নরসিংদীতে ৪ জন দগ্ধের ঘটনায় ২ আসামির স্বীকারোক্তি

‘প্রতিশোধ নিতেই পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা’

বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছে ফুফুসহ তিন বোন, আইসিইউতে সুইটি * জমি ও রাজনৈতিক বিরোধে বাড়িতে একাধিকবার হামলা

  যুগান্তর রিপোর্ট ও নরসিংদী প্রতিনিধি ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নরসিংদী

নরসিংদীর রায়পুরায় মঙ্গলবার আগুনে দগ্ধ একই পরিবারের চারজনের মধ্যে সুইটি আক্তারের অবস্থার অবনতি হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসিএইচ) বার্ন ইউনিটের ‘আইসিইউতে’ নেয়া হয়েছে। আর ফুফুসহ দগ্ধ তার (সুইটি) দুই বোন- প্রীতি আক্তার ও মুক্তামণির চিকিৎসা চলছে হাসপাতালটির ‘এইচডিইউতে’।

ওই তিন বোন ও তাদের ফুফু খাতুন নেসাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় বুধবার রায়পুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। দগ্ধদের বড় বোন রত্না আক্তার বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে সাতজনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরও চারজনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার দিনই মামলার প্রধান দুই আসামি- মাহমুদুল হাসান রবিন ও মামুন মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা দু’জনই বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর মধ্যে রবিন জবানবন্দিতে বলেছে, বাবার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই এ অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। পাশাপাশি হামলা ও অগ্নিসংযোগের বিষয়টি স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে অপর আসামি রবিনের ফুফাতো ভাই মামুন মিয়াও।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জমি দখল ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটায় আসামিরা। এর আগেও একাধিকবার বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তারা। দীর্ঘদিন বাড়ি ছাড়া থাকার পর স্থানীয় থানা পুলিশের আশ্বাসে ফিরে এসে এমন বর্বর হামলার শিকার হয়েছেন তারা। নরসিংদী পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দেয়া জবানবন্দিতে এ হামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, ঘটনাস্থলে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরানোর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দগ্ধদের পরিবারের বিরোধ রয়েছে। বিরোধকে কেন্দ্র করে ৬ ফেব্রুয়ারি একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এরপর থেকে ভিকটিমরা বাড়ি ছাড়া ছিলেন। আমরা সবগুলো বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। এক প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ সুপার বলেন, ভুক্তভোগীদের বাড়ি আসার ব্যাপারে পুলিশের নিশ্চয়তার বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে রায়পুরা থানার ওসি মহসিনুল কবির বলেন, বুধবার বেলা ১১ জনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে মৃত দুলাল গাজীর দুই ছেলে মাহমুদুল হাসান রবিন (২৬), সুবন মিয়া (২০), মৃত ফজলু মিয়ার ছেলে শিপন মিয়া (৩৫), মৃত সোহরাব মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (১৯), মৃত মান্নান মিয়ার ছেলে কাজল মিয়া (৪০), মৃত ইদ্রিস মিয়ার ছেলে আল-আমিন (২৮) ও মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে লোকমান হোসেন (২০)। তাদের সবার বাড়ি রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামে।

আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা কেন?- জানতে চাইলে ওসি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২৯-এর ক ও খ এবং ৩০ ধারায় মামলা হয়েছে। এ ধারার মধ্যে দাহ্য পদার্থ দিয়ে হত্যার চেষ্টার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নরসিংদীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শামীমা আক্তারের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাহমুদুল হাসান রবিন বলে- বাবা হত্যার প্রতিশোধ নিতেই বাইরে থেকে তালা মেরে ঘরের ভেতরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। ‘তারা আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। তারা এলাকায় আসবে কেন? এলাকায় এলে তাদের মেরে ফেলব। বাবা হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই আমরা সেই ঘরে আগুন দিয়েছি।’ গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও পুলিশের কাছে একই তথ্য দেয় রবিন। ওই নারীরা কি ক্ষতি করেছে পুলিশের এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বীকারোক্তিতে রবিন বলে, এ পরিবারের সবাই আমাদের শত্রু।

বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা গেল, সুইটিকে আইসিইউতে ও ফুফু খাতুন নেসা এবং দুই বোন প্রীতি ও মুক্তামণিকে এইচডিইউতে চিকিৎসা চলছে। হাত-পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করার সময় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মুক্তামণি। তার পাশের বেডে ব্যথায় চিৎকার করছে প্রীতি। কিন্তু তাদের পাশে নেই কোনো স্বজন। হাসপাতালে আসা দগ্ধ তিন বোনের ভাই সোহাগের স্ত্রী লিপি আক্তার বলেন, আমি একমাত্র তাদের দেখভাল করছি। কখনও আইসিইউতে ছুটে যাচ্ছি আবার এইচডিইউতে। আমার ননদ রত্না ছিল। পুলিশ এসে মামলার কথা বলে সকালে তাকে নরসিংদী নিয়ে গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগুনে দগ্ধদের চিকিৎসা আগে নাকি মামলা আগে?

ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শঙ্কর পাল বলেন, সুইটির অবস্থা কিছুটা অবনতি হওয়ায় তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। বাকিদের এইচডিইউতে চিকিৎসা চলছে। তাদের প্রত্যেকেরই শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রায়পুরা থানার সেকেন্ড অফিসার দেব দুলাল দে বলেন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসামিদের সঙ্গে দগ্ধ নারীদের পরিবারের বিরোধ চলে আসছিল। এরই জের ধরে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টায় তাদের ঘরে কেরোসিন ও পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ওই সময় তারা ঘরের কলাপসিবল গেটে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। আগুনে দগ্ধ হয়ে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তখন তাদের আর্তচিৎকারে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে তারা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় বাড়ির একটি ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

এদিকে বুধবার রায়পুরায় ঘটনাস্থলে সরজমিনে দেখা গেছে, একতলা ভবনের চারটি রুমেই জানালার কাচ ভেঙে পড়ে আছে। অন্য একটি রুমে জাজিম ও তোশক আগুনে পোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। পেছনের জানালার গ্রিলটিও ভাঙা। তবে প্রবেশদারের মূল কলাপসিবল গেটটি খোলা ছিল। রুমে কোনো আসবাবপত্র ছিল না। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা ৬ ফেব্রুয়ারিও ওই বাড়িটিতে হামলা, ভাংচুর লুটপাট করে আগুন দিয়েছিল। এরপর থেকেই পরিবারের সদস্যরা ভয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। সোমবার ফুফুকে নিয়ে তিন বোন বাড়িতে রাত যাপন করে। এদিন ভোর রাতে পুনরায় আগুন লাগিয়ে দেয় হামলাকারীরা।

দগ্ধ তিন বোনের মধ্যে বড় বোন রত্না আক্তার জানায়, প্রতিবেশী শিপন, কাজলদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জায়গা-জমি নিয়ে তাদের বিরোধ চলছিল। অনেক দিন আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দুলাল খুনের ঘটনায় আসামি করা হয় আমার দুই ভাইকে। অথচ আমার দুই ভাই সোহাগ ও বিপ্লব বিএনপির রাজনীতি করায় বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় পুলিশ তাদের হয়রানি করছে। তারা কোথায় আছে আমরা জানি না। রত্না বলেন, ভোরে সবাই বাসায় ঘুমিয়ে ছিল। তখন পাশের বাড়ির শিপন, কাজল, রবিন, লোকমানসহ কয়েকজন তাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পেট্রলবোমা ও কেরোসিন ঢেলে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।

৩নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, সকালে খবর পেয়েছি বিপ্লবদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। দৌড়ে ঘটনাস্থলে আসি। তবে সেখানে কাউকে পাইনি। শুনেছি, তাদের ঢাকায় নেয়া হয়েছে। রায়পুরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন লিডার কাজী মোহাম্মদ রুমান বলেন, একটি রুমে একটু আগুন জ্বলছিল। একটা কাঠের টুকরো দিয়ে আগুনকে ঘরের বাইরে নিয়ে যাই। পরে তা এক বদনা পানি দিয়ে তা নেভানো হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×