ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ

দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১২ বছরে বকেয়া শোধ

সুদের হার ৭ শতাংশ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য প্রযোজ্য নয় * ১ মে থেকে কার্যকর * ঘুষ না নিতে সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের শপথ করালেন অর্থমন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণখেলাপি
ঋণখেলাপি। প্রতীকী ছবি

মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১২ বছরে বকেয়া টাকা পরিশোধের সুযোগ পাবেন ঋণখেলাপিরা। এক্ষেত্রে সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। তবে এ সুযোগ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। ১ মে থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সোমবার রাজধানী শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে নিজের দফতরে ব্যাংকিং খাত সংক্রান্ত এক বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। একইদিন আরেক অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত কর্মকর্তাদের ঘুষ না নেয়ার জন্য শপথ করিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা আজকে (সোমবার) আমাদের ব্যাংক খাত নিয়ে আলোচনা করতে বসেছিলাম। ব্যাংক খাতের দুরবস্থা দূর করতে আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংক খাতের ‘সমস্যা দূর করতে’ একটি কমিটি গঠন করেছিলেন।

ওই কমিটির সুপারিশেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা ঋণখেলাপিদের ঋণ পরিশোধের অর্থাৎ ঋণখেলাপি থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ করে দিচ্ছি। তবে এ সুযোগ অবশ্যই ‘ভালো ঋণখেলাপিদের জন্য’- এমন মন্তব্য করে মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের ব্যাংক খাতে ঋণগ্রহীতা দুই ধরনের। ভালো এবং অসাধু ঋণগ্রহীতা।

ভালো ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা বিশেষ সুবিধা দিচ্ছি।। এক্ষেত্রে যারা ঋণ শোধ করতে না পারার ‘যৌক্তিক’ কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন, তারাই এ সুবিধা পাবেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হননি অথবা বেশ কিছু কিস্তি শোধের পর সুনির্দিষ্ট কারণে আর শোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়েছেন, তাদের জন্য এ সুযোগ।

তবে কারা ভালো ঋণগ্রহীতা তা নির্ধারণের জন্য একটি অডিট কমিটি করে দেয়া হবে। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই খেলাপি ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুযোগ পাবেন খেলাপিরা।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ঋণ নেয়ার সময় সুদের হার যাই থাকুক না কেন, এই সুযোগ নিয়ে খেলাপি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ হারেই সুদ প্রযোজ্য হবে।

আর যারা ‘অসাধু’ ঋণগ্রহীতা অর্থাৎ যারা ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ খেলাপি হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেয়া হবে বলেও হুশিয়ার করেন অর্থমন্ত্রী।

নতুন ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে যারা আসবে, তাদের জন্যও আমরা সুদের হার কমিয়ে দেব। এর মাঝেও যদি কেউ বিপদে পড়ে যায়, তাদের জন্যও অ্যাক্সিটের ব্যবস্থা আছে। আমরা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করব। আমাদের ইনসলভেন্সি আইন তৈরি হচ্ছে। এই আইনের আওতায় নন-পারফর্মিং ঋণগুলো, সব ওই কোম্পানির (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট) কাছে বিক্রি করে দেয়া হবে। তারা এগুলো পাবলিক টেন্ডার দিয়ে বিক্রি করে যা পাবে, তা সরকারকে দিয়ে দেবে।’

অতীত ইতিহাস টেনে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকার সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে, ব্যাংকারদের লাগবে, যারা ঋণগ্রহীতা তাদেরও লাগবে। ঋণগ্রহীতাদের বিকল্প নেই। কারণ তারাই আমাদের কর্মসংস্থান করে, দারিদ্র্য দূর করে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। ঋণগ্রহীতাদের বাদ দিয়ে আমাদের চলার কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনি ভেবে দেখলেন, তাদের যদি অ্যাক্সিটের (ঋণমুক্তি) ব্যবস্থা যদি করে দেয়া যায়, কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায়, তাহলে বোধহয় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হবে। সেই বিবেচনায় তিনি একটা কমিটি করে দিয়েছিলেন। সেই কমিটির কিছু পরামর্শ ছিল, কিভাবে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একটা অ্যাক্সিটের মতো ব্যবস্থা করে দেয়া যায়। আপনারা জানেন, আমাদের দেশে অ্যাক্সিটের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।’

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন।

সোনালী ব্যাংকের সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী : সরকারি খাতের সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ঘুষ না নেয়ার জন্য শপথ বাক্য পাঠ করালেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। রোববার সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে এ শপথ বাক্য পাঠ করান তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, এবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন স্লোগান ‘আমরা আপনার সততায় বিশ্বাসী’। এ স্লোগানকে নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে। দেশে সৎ মানুষের বড় অভাব। আমরা একে অপরের সততায় বিশ্বাস করি না। তবে এখনও পৃথিবীতে সৎ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। যদি তা না হতো তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যেতাম। আমি সততায় বিশ্বাস করি, আমার রক্তে কেউ ইনজেকশন দিয়েও ঘুষ খাওয়াতে পারবে না। আমি চাই আপনারাও এ পথে চলবেন, আপনারাও সৎ থাকবেন।

কর্মকর্তাদের ঘুষ না নেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, আপনারা কি ঘুষ খান? ঘুষ কিভাবে খান? আমাকে তো কেউ ইনজেকশন দিয়েও ঘুষ খাওয়াতে পারবে না। যে ঘুষ খায় এবং যে দেয় উভয়েই সমান অপরাধী।

দেশ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে মুস্তফা কামাল বলেন, চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় হয়েছে ১ হাজার ৯০৯ ডলার। আগামী ৪ বছরের মধ্যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে উন্নীত হবে, অর্থাৎ ১০ শতাংশে দাঁড়াবে।

রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম। ব্যাংকের চেয়ারম্যান আশরাফুল মকবুলের সভাপতিতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, সোনালী ব্যাংকের অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি এখনও অনেক। অবলোপনকৃত ঋণ থেকে আদায় কম। খেলাপি ঋণেরও উন্নতি হয়নি। আবার খেলাপি ঋণের ৯০ শতাংশই কুঋণ।

এটি আদায়ে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিশেষ গোষ্ঠী বা অঞ্চলে ঋণ কেন্দ্রীভূত করা যাবে না। এলসির দায় যেন ফোর্স লোনে পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, বিদেশে সব গ্রাহকদের সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদেরও সেই চর্চা করতে হবে। তবেই ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা বাড়বে। সভাপতির বক্তব্যে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আশরাফুল মকবুল বলেন, হলমার্কের ঘটনার পর ধুঁকছিল সোনালী ব্যাংক।

এটি থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। বড় বড় ঋণ দেয়ার বিলাসিতা থেকে সরে এসেছি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, সোনালী ব্যাংক ৫১টি সেবা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ১৬টি সেবা দিচ্ছে নামমাত্র মূল্যে। রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৫ হাজার কোটি টাকার এলসি খুলেছি। এতে কমিশন পাওয়ার কথা ৫ হাজার কোটি টাকা। পেয়েছি মাত্র ২০ কোটি টাকা। স্বাগত বক্তব্যে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×