জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো

  সেলিনা হোসেন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একুশের বইমেলা আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহ্যের অংশ। এ অংশকে প্রাণবন্ত করে তোলে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী এ আয়োজন। আমি মনে করি, আজ প্রয়োজন বইমেলাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। দেশের প্রতিটি জেলায় যদি এভাবে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বইমেলা করা যায় তাহলে আমার মনে হয়, সাংস্কৃতিক চেতনাটা অনেক বেশি বিকশিত হবে। যেভাবে দেশে মাদকাসক্তি ও অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে, আমাদের সন্তানেরা যেভাবে বিপথে চলে যাচ্ছে তা থেকে তাদের ফেরাতে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজন। সারা দেশে মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন সেই কাজটি সম্পন্ন করতে ভীষণ সহায়ক হতে পারে। আমরা যে সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলি, বইমেলার মাধ্যমে সেটি ভালোভাবে করা সম্ভব। তাহলে আমাদের ছেলেরা মাদকাসক্ত হবে না কিংবা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে যেতে পারবে না। কারণ নিজের জায়গায় তারা নিজেদের চিনতে শিখবে, বুঝতে শিখবে এবং তারা দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করতে শিখবে। ভুল পথে পা দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার যে প্রবণতা সেই প্রবণতাকে রোধ করবে বইমেলা ও বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা।

বইমেলায় বাচ্চাদের জন্য শিশু কর্নার রাখা হয়েছে- এটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। সেখানে যে বাচ্চাদের জন্য সিসিমপুরের পাপেট শো-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেটিও ভালো উদ্যোগ। আমার মনে হয়, এটা একটা ভালো দিক- তা হচ্ছে আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুরা বইয়ের কাছে চলে আসছে। তবে পাশাপাশি আমি আরেকটি বিষয় মনে করি, এ পাপেট শো দেখে- এর সঙ্গে সঙ্গে যদি এমন আয়োজন করা যায় যে, এ বাচ্চাদের আমাদের তরুণ লেখকরা বই থেকে পড়ে শোনাবে কিংবা তাদেরকে দিয়েই পড়াবে, আবৃত্তি করাবে, গল্পে গল্পে তাদের কাছে একুশের ইতিহাস, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা সংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী, লোককথা তুলে ধরবে- তাহলে সেটা আরও বেশি সুন্দর হবে। যেসব প্রকাশক শিশুদের বই প্রকাশ করেন তারা এখানে অংশগ্রহণকারী শিশুদের হাতে বই তুলে দিতে পারেন।

আরেকটি বিষয় আমার মনে হয়, তা হল আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনার অঙ্গীকারের কথা যদি আমরা ভুলে না গিয়ে থাকি তা হলে একথা স্বীকার করতে হবে যে, স্বাধীন দেশে এটা আমাদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। বহুবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বাঙালি আগ্রাসী জাতি নয়, বাঙালি ধারণ করে, বহন করে, হরণ করে না। আমরা যদি আমাদের জাতিসত্তার এ প্রকৃত স্পন্দনটি বুঝি, সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি তাহলে এ সত্য খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারব যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আমাদের আশু ও জরুরি কর্তব্য। আমি মনে করি, বইমেলার যে মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সেই মঞ্চে তাদের স্থান করে দেয়া প্রয়োজন। বইমেলায় যেন তাদের মর্যাদা দেয়া হয়। তাদের ভেতর যারা লেখেন তাদেরকেও যেন মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদেরকে পুরস্কৃত করা প্রয়োজন। তাদেরকে প্রেরণা দেয়া প্রয়োজন- তাদের সংস্কৃতি রক্ষায় তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজনে। এটাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরেকটি ব্যাপার মেলা প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, মেলার স্টল বরাদ্দে অনেক সময় বড়দের বড় প্যাভেলিয়ন দিলেও ছোটদের স্থান দেয়া হয় না। আমার কাছে বরাদ্দ না পাওয়া এমন কয়েক তরুণ প্রকাশক বেদনাহতভাবে অভিযোগ করেছেন- আমি মনে করি, এ তরুণ প্রকাশকদের যারা ছোট স্টল চেয়েও না পেয়ে আশাহত হয়, তাদের ঠাঁই করে দিতে হবে।

না হলে তরুণদের সৃজনশীল উদ্যোগ বিপন্ন হবে বেপথু হবে। আমরা যেন তরুণদের চোখে জল না আনি। আমি চাই না এমনটি হোক। যেসব তরুণ বই প্রকাশ করতে গিয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেছে তাদের সেই পুঁজি ফেরত পাবে না যদি না সে বই মেলায় বিক্রি করতে পারে। তাই স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সহৃদয় বিবেচনার দাবি জানাই আমি। অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.