খালেদা জিয়াকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছে

পাঁচ আইনজীবীর সাক্ষাৎ * প্রায় অখাদ্য খাবার দেয়া হচ্ছে * গৃহকর্মী ফাতেমা সঙ্গে নেই * মনোবল ‘ঠিক আছে’ * আজ ডিভিশনের আবেদন

  সিরাজুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মামুন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়া হয়নি। পাশাপাশি তাকে সাধারণ কয়েদিদের মতো রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কের পুরনো কারাগারে বন্দি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করে এসে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন। মওদুদসহ পাঁচ আইনজীবী বিকাল ৪টা ২৬ মিনিটে খালেদার সঙ্গে দেখা করতে ঢোকেন কারাগারে। মওদুদ আহমদের সঙ্গে অ্যাডভোকেট আবদুর রেজ্জাক খান, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী ছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তারা কারাগারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন।

কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সেবায় তার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম রয়েছেন বলে যে খবর বিভিন্ন সংবাদপত্রে এসেছে, তা নাকচ করেছেন বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘ফাতেমাকে সেবা করতে দেয়ার খবর সত্য নয়। তাকে ম্যাডামের সেবা করতে দেয়া হচ্ছে না।’ ৩৫ বছর বয়সী ফাতেমা প্রায় ২০ বছর ধরে খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থান করছেন। প্রায় আড়াই বছর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারটি ছিল মূলত পরিত্যক্ত। তবে সেখানে কারা অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে। এই কারাগারে এখন খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো কয়েদি নেই। নাজিমউদ্দিন রোডের এ পরিত্যক্ত কারাগারটি এখন বিশেষ কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কারা অধিদফতর।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আরও বলেন, ‘নির্জন কারাবাস বলতে যা বোঝায়, ম্যাডামকে তা দেয়া হয়েছে। জনমানবহীন পরিবেশে রাখা হয়েছে। ডিভিশন দেয়া হয়নি। ‘সাধারণ কয়েদিদের যা খেতে দেয়া হয়, খালেদাকেও তা-ই দেয়া হয়েছে, যা প্রায় অখাদ্য।’

ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করব। রায়ের কপি পেলে সোম বা মঙ্গলবার আপিল করব। খালেদা জিয়া অসুস্থ। হাঁটুর ব্যথায় একা একা কষ্ট পাচ্ছেন। অথচ ডিভিশন দেয়া হয়েছে বলে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। মওদুদ আরও বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তিন ক্যাটাগরিতে তিনি ডিভিশন পান। দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সংসদ সদস্য ছিলেন, একটি দলের প্রধান। অথচ তাকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছে। একদম নির্জন এক সেলে। সম্পূর্ণ একা।’ তার পরও কারাগারে বন্দি ৭২ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার মনোবল ‘ঠিক আছে’ বলে জানান ব্যারিস্টার মওদুদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়াসংক্রান্ত কোনো আদেশ বা আবেদন এখনও কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেনি। তাই তাকে ডিভিশন দেয়া হয়নি। তবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে কারাকর্তৃপক্ষ তাকে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপি নেতা ব্যরিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, শুক্র এবং শনিবার ডিভিশনসংক্রান্ত আবেদন নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বন্ধের দিন থাকায় তা হস্তান্তর করা যায়নি। আজ রোববার এ সংক্রান্ত আবেদন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হবে বলে জানান তিনি। কারা সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া এখন নাজিমউদ্দিন রোডের ডে কেয়ার সেন্টারের নিচতলার এটাস্ট বাথরুমবিশিষ্ট একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। সেখানে আগে ৭ জন বন্দি অবস্থান করতেন। তার রুমে চেয়ার, টেবিল, খাট, মশারি, বিছানার চাদর, বালিশ, লেপ-তোষক, একটি লাল রংয়ের কার্পেট, পাঁচটি সিলিং ফ্যান এবং চারটি এনার্জি বাল্ব রয়েছে। খালেদা জিয়ার কক্ষে যে বাথরুম রয়েছে সেটি একটি সাধারণ বাথরুম। তার হাঁটুতে একাধিক অপারেশন থাকায় ওই বাথরুমটি তিনি ব্যবহার করতে পারছিলেন না। তাই সেখানে ‘একটি চেয়ার কমোড’ দেয়া হয়েছে। তাকে যে সিঙ্গেল খাট দেয়া হয়েছে সে ধরনের খাট মূলত হাসপাতালে থাকে। যে তোষকের কথা বলা হচ্ছে সেটি ফোমের তোষক- যা হাসপাতালের বেডে ব্যবহার করা হয়।

কারা সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে ভাত, মাছ, মাংস, দুধ-কলা এবং বিভিন্ন ধরনের স্যুপ খেতে দেয়া হচ্ছে। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে অভিজাত হোটেল থেকেও খাবার এনে দিচ্ছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া খাবার তিনি খাচ্ছেন না। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি কান্নাকাটি করে কাটাচ্ছেন। তাকে যে কক্ষে রাখা হয়েছে সেটি ৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছিলেন ঝাড়–দার মান্নান এবং সেলিম। তারপরও ওই রুম থেকে উৎকট গন্ধ বের হয়। ওই গন্ধ দূর করতে মাঝে মধ্যেই সেখানে পারফিউম ছিটানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির ও জেলার মাহবুবুর রহমান সার্বক্ষণিক নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে অবস্থান করছেন। ডেপুটি জেলার শিরিন শারমীন এবং আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছেন একদল কারা রক্ষী। তিনজন রক্ষী ৮ ঘণ্টা করে তিন শিফটে ডিউটি পালন করছেন। তার জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তিন জন চিকিৎসকের মধ্যে দু’জনই নিয়োগ দেয়া হয়েছে খালেদা জিয়ার জন্য। তারা হলেন- ডা. মাহমুদ শুভ এবং ডা. বিপ্লব।

শনিবার বিকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন ডেপুটি জেলার জানান, কারাবিধি অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা ডিভিশন পান না। তবে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বপ্রণোদিত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকেও ডিভিশন দেয়ার আদেশ দিতে পারে। এ ধরনের আদেশ পেলে কারাকর্তৃপক্ষ তা কার্যকর করে। এখনও খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়া হয়নি। কারণ, আদালত থেকে এ জাতীয় কোনো নির্দেশনা আসেনি। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ জাতীয় কোনো আদেশ জারি করেনি। তবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সার্বিক দিক বিবেচনায় তাকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে, যেসব সুযোগ-সুবিধা ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিরা পেয়ে থাকেন।

কারা সূত্র জানায়, কোনো সাজাপ্রাপ্ত বন্দি কারাগারে এলে প্রথম দিন তিনি তার নিজস্ব পোশাক পরে থাকেন। পরদিন তাকে কারাগারের পোশাক পরানো হয়। কিন্তু খালেদা জিয়াকে এখনও কারা পোশাক পরানো হয়নি। বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া সকাল বেলা তেমন কিছু খান না। দুপুরে ফলমূল খান। যেসব ফলে চিনি জাতীয় উপদান বেশি সেসব ফল তিনি এড়িয়ে চলেন। রাতে পোলাওয়ের চালে রান্না করা নরম ভাত খান। রাতের খাবার শেষে তিনি স্যুপ ও ফলের জুস খান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×