উপবৃত্তি প্রকল্প একীভূত হয়নি ৭ বছরেও

একে একে মেয়াদ বাড়ছে বিভিন্ন প্রকল্পের * অর্থ সংকটে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট

  মুসতাক আহমদ ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সব উপবৃত্তি প্রকল্প সাত বছরেও এক ছাতার নিচে আনা সম্ভব হয়নি

সব উপবৃত্তি প্রকল্প সাত বছরেও এক ছাতার নিচে আনা সম্ভব হয়নি। উপকারভোগী নির্বাচন ও বণ্টনে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং একই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার সুবিধা দেয়ার মতো ত্রুটি দূর করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে উপবৃত্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০১২ সালে।

কথা ছিল, যখন যেই উপবৃত্তি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে, তখনই সেটি এই ট্রাস্ট ফান্ডের মধ্যে একীভূত হবে। গত ৭ বছরে সবগুলো প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সেগুলো ফের শুরু হয়। এরপর সেই মেয়াদও আগামী জুনে শেষ হবে। এ কারণে ইতিমধ্যে দুটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবু উপবৃত্তি বণ্টনের কাজ ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে আনা হয়নি।

এখানেই শেষ নয়, এই ট্রাস্ট ফান্ড গঠনকালে পরিকল্পনা ছিল সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উৎস থেকেও অর্থের সংস্থান করা হবে। সে অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ডে সরকার ১ হাজার কোটি টাকা ‘সিডমানি’ (যে অর্থের শুধু লাভ ব্যয় করা যাবে) দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সিএসআরের (ব্যবসায়িক সামাজিক দায়বদ্ধতা) একটি টাকাও ফান্ডে নেয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবিএম জাকির হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সব উপবৃত্তি একীভূত করার কাজ মন্ত্রণালয়ের। এ ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে বিভিন্ন সভায় আলোচনা হয়েছে। আলাদা পত্রও দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সিএসআর খাত থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ নেয়া হয়নি। তবে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।

জানা গেছে, ট্রাস্ট ফান্ড থেকে দু’ধরনের অর্থ সহায়তা দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের। একটি হচ্ছে উপবৃত্তি, অপরটি এককালীন অর্থ সাহায্য। সম্প্রতি এমফিল-পিএইচডির উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তাও দেয়া শুরু হয়েছে। ট্রাস্টটি বর্তমানে চলছে কেবল সরকারের বরাদ্দ দেয়া সিডমানি থেকে পাওয়া লাভের অর্থে। গত কয়েক বছর ধরে উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বাড়ছে ব্যয়। কিন্তু সিডমানি থেকে প্রাপ্ত লাভের অর্থে চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছর প্রধানমন্ত্রী থোক বরাদ্দ দিয়ে উপবৃত্তিসহ অন্য কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন। অথচ ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সিএসআরের অর্থ সংগ্রহ করা গেলে এই সংকট তৈরি হতো না।

জানা গেছে, চলতি বছর ২০১৪-২০১৫ থেকে তিনটি শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে উপবৃত্তি ও টিউশন ফি দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ খাতে ১৭০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু ট্রাস্ট ফান্ডে ব্যয়ের মতো আছে ৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯৫ কোটি টাকাই ঘাটতি পড়ে গেছে। এমন অবস্থায় চলতি বছর উপবৃত্তি দেয়া যাবে কিনা- সেটা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ট্রাস্ট ফান্ডের এমডি যুগান্তরকে বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদের সভার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়েছি। তার সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় ওঠে আসবে। আশা করি সব সমস্যার সমাধান আমরা তার কাছ থেকেই পাব।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাস্ট ফান্ডের নবম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়। এরপর সভায় বলা হয়, ট্রাস্টের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে বারবার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদান নেয়া শোভন নয়। আইন অনুসরণ করে অবশ্যই সিএসআর খাত থেকে সিডমানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সভায় উপস্থিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন পরামর্শ দেন, আগামী ৫ বছর ট্রাস্ট থেকে কত জনকে উপবৃত্তি দেয়া হবে এবং এ খাতে কত টাকা দরকার হবে- তার একটি প্রক্ষেপণ থাকা বাঞ্ছনীয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি দেশের ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকারদের তালিকা করে অনুদান চাওয়ার পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি বলেন, ট্রাস্ট ফান্ড স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্য উপবৃত্তি প্রকল্প ট্রাস্ট ফান্ডে একীভূত করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা ক্যাডারের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা। তারা সরকারকে জুজুর ভয় দেখিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তারা মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকদের যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন, যেসব উপবৃত্তি প্রকল্পে বিদেশি দাতাগোষ্ঠী অর্থায়ন করে থাকে, ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে সেগুলো নেয়া হলে তারা (দাতা) অর্থ দেবে না। এ অবস্থায় উপবৃত্তির মতো জনপ্রিয় কাজে কোনো বিরতি বা ব্যর্থতা দেখা দিলে তা জনরোষ তৈরি করবে। এমন জুজুর ভয় দেখানোর কারণে সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও অনেকটাই ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেন।

শুধু তাই নয়, আগামী জুনে মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প (এসইএসপি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্পের (এইচএসএসপি) মেয়াদ শেষ হবে বলে ইতিমধ্যে প্রথমটির মেয়াদ এক বছর ও পরেরটি দু’বছর বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করেছে। ওই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্লানিং কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এখানে লক্ষ্যণীয়, পরেরটিরও এক বছর বাড়ানোর কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে দু’বছর করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২৪ ফেব্রুয়ারির ট্রাস্টি বোর্ডের নবম সভায় বলেন, ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে সব উপবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনায় আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। তাই ট্রাস্টে সব উপবৃত্তি প্রকল্প স্থানান্তরের প্রস্তাব যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। এ বিষয়ে কার্যকর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশনা দেয়া আছে। আশা করছি এ ব্যাপারে শিগগিরই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠনকালে সিদ্ধান্ত ছিল, ষষ্ঠ থেকে স্নাতকের ছাত্রছাত্রীদের দেয়া সরকারি উপবৃত্তি কার্যক্রম এই ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে আনা হবে। প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত মোট ৭টি উপবৃত্তি প্রকল্প আছে। এসব প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকে পিইডিপি-৪ (চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প)। এর আওতায় এক কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে স্নাতকে ৪০ লাখের বেশি ছাত্রছাত্রী উপবৃত্তি পাচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উপবৃত্তির জন্য চারটি প্রকল্প আছে। এগুলো হচ্ছে- এসইএসপি, এইচএসএসপি, সেকায়েপ ও সেসিপ। এরমধ্যে প্রথম দু’টির অর্থায়ন করে সরকার।

পরের দু’টিতে সরকারের পাশাপাশি যথাক্রমে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি অর্থায়ন করে। এছাড়া øাতকের ছাত্রছাত্রীরা উপবৃত্তি পায়। এই অর্থ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে সরবরাহ করা হয়। সেসিপের মেয়াদ শেষ হওয়াকে সামনে রেখে সম্প্রতি এসইডিপি (মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি) নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রিক সব প্রকল্প একীভূত করার লক্ষ্য আছে। সূত্র জানিয়েছে, উপবৃত্তি প্রকল্পও ওই কর্মসূচির অধীনে নেয়ার তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, দেশে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া নিশ্চিতের লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তার জন্য বৃত্তি দিতে সাত বছর আগে শেখ হাসিনার ইচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়। ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট বিল, ২০১২’ আইনের ৭(১) উপ-ধারা অনুযায়ী ট্রাস্টের ৫ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান। আর আইনের ৮(১) উপ-ধারা অনুযায়ী ২৩ (তেইশ) সদস্যবিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি হলেন শিক্ষামন্ত্রী।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×