ক্ষোভ-বিক্ষোভে রাঙ্গামাটি উত্তাল

  রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষোভ-বিক্ষোভে রাঙ্গামাটি উত্তাল

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে ব্রাশফায়ারে ৭ জন এবং বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যার ঘটনায় উত্তপ্ত পাহাড়। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গে চলছে প্রতিবাদ বিক্ষোভ। যৌথ বাহিনীর অভিযান চললেও কাউকেই গ্রেফতার করা যায়নি।

সুরেশ হত্যার প্রতিবাদে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের ডাকে বুধবারের সকাল-সন্ধ্যা নৌ-অবরোধে রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাইয়ের সঙ্গে বিলাইছড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে।

বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে সকালে রাঙ্গামাটিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

এ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। সমাবেশ একপর্যায়ে জনসমুদ্রে রূপ নেয়। পরে একটি মিছিল বের হয়। এদিকে বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা বুধবার বিকালে রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউসে প্রথমবার বৈঠক করেছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক দীপক চক্রবর্তীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা এতে যোগ দেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, হামলা পরিকল্পিত এবং রাতের অন্ধকারকেই ওরা বেছে নিয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ঘাতকরা বাঘাইছড়ির দুর্গম সাজেক সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। হামলায় বিদেশি ভারি অস্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। ৭ খুনের ঘটনায় ৪০-৫০ জনকে আসামি করে বুধবার রাতে বাঘাইছড়ি থানায় মামলা করেছে পুলিশ। বিলাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ আলী জানান, কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। ফলে উপজেলায় নৌপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকে।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ওপর আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা সোম ও মঙ্গলবারের হত্যাকাণ্ডের জন্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছেন। সন্তু লারমাকে সতর্ক হওয়ার জন্য হুশিয়ারি করে দেন ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা।

তারা বলেছেন, এসব নারকীয় খুন-খারাবি পরিহার করুন। আর একটা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর লাশ পড়লে আমরা বসে থাকব না। প্রতিবাদ নয়, হবে প্রতিরোধ। সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়া হয়।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এমপি দীপংকর তালুকদার বলেন, ওরা গুলি করবে আর আমরা গুলি খেতে থাকব, তা হয় না। অবিলম্বে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ সন্ত্রাস নির্মূল করতে হবে।

নেতাকর্মীদের তিনি বলেন, সতর্ক থাকুন। গুলি কেবল সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার প্রাণ কাড়েনি, আমাদেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। ঐক্যবদ্ধ থাকুন, সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করুন।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন, স্ত্রীর সামনে নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে সুরেশকে। জনগণ আইন হাতে তুলে নিলে থামানো যাবে না। আমরা নামলে জেএসএস, ইউপিডিএফের অস্তিত্ব থাকবে না।

জেলা যুবলীগ সভাপতি ও রাঙ্গামাটি পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিবাদ নয়, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নিরাপত্তার জন্য পাহাড়ে পর্যাপ্ত সেনাক্যাম্প স্থাপনেরও দাবি জানান তিনি।

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. শহীদুজ্জামান রোমান বলেন, চাঁদাবাজির টাকায় পাহাড়ে অস্ত্র কিনছে জেএসএস সন্ত্রাসীরা। সেই অস্ত্র দিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে।

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হৃদয় বিকাশ চাকমা জেএসএসর উদ্দেশে বলেন, আমরা আর সহ্য করতে পারব না। হত্যার রাজনীতি বন্ধ করুন।

কাউখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যা করে এখানে আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। এসব নারকীয় হত্যাকাণ্ডের জবাব দিতে হবে সন্তু লারমাকে।

কাপ্তাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অংসুই ছাইন চৌধুরী বলেন, সুরেশ কান্তির পর আমরা আর কোনো আওয়ামী নেতাকর্মীর লাশ চাই না। জেএসএস সন্ত্রাসীরা আমাকেও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর বলেন, জেএসএস সন্ত্রাসীরা নিরীহ নেতাকর্মীদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। আমরা বসে থাকতে পারি না।

জনসংহতি সমিতির প্রতিবাদ : ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে পাহাড়ে দুই দফা হত্যাকাণ্ডের জন্য জনসংহতি সমিতির সদস্যদের দায়ী করে বিভিন্ন সংগঠনের দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে সংগঠনটি।

সমিতি বলেছে, এসব হত্যার সঙ্গে জনসংহতি সমিতি কোনোভাবেই জড়িত নয়। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই মনগড়া বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এ অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করবে। পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীলতা করবে।

৭ খুনে ৫০ জনকে আসামি করে মামলা : সাত খুনের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে রাত ৮টায় ৪০-৫০ জনকে আসামি করে বাঘাইছড়ি থানায় মামলা করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ মঞ্জুর বলেছেন, এসআই আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আসামি গ্রেফতারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে তাদের গ্রেফতার করা যাবে। দ্রুতই মামলায় অগ্রগতি আসতে পারে।

যৌথ বাহিনীর অভিযান : নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তরা বলেছেন, খুনিদের ধরতে প্রয়োজনে এলাকা কর্ডন করে অভিযান চালানো হবে। এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। অভিযান চলছে।

সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া : সুরেশ কান্তির লাশ রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে তার গ্রামের বাড়িতে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বিলাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ আলী বলেছেন, এখনও মামলা হয়নি। সুরেশ কান্তির ছেলে বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করবেন বলে জানানো হয়েছে। জড়িতদের খুঁজতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে।

শিক্ষকদের মানববন্ধন : ব্রাশফায়ারে নিহত ৭ জনের স্মরণে বুধবার উপজেলা সদরে শোকযাত্রা ও মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকরা। সকাল থেকে উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী ও জনসাধারণ কালো ব্যাজ ধারণ করে নিহতদের শ্রদ্ধা জানান।

ঘটনায় নিহত শিক্ষক আমির হোসেনের কিশোলয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দুপুরে শোকযাত্রা করে উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ করেছে।

খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবিতে উপজেলা পরিষদের সামনে বিকালের দিকে শিক্ষক সমিতির ব্যানারে মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা।

এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষকরা খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান। ১৮ মার্চ ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে ফেরার পথে ৯ কিলোমিটারে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ৭ জন নিহত হন।

ঘটনাপ্রবাহ : উপজেলা নির্বাচন ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×