উন্নতির ধারায় ফিরেছে সোনালী ব্যাংক

খেলাপি ঋণ আদায় বেড়েছে তিনগুণের বেশি * ভালো অবস্থানে অধিকাংশ সূচক

  হামিদ বিশ্বাস ২৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সোনালী ব্যাংক
সোনালী ব্যাংক। ফাইল ছবি

হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানের ঋণ জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর টালমাটাল অবস্থায় পড়েছিল দেশের শীর্ষ ব্যাংক সোনালী। খেলাপি ঋণ নিয়ে এখনও চরম নাজুক দেশের পুরো ব্যাংক খাত। শুধু ২০১৮ সালেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

তবে এই অবস্থার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ১২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। খেলাপিদের কাছ থেকে পাওনা আদায় বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। ঋণ অবলোপন থেকে আদায়ও বেড়েছে। বেড়েছে পরিচালন মুনাফাও। শুধু তাই নয়, বেশির ভাগ সূচকেই ভালো অবস্থানে আমানত ও শাখা বিবেচনায় দেশের শীর্ষ এই ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর ছিল নির্বাচনী বছর। আর নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ভালো অর্থ আদায় করেছে সোনালী ব্যাংক। সে কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের চেয়ে ভালো করেছে ব্যাংকটি। তাদের মতে, উন্নতির এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংক ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় করেছে ৩ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে আদায় করা হয়েছে ১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ১ হাজার ৯১ কোটি টাকা আদায়ের মধ্যে শীর্ষ খেলাপিদের থেকে আদায় করা হয় মাত্র ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ আদায় বেড়েছে তিনগুণের বেশি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮শ’ কোটি টাকা, কিন্তু অর্জিত হয়েছে ২ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। আগের বছর পরিচালন মুনাফা ছিল মাত্র এক হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কমেছে ব্যাংকটির ব্যয়। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় ছিল এক হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এবার পরিচালন ব্যয় কমে এসেছে এক হাজার ৯০৭ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালের এসব অর্জনের ওপর ভর করে নতুন বছরে ব্যাংকটি সার্বিক সূচকে আরও ভালো করবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ। এ বছর পরিচালন মুনাফার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

এসব বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, হলমার্কের ঘটনার পর সোনালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের যে ঊর্ধ্বগতি ছিল তা রোধে আমি ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে সমানভাবে কাজে লাগিয়েছি। আগে প্রতিটি শাখায় কয়েকজন কর্মকর্তা শুধু ঋণ আদায়ের কাজ করতেন। আমি এসে তা বদলে শাখার সব কর্মকর্তাকে ঋণ আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছি। যারা ভালো করেছে তাদের পুরস্কৃত করেছি। ইতিমধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রথম সারিতে থাকা ১৮৬ জন কর্মকর্তাকে পুরস্কার হিসেবে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছি। এছাড়া রেমিটেন্স ও ট্রেজারিতে ভালো অবদান রাখা কর্মকর্তাদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করেছি। এক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়েছে তরুণ ও উদীয়মান কর্মকর্তাদের।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের ১ হাজার ১৮০টি শাখার খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে। মোট খেলাপি ঋণের ৮৫ ভাগই মাত্র ২০টি শাখায়। এসব শাখায় বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের এই উন্নতির কথা এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের বক্তব্যেও। তবে প্রশংসার পাশাপাশি সতর্কও করেছেন তিনি। সোমবার সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে ফজলে কবির বলেন, সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন সূচকের উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও খেলাপি ঋণ উচ্চমাত্রায় রয়েছে। এটা আরও কমাতে হবে। এলসির দেনা যেন (ফোর্সড লোন) কয়েকগুণ বেশি ঋণে পরিণত না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। একক খাত বা ঋণ কেন্দ্রীভূত না করে এসএমই খাতে বেশি ঋণ দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সোনালী ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে আদায় করা হবে ২ হাজার কোটি এবং অবলোপন থেকে ৭১০ কোটি টাকা। বর্তমান আমানত এক লাখ ৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৪৬ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় নেয়া হবে। একই সঙ্গে বাড়ানো হবে বিনিয়োগও। বিনিয়োগ বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকায় নেয়া হবে। এছাড়া আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্সসহ সার্বিক ব্যবসায়িক সূচকে আরও ভালো করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়, শাখা ব্যবস্থাপক, আঞ্চলিক কার্যালয়প্রধানদের আরও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়েছে।

ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অনুযায়ী, ১ হাজার ১৪৫টি শাখার মধ্যে অতি উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন শাখা ৩৬টি, উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন শাখা ২৩৬টি, মধ্যম ঝুঁকিসম্পন্ন শাখা ২৩৬টি, নিু ঝুঁকিসম্পন্ন শাখা ৫৬২টি এবং নিয়ন্ত্রণকারী কার্যালয়ের সংখ্যা ৭৫টি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×