প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ

নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় মত্ত চালকরা

  শিপন হাবীব ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় মত্ত চালকরা

সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামছে না। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসের অনৈতিক প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

প্রতিনিয়ত মূল্যবান জীবন নষ্ট হচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আতঙ্কিত। ট্রাফিক সপ্তাহের মেয়াদ বাড়ানোসহ সংশ্লিষ্টদের শত চেষ্টাতেও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। বাসসহ সব ধরনের যানবাহন চলছে আগের মতোই। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘বাস দাঁড়ানো নিষেধ, দাঁড়ালেই দণ্ড’ লেখা এমন শত শত সাইনবোর্ড রাস্তার পাশে, মোড়ে বসানো হলেও তাতে প্রতিকার মিলছে না। বরং ওই সব সাইনবোর্ড ঘেঁষেই বাসগুলো দাঁড়াচ্ছে। জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ তেমনটা ব্যবহার করেন না পথচারীরা। চালকরাও তোয়াক্কা করছে না জেব্রা ক্রসিংয়ের। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিশেষ কয়েক স্পট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, চালকরা আগের মতোই বেপরোয়া। নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতায় তারা মত্ত।

মঙ্গলবার প্রগতি সরণির নদ্দায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী বাসচাপায় নিহত হন। পথচারী পারাপারের সুনির্দিষ্ট পথ জেব্রা ক্রসিংয়েই তার প্রাণ যায়। বাসচালকের অনৈতিক প্রতিযোগিতা আবরারের প্রাণ কেড়ে নেয়। রাজধানীতে এমন বর্বর ঘটনা অহরহ ঘটাচ্ছে কতিপয় বাসচালক। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা এলাকায় দেখা গেছে, শুধু বাস নয়, বিভিন্ন যানবাহনের চালকরাও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। কার আগে কে যাবে এমন প্রতিযোগিতায় তারা পাল্লা দেয়। নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামার নিয়ম এবং সাইনবোর্ড থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। জেব্রা ক্রসিং থাকলেও তা ব্যবহার করছে না পথচারীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রাফিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে আয়োজিত ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। যারা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করবে না এবং জেব্রা ক্রসিং ছাড়া রাস্তা পার তবে তাদের আটক করতে ট্রাফিক পুলিশকে তিনি নির্দেশ দেন।

সার্ক ফোয়ারা এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট মো. শিমুল হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার ভোর ৭টায় তিনি এ এলাকায় আসেন। বেলা ২টায় তার ডিউটি শেষ। তিনি বলেন, চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে আমাদের হাজার চেষ্টাও কাজে আসছে না। সড়কে আমরা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারছি না। মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে প্রাইভেট কার, মাইক্রো, যাত্রীবাহী বাসসহ কোনো যানবাহনের চালকই ট্রাফিক আইন মানছে না। নির্ধারিত স্থানে স্টপেজ ও জেব্রা ক্রসিং থাকলেও কেউ মানছে না। আমরা তো মেশিন না, শত শত পথচারী আর যানবাহনের চালক আইন অমান্য করছে। কতজনকে, কয়টি যানবাহন আমরা আটক করব! বেপরোয়া বাস থামালে বাসের যাত্রীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলা হয়, ‘ওই ট্রাফিক তাড়াতাড়ি কর, অফিস আছে, বাদ দে, ওই চালক তুমি বাস টান দেও... আমরা আছি।’ এমন বাক্যের সুযোগ নেয় চালক ও হেলপাররা। ওই সময় দ্রুত বাস টান দেয়। স্টপেজ ছেড়ে যেতেও পারি না।

একই অবস্থা শাহবাগ মোড়েও। স্টপেজ ছাড়ামাত্রই বিশেষ বাসগুলোর চালকরা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সড়কজুড়ে কার আগে কে যাবে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। অবস্থার পরিবর্তন হয়নি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়েও।

শাহবাগ ও কাকরাইল মোড়ে দায়িত্বরত দু’জন ট্রাফিক পুলিশ জানান, তাদের কিছুই করার নেই। দেশ আধুনিক হচ্ছে, অথচ আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঝ সড়কে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছি। ট্রাফিক আইন মানার বা বাতি অনুসরণ করার ধারেকাছেও কেউ নেই। ট্রাফিক পুলিশ তো পুরো সড়কে থাকে না। নির্দিষ্ট মোড়ে মোড়ে থাকে। ফলে মোড় ছাড়া সড়কে বাসগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরবর্তী মোড় পর্যন্ত তাদের প্রতিযোগিতা ছোটখাটো রেসে পরিণত হয়।

মতিঝিল শাপলা চত্বর, গুলিস্তান মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব. হাইকোর্ট, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালী, বানানী, কাকলি এবং নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরির অবস্থা একইরকম। এছাড়া কমলাপুর স্টেশনের সামনে, মালিবাগ মোড়, আবুল হোটেল, নতুন বাজার সড়কে যানবাহনের একই অবস্থা। এসব স্থানে বেপরোয়া গতিতে চলতে দেখা গেছে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনকে। বেপরোয়া চলতে দেখা গেছে মোটরসাইকেলও।

যাত্রী ওঠানামানোর বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা পদে পদেই দেখা গেছে। বাংলামোটর মোড় থেকে একটু দূরে বাস স্টপেজ নির্ধারণ করা হলেও বাসগুলো সেখানে না থেমে আগের মতোই ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে যাত্রী ওঠানামার কাজ করছে। সড়ক ঘেঁষে উন্নয়ন প্রকল্প চলায় সড়কের অনেক অংশ সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু বাস ঠিকই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সড়কে ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ে তাদের সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে সড়কের অনিয়ম রয়ে গেছে আগের মতোই।

নিরাপদ সড়ক চাই কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বাসচালকরা কোনো কিছু মানছে না। এক প্রকার ফ্রিস্টাইলে তারা গাড়ি চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সবার আগে দরকার জনসচেতনতা, আইন মানা। আন্দোলন দরকার আছে, কিন্তু সেটা হলেও কি সমাধান হচ্ছে। মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলন কিংবা সংশ্লিষ্টরা সোচ্চার হলেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না। এজন্য দরকার পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের। তিনি বলেন, সাধারণ পথচারীদেরও আইন মানতে হবে। একের পর এক যাত্রী প্রাণ হারালেও কয়টা চালকের শাস্তি হয়েছে- প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বাড়ছে। যাদের এসব নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারা শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যেই রয়েছেন। তিনি বলেন, যতক্ষণ না পরিবহন সেক্টরে কর্মরতদের যথাযথ নিয়ম-কানুন মানা, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং দায়িত্বশীলতা না শেখানো যাবে ততদিন সড়কে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে না। পরিবহন খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সেনানিবাস এলাকায় আইন মেনে যান চলতে পারলে বাইরে কেন পারবে না।

বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক যুগান্তরকে জানান, সড়কে মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এসব দুর্ঘটনা নয়, হত্যার শামিল। দিনের পর দিন সড়কে তাজা প্রাণ ঝরছে, কোনো প্রতিকারই যেন নেই। সড়ক থেকে যারা বেআইনিভাবে শত শত কোটি টাকা আদায় করছে তাদের গলায় শিকল পরাতে হবে। সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন তা যথাযথ। তারাই পারবে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×