সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদ হলেই বাড়ে তৎপরতা

বাস্তবায়ন হয়নি দেড়শ’ সুপারিশের অধিকাংশ

উপেক্ষিত আদালত ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাও * চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা’

  কাজী জেবেল ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাস্তবায়ন হয়নি দেড়শ’ সুপারিশের অধিকাংশ

সড়কে কোনো দুর্ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ হলেই বাড়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নানা তৎপরতা। ‘নিরাপদ সড়ক’ নিশ্চিতে ঢাকঢোল পিটিয়ে গঠন করা হয় বিভিন্ন স্তরে কমিটি ও উপকমিটি।

বৈঠকের পর বৈঠক চলে কয়েক মাস। নেয়া হয় নানা পদক্ষেপ। দেয়া হয় সুপারিশমালা। বছরের পর বছর নানা প্রক্রিয়ার অজুহাতে ঝুলে থাকে এগুলো।

বাস্তবায়ন হয় না অধিকাংশ পদক্ষেপ ও সুপারিশ। আবার আগের অবস্থানে ফিরে যায় সবকিছু। ঝরতে থাকে একের পর এক প্রাণ। দীর্ঘ হয় সড়কে মৃত্যুর মিছিল।

এবারও ব্যত্যয় ঘটেনি। বাসচাপায় বিইউপির (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার পরপরই আগের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। চলছে তাদের কর্মব্যস্ততা।

দেয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে নিজেদের ব্যর্থতার কথা সরাসরি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এ পর্যন্ত ১২৯ দফা সুপারিশ করেছে সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও সংস্থা। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও দেয়া হয়েছে আরও ২১টি সুপারিশ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাও উপেক্ষিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে দেয়া আদালতের নির্দেশনাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা তাদের স্বার্থের বাইরের কোনো সুপারিশ মানতে নারাজ বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র জানায়, গত বছর রাজধানীর কুড়িলে দুই বাসের রেষারেষিতে চাপা পড়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের উত্তাপে কিছু কিছু নির্দেশনা অনসুরণ করা হলেও পরে বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৫ সালে সিটিং সার্ভিস বন্ধের নামে যাত্রী জিম্মি করে পুরো ঢাকায় পরিবহন নৈরাজ্য তৈরি করেছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। ওই ঘটনায় গঠিত কমিটি ২৬ দফা সুপারিশ করেছিল।

কিন্তু ভাড়া নৈরাজ্য, রুট ফ্রাঞ্চাইজিংসহ বেশির ভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। সড়ক নিরাপত্তায় বিআরটিএ গঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উপকমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ৮৬টি সুপারিশ করেছিল; যার সিংহভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা, ২০১৭-২০২০’ বাস্তবায়নে চিঠি চালাচালি ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনায় গঠিত কমিটির সুপারিশের সিংহভাগ সুপারিশই অবাস্তবায়িত।

এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান দাবি করেন বেশির ভাগ সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সড়ক নিরাপদ করার জন্য আমরা সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যেসব সুপারিশ এখনও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি সেগুলো শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন সড়ক বিশেষজ্ঞ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবায়ন কেউ করছে এমনটি দেখা যাচ্ছে না। যে কোনো সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত দুর্ঘটনা কমবে না। তিনি বলেন, মালিক ও চালকরা একটু সচেতন হলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। চালকদের নিয়োগপত্র ও বেতন-ভাতা দেয়া হলে তারা সচেতনভাবে গাড়ি চালাবেন। পাশাপাশি পুলিশের অহেতুক হয়রানিও বন্ধ করতে হবে।

সরকারের বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। তার নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিগত দিনগুলোতে অনেক সুপারিশ করেছি। এসব বাস্তবায়ন হয়নি। এখন সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি কমিটির সদস্য হিসেবে আছি। এ কমিটিতে যে সুপারিশ করব তা বাস্তবায়ন হবে কিনা- তাও জানি না।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর প্রগতি সরণিতে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় মারা যান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। এ ঘটনার পরই সুপ্রভাত কোম্পানির বাস চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। শিক্ষার্থীরা ফের রাজপথে আন্দোলনে নামেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সড়ক নিরাপত্তায় বিভিন্ন সময়ে যেসব সুপারিশ উঠে এসেছে সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনা কমবে না। সড়কে মানুষের মৃত্যুর মিছিলও থামবে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়।

ওই সময় ঢাকা শহরে গণপরিবহন চলাকালে সবসময় দরজা বন্ধ রাখা এবং বাস স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে বিআরটিএ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন রাজধানীর পল্টন, শাহাবাগ, ফার্মগেট, বনানী, মগবাজার, বাড্ডাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোয় দেখা গেছে, কোনো বাসই দরজা বন্ধ করে যাত্রী বহন করছে না। সব যানবাহনের দরজাই খোলা।

এছাড়া গণপরিবহনে (বিশেষত বাসে) দৃশ্যমান দুটি স্থানে চালক ও হেলপারের ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর, মোবাইল নম্বর প্রদর্শন নিশ্চিত করার কথা থাকলেও রাজধানীর কোনো বাসেই তা দেখা যায়নি।

স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও রাজধানীর প্রায় সব ক্রসিংয়ে পুলিশের হাতের ইশারায় গাড়ি চলে ও বন্ধ হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আমরা যেসব সুপারিশ করি, সেগুলোও কেউ মানে না।

আমরা বলেছি, যানজট কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সঠিক রাখতে হবে। কে শোনে কার কথা। আমরা সড়ক দখলমুক্ত করার দাবি সবসময় করে আসছি। কিন্তু দিন দিন দখলদারের সংখ্যা বাড়ছে।

এছাড়া সড়ক ও মহাসড়কে যানজট থাকায় আমাদের চালকরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। পরিবহন মালিকরা নিয়ম মানছেন না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গাড়ি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। একজন মালিক গাড়ি নামানোর পর তা শ্রমিক ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেগুলো আগে বন্ধ করতে হবে।

আরও জানা গেছে, রাজধানীতে গণপরিবহনের নৈরাজ্য সবেচেয়ে বেশি। পুরো ঢাকাই যেন বাস স্টপেজে পরিণত হয়েছে। ইচ্ছে মতো ভাড়া আদায় করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। সিটিং সার্ভিস ও স্পেশাল সার্ভিসের নামে সর্বনিু ১০-২০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসা ও হাতাহাতি নিত্যদিনের চিত্র। এসব নৈরাজ্য বন্ধ করতে ‘সিটিং সার্ভিসহ ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে সুষ্ঠু যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি ২০১৭ সালে ২৬ দফা সুপারিশ করেছিল।

ওই সুপারিশে রুট পুনর্বিন্যাস করে ফ্র্যাঞ্চাইজিং পদ্ধতি চালু করা, রাজধানীতে বিআরটিসির বাস বাড়ানো, আন্তঃজেলা বাস ও ট্রাক টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্টপেজ ছাড়া রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করাও ছিল সুপারিশে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কমিটির ২৬ দফা সুপারিশকে ৮ দফায় সংকুচিত করে তা বাস্তবায়নে ঢাকা রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটিতে (আরটিসি) পাঠানো হয়। কিন্তু ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি আরটিসি। যদিও রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং করার উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

আরও জানা গেছে, সড়কের দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশের কমে নামিয়ে আনতে সরকার ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ২০১৭-২০২০’ প্রণয়ন করেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় জানানো হয়, কর্মপরিকল্পনাটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিআরটিএ’র একজন কর্মকর্তা জানান, ওই চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ওই চিঠির আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। একইভাবে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উপকমিটির ৮৬ দফা সুপারিশের কিছু কিছু বাস্তবায়ন হলেও বেশির ভাগই প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

তবে আবরারের মৃত্যুর পর এবারই প্রথম সংশ্লিষ্টরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে ব্যর্থতার কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চে আয়োজিত ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ঢাকা শহরের পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাই দায়ী। আবরারের মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এখন চূড়ান্ত সময় এসেছে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×