চালক-হেলপারের স্বীকারোক্তি

চাকায় পিষ্ট করা হয় সিকৃবি শিক্ষার্থীকে

প্রতিবাদে উত্তাল সিলেট * অবরুদ্ধ সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত, সংহতি জ্ঞাপন * ওয়াসিমের দাফন সম্পন্ন * সিলেট নগরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ধাক্কায় আহত ২

  সিলেট ব্যুরো, মৌলভীবাজার ও নবীগঞ্জ প্রতিনিধি ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিতে নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় অবস্থান নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: যুগান্তর

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঘোরি মো. ওয়াসিম আব্বাসকে (২১) বাসচাপায় ‘হত্যাকারী’ উদার পরিবহনের বাসচালক জুয়েল আহমদ ও হেলপার মাসুক মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। নিহত ওয়াসিম হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার রুদ্রগ্রাম এলাকার মাহবুব ঘোরির ছেলে।

তিনি সিকৃবির বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এদিকে ওয়াসিম আব্বাস ‘হত্যা’র প্রতিবাদে রোববার উত্তাল ছিল সিলেট। ক্যাম্পাস ও নগরীর রাজপথ ছিল প্রতিবাদমুখর।

পুলিশ জানায়, শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় চালক জুয়েল আহমদ ও রাত ২টার দিকে সহকারী মাসুককে পৃথক স্থান থেকে আটক করে মৌলভীবাজার মডেল থানা পুলিশ। আটক বাসচালক জুয়েল আহমদ মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার বারউড়া এলাকায় হিরণ মিয়ার ছেলে। সে সিলেট কদমতলীতে ভাড়া বাসায় থাকে। সহকারী মাসুক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ঝাউয়া এলাকায় দৌলত মিয়ার ছেলে। ঘাতক বাস ও অভিযুক্তদের মৌলভীবাজার মডেল থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ারুল হক বলেন, ঘটনার পর রাতেই মৌলভীবাজার মডেল থানা পুলিশ স্থানীয় থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে চালক ও সহকারীকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দায় স্বীকার করেছে। তিনি বলেন, ওয়াসিমের ৯ বন্ধু ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং হেলপারের স্বাকীরোক্তিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। নিহত ওয়াসিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা মামলা করবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে না চাইলে, পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

চালক ও সহকারীর বরাত দিয়ে পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘শনিবার বিকালে নবীগঞ্জের টোলপ্লাজা থেকে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশে সিকৃবির কয়েকজন ছাত্র উদার পরিবহনে বাসে ওঠেন। এ সময় সহকারী মাসুক তাদের কাছে ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করলে ওয়াসিম ও তার বন্ধুরা ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভাড়া কম দেয়ার কথা জানান। এতে সহকারী মাসুক ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে ছাত্ররা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নেমে যান। বাস থেকে নামার সময় পেছন থেকে বাসের সহকারী তাদের গালি দেয়। এ সময় ওয়াসিম বাসের সিঁড়িতে উঠে কেন গালি দেয়া হল জিজ্ঞেস করে। এ সময় চালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তখনই সহকারী মাসুক ওয়াসিমকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে ফেলে দিলে বাসের পেছনের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

প্রতিবাদে উত্তাল ক্যাম্পাস-রাজপথ, ক্লাস বর্জন : শিক্ষার্থী ওয়াসিম আব্বাস আদনানকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ‘হত্যা’র প্রতিবাদে রোববার উত্তাল ছিল সিলেট। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও নগরীর রাজপথ ছিল প্রতিবাদমুখর। সকালে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন সিকৃবির ভিসি, রেজিস্ট্রার শিক্ষক ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মসূচিতে যোগ দেন শিক্ষার্থীরাও। এদিন কোনো ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। স্থগিত করা হয় পূর্বনির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী একাডেমিক কাউন্সিলের সভা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. জীতেন্দ্র নাথ অধিকারীর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সিকৃবির ভিসি প্রফেসর ড. মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদার, ডিন কাউন্সিলের আহবায়ক প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম, রেজিস্ট্রার মো. বদরুল ইসলাম শোয়েব, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ সায়েম উদ্দিন আহম্মদ, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. নজরুল ইসলাম, অফিসার পরিষদের সভাপতি কৃষিবিদ মো. সাজিদুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. মিটু চৌধুরী, সাদাদলের সভাপতি প্রফেসর ড. এম রাশেদ হাসনাত প্রমুখ।

এদিকে ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালনের পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মিছিল সহকারে নগরী অভিমুখে রওনা হন। তারা চৌহাট্টা পয়েন্টে এসে জড়ো হওয়ার পর চৌরাস্তার মোড় অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় তারা ‘ওয়াসিম হত্যার বিচার চাই, নিরাপদ সড়ক চাই’ স্লোগান দেন। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ চলে। অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা স্থগিত, ক্লাস বর্জনসহ ৩ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়।

কর্মসূচি চলাকালে অবরোধকারীদের কবলে পড়েন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের গাড়ি। এ সময় তিনি আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি, বাসের চালক ও হেলপারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জের ধরে একটি ছাত্রকে বাস থেকে ফেলে দেয়া হয়। এতে ছাত্রটি মারা যায়। এটা নিশ্চিত একটা হত্যাকাণ্ড। পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ইতিমধ্যে আটক করেছে। তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হবে।’

শিক্ষার্থী ওয়াসিম আব্বাসের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শুনে সবার মতো ব্যথিত হয় ক্যাম্পাসের প্রিয় কুকুর ট্রাম্পিও। রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন ক্যাম্পাস থেকে মিছিল সহকারে নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টে যায় তখন ট্রাম্পিও ছিল মিছিলের সঙ্গী। মিছিল-অবরোধে পুরো সময় সে উপস্থিত ছিল।

ওয়াসিম হত্যার প্রতিবাদে এদিন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার ভবনের সামনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে কর্মসূচি পালিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীরা অংশ নেন।

ওয়াসিম আব্বাসের দাফন সম্পন্ন : ওয়াসিম আব্বাসকে বাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার ঘটনায় চালক ও হেলপারের কঠোর শাস্তির দাবিতে নবীগঞ্জ উপজেলায় মহাসড়ক অবরোধ করে দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এই নবীগঞ্জেই ওয়াসিমের বাড়ি। দুপুর ১২টায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। এ সময় মহাসড়কের যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

এদিন দুপুরে জানাজা শেষে ওয়াসিমকে পারিবারিক কবরস্থানে দফন করা হয়। এতে হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদ, নবীগঞ্জ-বাহুবলের সার্কেলের সিনিয়র পুলিশ সুপার পারভেজ আলম চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।

দুর্ঘটনায় আহত ২ : ওয়াসিম হত্যার প্রতিবাদে দুপুর ১২টার দিকে সিলেট নগরীতে বিক্ষোভ চলাকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির বাসের চাপায় সিএনজি অটোরিকশার চালকসহ ২ জন আহত হন। দুর্ঘটনার পর লিডিং ইউনিভার্সিটির বিটিআরসি বাসের (ঢাকা মেট্রো-ভ ১১-৫২০৩) চালক পালিয়ে যায়। দুর্ঘটনায় আহতরা হলেন- যাত্রী পনিটুলা এলাকার নিরঞ্জন দাসের ছেলে তাপস দাস (৪০) ও সিএনজি অটোরিকশাচালক আফতাব উদ্দিন (৩৫)। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত