অস্ত্র খালাস না করায় শ্রমিকদের হত্যা করে পাকিস্তানিরা

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হত্যা

আজ ২৪ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যকার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়ে যায়। সৈয়দপুরে বিহারি ও পাকবাহিনী এদিন গণহত্যা চালায়।

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, আমি কঠোর সংগ্রামের জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানি না। আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, মানুষের মতো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকব, নয়তো সংগ্রামে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।

বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। প্রায় তিন ঘণ্টার এ বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে আমরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে অবিলম্বে সংসদ অধিবেশন ডেকে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছি।

একাত্তরের এ দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভবনে বিভিন্ন সময়ে সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশে শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় বিরামহীনভাবে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের (২৫ মার্চ, ১৯৭১) মধ্যে সমস্যার কোনো সমাধান না হলে বাঙালিরা নিজেদের পথ নিজেরা বেছে নেবে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সরকারের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলার জনগণের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা বরদাশত করা হবে না।

এদিন করাচি থেকে সোয়াত নামের একটি জাহাজ আসে। এতে পাঁচ হাজার ৬৩০ টন অস্ত্র আনা হয়। অস্ত্র নামাতে গিয়ে বাঙালি শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাক হানাদার সামরিক অফিসারদের মুখের ওপর শ্রমিকরা অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানায়। অবরোধ করে রাখে জাহাজটিকে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাকামী শ্রমিক।

একাত্তরের ২৪ মার্চ থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা একে একে ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট ছোট পার্লামেন্টারি দলের সব নেতাই এদিন কারাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ভুট্টোর সফরসঙ্গী ১৩ জনের সাতজনই এদিন ঢাকা ত্যাগ করেন।

এদিনও সারা বাংলাদেশে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে পতপত করে। ইস্ট বেঙ্গল পাকিস্তান রাইফেলসের যশোর ট্রাংক রোডের অফিসেও এদিন ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এদিকে ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে পাকিস্তান থেকে খান আবদুল কাইয়ুম খান ঢাকায় আসেন। কাইয়ুম ঢাকা আসার পরই ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন।

এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের ২৩তম দিনে (২৪ মার্চ, ১৯৭১) দেশের সর্বস্তরের পেশাজীবী-কর্মজীবী মানুষ ও সংগঠন বঙ্গবন্ধুর দেয়া কর্মসূচি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এতদিন যারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, তারাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন ব্যক্ত করতে শুরু করেন। ২৪ মার্চ সমগ্র বাংলাদেশ একটি বিস্ফোরণোন্মুখ গ্রেনেডের মতো উত্তপ্ত অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য কারও যেন তর সইছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলি, আন্দোলনরত বাঙালির ওপর নির্যাতন, চরম দুর্ব্যবহার ও পাকিস্তানের পক্ষে অনুষ্ঠান প্রচারের চাপের মুখে ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রের সর্বস্তরের বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলী কাজ বর্জন করে কর্মস্থল ত্যাগ করেন।

টিভির বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলীদের বর্জনের ফলে এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা টিভির সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়। পূর্বপাকিস্তান রাইফেলসের সদর দফতর যশোরে বাঙালি অফিসাররা সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেন। রাইফেলসের জওয়ানরা ‘জয় বাংলা-বাংলার জয়’- গান গাইতে গাইতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রতি পূর্ণ সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার জানিয়ে ফ্ল্যাগ স্যালুট করেন। ভোলা ও বগুড়ায়ও রাইফেলসের জওয়ানরা নিজ নিজ ছাউনিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এদিন পূর্বপাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন, সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন, ইপিআইডিসি, খাদ্য পরিদর্শক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একাত্মতা ব্যক্ত করে বলেন, চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আর কেউই নিজ নিজ অফিসে ফিরে যাব না। দেশকে শত্রুমুক্ত করেই কেবল স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কর্মস্থলে যোগদান করব।

দেশের বিভিন্ন স্থানে রাইফেলস ব্যাটালিয়নে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের খবর দ্রুত পৌঁছে যায় সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে। নরঘাতক ইয়াহিয়া প্রতিশোধ আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে গোপনে দেশের প্রতিটি সামরিক ছাউনিতে নির্দেশ পাঠায় যে, আর সময় দেয়া যাবে না। সুযোগ বুঝে বাঙালি নিধন কর্মসূচি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। ক্রুদ্ধ ইয়াহিয়া-টিক্কারা গোপন বৈঠক করে প্রতিটি ক্যান্টনমেন্টেও অপারেশন শুরু করার নির্দেশ জারি করে। গোপনে তারা যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, খান এ সবুর খান, মাওলানা ইউসুফ, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামানদের সঙ্গে। এরই মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী এ চক্রটি রাজাকার-আলবদর বাহিনী গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, ভারতীয় হিন্দুবাদীরা ষড়যন্ত্র করে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করতেই পূর্বপাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুশমনি শুরু করেছে। আর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ওই ষড়যন্ত্রের হোতা হিসেবে দেশবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×