রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারিনি: ডিএমপি কমিশনার

সুপ্রভাতের বাসটির বিরুদ্ধে ছিল ২৭ মামলা * ঢাকা-বি-বাড়িয়ার রুট পারমিটে ঢাকায় চলত বাসটি * দুর্ঘটনার কারণ হলে পথচারীকেও আটক করুন * প্রধান সড়কে লেগুনা চলবে না

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারিনি: ডিএমপি কমিশনার

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে চাপা দেয়া সুপ্রভাত পরিবহনের বাসটির রুট পারমিট ছিল না।

ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুট পারমিট দিয়েই ঢাকা মহানগরে চলত ওই বাসটি। এর আগে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা ও রুট পারমিট ব্যতীত চালানোয় বাসটির বিরুদ্ধে ২৭ বার মামলাও হয়েছে। মেধাবী ছাত্র আবরারের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমরা রাস্তায় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারিনি।

এ ব্যর্থতা আমাদের সবার। এর দায়ভার কেউ এড়াতে পারে না। আমরা কেউ চাই না এ রকম দুর্ঘটনা হোক। রাজধানীর গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চে বৃহস্পতিবার দুপুরে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

কমিশনার প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘তাহলে সুপ্রভাত পরিবহনের এ বাসটি রাজধানীতে কিভাবে চলাচল করছিল?’ এ অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়ী করেন তিনি। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘যে জেব্রা ক্রসিং মানুষকে রাস্তা পারাপারে নিরাপদ করে সেই জেব্রা ক্রসিংয়েই প্রাণ দিতে হল আবরারকে। সুপ্রভাত গাড়িটি এ অপরাধও করেছে।’ কমিশনার আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরের পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাই দায়ী। আবরারের মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এখন চূড়ান্ত সময় এসেছে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার।’

মালিক-শ্রমিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, টিকিট কাউন্টার করে বাস চালান, লক্কড়-ঝক্কড় ও মডেলবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামাবেন না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করুন। এসব না করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে আর নয়। তিনি বলেন, রাস্তার পাশে স্টপেজে গাড়িগুলোকে দাঁড় করান। সেখানে আড়াআড়িভাবে দাঁড় করাবেন না। এটি করলে রেকারিং করে ডাম্পিং করা হবে। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।

পরিবহন শ্রমিকদের উদ্দেশে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ডিএমপি কোনো গাড়ি রিকুইজিশন করে না। গাড়ি লাগলে টার্মিনাল থেকে নেয়া হয়। জাবালে নূরের দুটি ও সুপ্রভাতের একটি গাড়ির রুট পারমিট এবং নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। বাকি বাসগুলোর রুট পারমিট আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। বিআরটিএতে সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজে গরমিল থাকলে সেগুলোরও রুট পারমিট বাতিল করা হবে। যেগুলোর কাগজপত্র ঠিক থাকবে সেসব গাড়ি অচিরেই চালুর ব্যবস্থা করা হবে।’ মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, চুক্তিভিত্তিক কাজ বন্ধ করেন।

বেতনভিত্তিক মজুরি চালু করেন। বাসের রুট ঠিক রাখুন। এক লাইনের বাস অন্য লাইনে চালাবেন না। ছাত্রদের অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘সড়ক অবরোধ করে কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করবেন না। দায়িত্বশীল আচরণ করুন। আপনারা ক্লাসে ফিরে যান। আমাদের কাজ করতে সহযোগিতা করুন। চালক ও গাড়ি আটক হয়েছে। গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেহেতু জেব্রা ক্রসিংয়ে মানুষ মেরেছে তাই চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে।’

কোনো গাড়ি আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করলে বা রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশ দেন কমিশনার। তিনি বলেন, বারবার বলছি, কাজ হচ্ছে না। এখন আমাদের কঠোরভাবে আইন প্রয়োগে যেতে হবে। এখন থেকে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ালে পথচারীর বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যাই। জবাব দিতে পারি না। কিন্তু এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। জনগণ যাতে ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করেন, সেজন্য ট্রাফিক বিভাগকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছি। দুর্ঘটনা ঘটানোয় বাস যেমন আটক করেন, তেমনি দুর্ঘটনার কারণ হলে পথচারীকেও আটক করুন। আটক করে মিডিয়াকে দেখান, দেশের মানুষকে দেখান যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে, জেব্রা ক্রসিং ব্যতীত রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে।

তিনি বলেন, তিনটি বিষয় আমরা ক্লিয়ার রাখতে চাই। এক, ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস আর ঢাকা শহরে চলতে দেব না। নির্ধারিত বাস স্টপেজের বাইরে বাস দাঁড়াতে পারবে না, দরজা বন্ধ রাখুন। জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে বাস দাঁড় করুন, যাত্রী সাধারণ ও পথচারীকে নিরাপদে রাস্তা পার হতে দিন। দুই, অভিযান জোরদার হবে ইনশাআল্লাহ। তিন, দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ালে পথচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ফৌজদারি মামলা, ড্রাইভার আটক : ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই কিন্তু গাড়ি চালাচ্ছে। কিভাবে সম্ভব? এটা হতে দেয়া যাবে না। ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশ দিচ্ছি, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে কেউ ড্রাইভিং সিটে বসতে পারবে না। লাইসেন্স নেই এমন কেউ গাড়ি চালালে আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে জরিমানা ও মামলা তো বটেই, আটকও করুন। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দিন। কারণ একটা ভুয়া ড্রাইভার একশ’টি ভালো ড্রাইভারের সুনাম নষ্ট করছে।

প্রধান সড়কে লেগুনা চলবে না : ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঢাকা শহরের প্রধান সড়কে লেগুনা চলবে না। এ নির্দেশনা বলবৎ রয়েছে। ১১ বছরের শিশু লেগুনা চালায়, ভটভটি, ব্যাটারিচালিত রিকশা চালায়। কিন্তু লাইসেন্স নেই। এসবেও এখন ট্রাফিক বিভাগকে নজর দিতে হবে। প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, লেগুনায় আপনাদের (ট্রাফিক পুলিশ) আগ্রহ বেশি। এসব বন্ধ করেন। কাজ করেন সড়কে ও পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য। জনগণের সহায়তা নিন, মালিকপক্ষের সহায়তা নিন। কিভাবে সমাধান করা যায় সেটা করুন। একসঙ্গে একযোগে কাজ করুন।

তিনি বলেন, শ্রমিকবিরোধী, মালিকবিরোধী কোনো কাজ আমরা করব না। কিন্তু আমাদের কথা দিতে হবে, সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করবেন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রুট পারমিটবিহীন গাড়ি চালাবেন না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, সড়কের শৃঙ্খলা আনতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রধান সমস্যা চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো। কাউন্টারে টিকিট দেয়া সিস্টেম চালু হলে চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো বন্ধ হবে। সেই সঙ্গে কমবে সড়কের দুর্ঘটনার চিত্র। চালকের লাইসেন্স না থাকলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে অন্যায় ছাড়া ব্যবস্থা নিলে এটা ঠিক হবে না। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে আগামী মাস থেকে কাউন্টারের মাধ্যমে টিকিট কেটে গাড়িতে যাত্রী নেয়া হবে। নতুন প্রশিক্ষিত ড্রাইভার তৈরিতে রাজউক ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতিকে পূর্বাচলে জায়গা বরাদ্দ দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা পরিবহন মালিক সমিতি নিজেদের টাকা খরচ করে দক্ষ ড্রাইভার তৈরি করব।

বাংলাদেশ পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা হলে আমরা সবাই একতরফা ড্রাইভারকে দোষী করি। সড়কে চলাচলে আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের শিক্ষা জীবনে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে কোনো শিক্ষা দেয়া হয় না। সেজন্য ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পাঠ্যপুস্তকে ট্রাফিক আইন অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

সচেতনতামূলক ওই অনুষ্ঠানে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায়, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, সায়েদাবাদ বাস মালিক সমিতিসহ পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাপ্রবাহ : বাসচাপায় আবরার নিহত

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×