডাক্তার হওয়ার। চেষ্টাও করেছিলেন। মেডিকেল কলেজে সুযোগ না পেয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপ (আইআর) বিভাগে ভর্তি হন।

আগামী বছর আবারও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ইচ্ছা ছিল তার। রঙিন স্বপ্ন আর বুকভরা আশা নিয়ে অন্যদিনের মতো মঙ্গলবার সকালেও প্রিয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।

নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণিতে জেব্রা ক্রসিংয়ে সুপ্রভাত পরিবহনের ঘাতক বাস কেড়ে নিল তার প্রাণ। শেষ করে দিল সব স্বপ্ন। বাবা-মা-স্বজন, শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছ থেকে চিরতরে কেড়ে নিল আবরারকে। তার ঠাঁই হল বনানীর সামরিক কবরস্থানের অন্ধকার কবরে। তার বন্ধুরা মনে করেন নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে বিইউপি ক্যাম্পাসে জানাজা শেষে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয় আবরারকে। ছেলের এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তার বাবা-মা। ছেলেকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান তারা। আবরারের বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহাম্মেদ চৌধুরী বলেন, আমার বাবা তো আর কোনোদিন আমার কাছে আসবে না। তার মুখে আর বাবা ডাক শুনতে পারব না। একটি ঘটনায় আমার জীবনের সব সফলতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

তিনি বলেন, জীবনে অনেক কষ্টের সময় পার করেছি। তবে সন্তানকে কবরে শুইয়ে দেয়ার মতো কষ্ট আর কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না। ছেলেকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে মা ফরিদা ফাতেমী আহাজারি করে বলছিলেন, পরিবারের মাথার মুকুট ছিলি তুই। তুই একবার ফিরে আয়। আমাকে জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাক বাবা।

তিনি বলছিলেন, আমার বাবাকে কখনও একা ছাড়তে চাইতাম না। ও বলত, আম্মু তুমি যদি আমাকে একা চলাফেরা করতে না দাও, তবে আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবো কীভাবে? সবাই আমার বাবাটাকে অনেক পছন্দ করত। ভাইয়ের এমন মৃত্যুতে অনেকটা বাকরুদ্ধ ছোট ভাই আবিদ আহমেদ চৌধুরী। ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোর ধারায় কাঁদছিল সে।

আবরারের ছোট চাচা মাসুদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিল আবরার। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পাস করে বিইউপিতে পড়ছিল।

তার ছোট ভাই আবিদ আহমেদ চৌধুরী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। বসুন্ধরা ডি ব্লকে ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। মাসুদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আবরার কমিশনার র‌্যাংকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

তার ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীর ডাক্তার হওয়া। এ বছর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় সফল না হওয়ায় আগামী বছর আবারও মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ইচ্ছা ছিল তার। সে ছিল সবার আদরের পাত্র।

আবরারের শিক্ষক বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শায়লা সুলতানা বলেন, সোমবার দুপুরে আবরারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অথচ আজ সে আর আমাদের মাঝে নেই। এটা ভাবতেই পারছি না। খেলাধুলা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম হতো আবরার।

বিইউপির একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সহপাঠীদের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব ছিল তার। অল্প ক’দিনেই ক্যাম্পাসে ও ক্লাসে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন আবরার। আবরারের মর্মান্তিক পরিণতিতে শোকাতুর সহপাঠীরা রাস্তায় নেমে আসেন। নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণিতে দিনভর অবরোধ করে রাখেন সড়ক।

বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব বলেন, সবার সঙ্গে আবরারের বন্ধুসুলভ সম্পর্ক ছিল। কোনোদিন সে কাউকে কটূক্তি করে কোনো কথা বলেনি। এমন মানুষটা এভাবে চলে যেতে পারে তা মানতে পারছি না। আবরারের আরেক সহপাঠী রাকিব হাসান বলেন, মাত্র তিন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার মন জয় করে ফেলেছিল আবরার। আমরা তাকে সিজিপি-৪ বলে ডাকতাম। কারণ আমরা জানতাম, সে বেস্ট রেজাল্ট করবে।

মঙ্গলবার বিকালে বনানী কবরস্থানে আবরারকে চিরশায়িত করতে উপস্থিত হয়েছিল তার স্কুলজীবনের বন্ধুরাও। তাদের মধ্যে চয়েস, আফতাবসহ কয়েকজন জানান, বসুন্ধরার প্রে-পেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে আবরার ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পাস করে। দুটি পরীক্ষায় সে সর্বোচ্চ ফল অর্জন করে। তারা বলছেন, গেল বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে গলা উঁচিয়ে রাস্তায় স্লোগান দিয়েছিল সে। আর তাকেই বলি হতে হল অনিরাপদ সড়কে।

ঘটনাপ্রবাহ : বাসচাপায় আবরার নিহত

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×