বিটিএমএসহ ৯ সংগঠনের যৌথ সংবাদ সম্মেলন

বন্ডের সুতা কালোবাজারে বিক্রি বন্ধের জোর দাবি

ব্যবসায়ীরা চান রফতানিতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি, আমদানি সুতার গায়ে ‘নট ফর সেল’ লোগো ব্যবহার, টেক্সটাইল খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা, ঋণ পরিশোধে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

বস্ত্রকল। ফাইল ছবি

বন্ডের আওতায় আনা সুতা ও কাপড় কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকার ইসলামপুর, বিক্রমপুর প্লাজা, নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার, গোপালদিসহ বড় বড় সব মার্কেটে এগুলো পাওয়া যাচ্ছে। এতে স্থানীয় শিল্পোক্তাদের গোডাউনে মজুদ বাড়ছে।

বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে সুতা বিক্রি করছেন। এ অবস্থায় আগামীতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার অব্যাহত এবং নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে বস্ত্র খাতে নতুন আঘাত আসবে। তখন খাতটি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

বুধবার রাজধানী হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বস্ত্র খাতের এ দুর্দশার কথা তুলে ধরেন টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন।

বিটিএমএসহ বস্ত্র খাতের ৯টি সংগঠন যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতি, স্পেশালাইজড টেক্সটাইল অ্যান্ড পাওয়ার লুম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন, টেক্সটাইল ডাইং-প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন, মাধবদি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, নরসিংদী পাওয়ার লুম মালিক সমিতি এবং হ্যান্ডলুম ও পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, দীর্ঘ ১ বছরের বেশি সময় ধরে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত ন্যায্যমূল্যে সুতা ও কাপড় বিক্রি করতে পারছে না। ফলে তারা নানা সমস্যায় জর্জরিত। অবিলম্বে এ সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় খাতসংশ্লিষ্ট সব শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

খোকন বলেন- নরসিংদী, মাধবদী, বাবুরহাট, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সিরাজগঞ্জের পাবনার বিভিন্ন স্থানে ১ লাখের বেশি পাওয়ার লুম ছিল। শুল্কমুক্ত সুতা ও কাপড়ের অবাধ বিক্রয়ের কারণে ৬০ শতাংশ পাওয়ার লুম বন্ধ আছে। শুধু সিরাজগঞ্জের একটি জায়গায় ১০ হাজার পাওয়ার লুমের মধ্যে ৩ হাজার সচল। এছাড়া গত ১ বছরে টেক্সটাইল খাতে ৩শ’র বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। স্পিনিং মিলগুলোর ১ কোটি ১০ লাখ স্পিন্ডলের মধ্যে ৮০ লাখ চালু আছে।

টেক্সটাইল খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের টিকে থাকার ক্ষেত্রে আগামী বাজেট অপার সম্ভাবনা ও একই সঙ্গে শঙ্কার কারণ হতে পারে। বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এতে সুতার ওপর ট্যারিফ মূল্য প্রথা বিলুপ্তি ঘটবে। এখন প্রতি কেজি সুতায় ৩ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। নতুন আইনে ট্যারিফ প্রথা বিলুপ্তি ঘটলে প্রতি কেজি সুতা নূ্যূনতম ৮ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৪ টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হবে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও টেক্সটাইল খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে তা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য টেক্সটাইল খাতে ভ্যাট আরোপের আগে বিস্তারিত গবেষণা করার আহ্বান জানানো হয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে উদ্বেগ জানিয়ে খোকন বলেন, বর্তমানে সুতা ও কাপড় উৎপাদন খরচের চেয়ে যথাক্রমে ২০-৩০ সেন্ট এবং ৫-১০ সেন্ট কমে বিক্রি করতে হচ্ছে।

এখন গ্যাস-বিদ্যুতের দাম যথাক্রমে ৯৬ শতাংশ এবং ২০৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে বিদ্যুৎ খরচ দ্বিগুণ বাড়বে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।

ব্যাংক ঋণ প্রসঙ্গে বলেন, উচ্চ সুদের কারণে সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্থানীয় মিলগুলো শুল্কমুক্ত ও মিথ্যা ঘোষণায় আনা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এতে অনেক শিল্প ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছে। সরকার ঋণের সুদ হার এক অংকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করলেও তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যমান উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সরকার খেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও সেটি ৭-৯ শতাংশ সুদে ১২ বছরে দেয়ার পরিশোধের সুযোগ দিচ্ছে। অথচ যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছে তাদের জন্য পুরস্কার নেই, উল্টো উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ বৈষম্য খেলাপি ঋণকে উৎসাহিত করবে। এতে ভালো ঋণগ্রহীতার সংখ্যা কমে যাবে। সব শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে হবে। সবার ক্ষেত্রে ঋণের সুদ একই করতে হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে খোকন বলেন, বিটিএমএর সদস্যরা বন্ড অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে অ্যাসোসিয়েশন থেকে তার সব সেবা বন্ধ করে দেয়া হবে। বন্ড অপব্যবহারকারীরা দেশের শত্রু ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্তরায়।

শিল্প বাঁচাতে ৯ প্রস্তাব : টেক্সটাইল খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে ৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। এগুলো হচ্ছে- সুতা ও কাপড়কে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা, কর্পোরেট কর ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ ধার্য করে আগামী ১৫ বছরের জন্য এ সুবিধা বহাল রাখা, ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ আরও ১২ বছর বৃদ্ধিসহ সুদ হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ, ফেব্রিকের এফওবি মূল্যের ওপর বিকল্প নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ, আমদানি সুতার গায়ে ‘নট ফর সেল’ সিল ব্যবহার, বন্ডেড ওয়্যার হাউজে তদারকি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট অফিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যেসব স্থান দিয়ে সুতা আমদানি করা হয়, বিশেষত বেনাপোল স্থল বন্দরকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা, কোরবানির আগ পর্যন্ত বর্ডার হাটে ভারতীয় পোশাক বিক্রি নিষিদ্ধকরণ এবং অবৈধ সুতার বাজারে ঘন ঘন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি চালানোর দাবি জানানো হয়েছে।