ডিভিশন পেলেন খালেদা জিয়া

গৃহকর্মী ফাতেমাকেও সঙ্গে দেয়া হল * কয়েদি নম্বর ১, টেলিভিশন প্রত্যাখ্যান * ফুলবাগান পরিচর্যার দায়িত্ব সময় কাটছে বই ও পত্রিকা পড়ে * সকালে রুটি-সবজি, রাতে ও দুপুরে মাছ-সবজি * ডে-কেয়ার সেন্টারে যুগান্তর পড়ার সুযোগ * জেল আরাম-আয়েশের জায়গা নয় : কাদের

  সিরাজুল ইসলাম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়া হয়েছে। রোববার বিকাল থেকে ডিভিশন কার্যকর হয়। গৃহকর্মী ফাতেমাকেও তার সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন রোববার রাতে যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে খালেদা জিয়ার ভিডিশন পাওয়া নিয়ে নানা মহলে দিনভর আলোচনা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খালোদ জিয়াকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আদালত তাকে রোববার ডিভিশন দেয়ার আদেশ দিলেও প্রথম দিন থেকেই তাকে ডিভিশনের মর্যাদায় রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়ার মর্যাদায় কোনো ঘাটতি ছিল না বলে দাবি করেন সরকারি দলের নেতারা।

আইজি প্রিজন্স জানান, আদালত থেকে ডিভিশনের আদেশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ছিলেন সাধারণ বন্দি। তারপরও তাকে এমন সুবিধা দেয়া হয়েছে, যেসব সুবিধা কেবল ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিরা পান। রোববার ডিভিশন সংক্রান্ত আদেশ পাওয়ার পর এদিন বিকাল থেকে তাকে জেলকোড অনুযায়ী ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আদালতের নির্দেশে জেলকোডের ৬১৭ বিধি অনুযায়ী তাকে ডিভিশন দেয়া হয়েছে। এ ধারায় ডিভিশন পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে, ‘যারা ভালো চরিত্রের অধিকারী ও অনভ্যাসগত অপরাধী; সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে যাদের জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের এবং যারা নৃশংসতা, নৈতিক স্খলন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক অপরাধ বা বিস্ফোরক আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা, সম্পত্তি সংক্রান্ত মারাÍক অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নন বা অন্য কাউকে এসব অপরাধ করতে প্ররোচিত বা উত্তেজিত করেনি।’

কারা অধিদফতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর সেটি নিয়ে আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বোরবার বিকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। পরে খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বশেষ কারাগারের ডে-কেয়ার সেন্টারে দুটি জাতীয় দৈনিক পড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। এর একটি হল দৈনিক যুগান্তর। ডে-কেয়ার সেন্টারে নেয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ তার রুমে একটি টেলিভিশন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটা নেননি। কারণ টেলিভিশন দেয়া হলেও ডিশ সংযোগ দেয়া হবে না বলে খালেদা জিয়াকে জানানো হয়। তখন তিনি বলেন, ‘বিটিভি দেখার জন্য আমার টেলিভিশনের দরকার নেই।’

সূত্র জানায়, সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে খালেদা জিয়াকে যে কয়েদি নম্বর দেয়া হয়েছে তা হল- ১। ওই কারাগারে আর কোনো আসামি না থাকায় তাকে এই নম্বরটি দেয়া হয়। সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রত্যেক কারাবন্দিকেই যে কোনো ধরনের কাজ দেয়া হয়। খালেদা জিয়াকেও একটি কাজ দেয়া হয়েছে। সেটি হল ফুলবাগানের পরিচর্যার দায়িত্ব। তবে বিশেষ এ কারাগারে ফুলবাগান নেই। তাই তাকে ফুলবাগান পরিচর্যা করতে হবে না।

সূত্র আরও জানায়, খালেদা জিয়াকে যে কক্ষটি দেয়া হয়েছে সেটির আয়তন ৮ ফুট বাই ১০ ফুট। কক্ষের একটি বারান্দা আছে। ঘুমিয়ে, বই পড়ে, বারান্দায় পায়চারী করে এবং পত্রিকা পড়ে সময় কাটছে তার। নিয়ম অনুযায়ী তাকে একটি কয়েদি ড্রেস (শাড়ি) দেয়া হয়েছে। সেটি তার রুমেই আছে। শাড়িটি পরতে তাকে বাধ্য করা হয়নি। তার নামে একটি আইডি কার্ড তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ফুলের বাগান পরিচর্যার কথা বলা হলেও ওই কার্ডটি রোববার বিকাল পর্যন্ত তার কাছে দেয়া হয়নি। কার্ডটি কারা কর্তৃপক্ষের কাছেই রয়েছে।

ওই সূত্রটি আরও জানায়, ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য খাবারের মেন্যুতে মাছ, গরু এবং মুরগি থাকলেও তিনি এখনও কোনো ধরনের মাংস খাননি। মাছ এবং সবজিই তার বেশি পছন্দ।

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায়ে ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। রায়ের পরপরই তাকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও কারাগারে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে সাধারণ বন্দির মতো। এরপর খালেদার আইনজীবীরা রোববার আদালতে ডিভিশন চেয়ে আবেদন করলে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আখতারুজ্জামান খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দিতে কারাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।

এর আগে রোববার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খালেদা জিয়া একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব। তার একটি সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। তিনি দুইবারের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক এমপি, একটি বড় দলের চেয়ারপারসন। এসব বিষয় মাথায় রেখে তাকে কারাগারে প্রথমদিন থেকেই আন-অফিসিয়ালি ডিভিশনের প্রাপ্ত সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, নিরাপত্তার কারণে তাকে বাইরের খাবার দেয়া হচ্ছে না। কারাগারের ভেতরেই রান্না করে তার জন্য খাবার দেয়া হচ্ছে।

খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়ার আগে রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, জেলখানা কোনো আরাম-আয়েশের জায়গা নয়। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া জেলকোড অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধাই পাবেন। খালেদা জিয়াকে কোনো ধরনের অসম্মান বা অমর্যাদা করা হচ্ছে না উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, জেলকোডে গৃহপরিচারিকা অথবা ব্যক্তিগত সহকারী রাখার কোনো বিধান নেই। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আমাদের নেত্রীও জেলে ছিলেন। উনিও গৃহপরিচারিকা রাখেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও জেলে ছিলেন। তিনিও এ সুবিধা পাননি। জেলকোডে এসি (এয়ার কন্ডিশন) দেয়ার নিয়ম নেই।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ভবনটি পরিত্যক্ত হলেও একজন ভিআইপি আসামিকে রাখার মতো করেই ডেকোরেশন করা হয়েছে। তাছাড়া ভবনটি খুব বেশি দিনের পরিত্যক্ত নয়। তাকে যেখানে রাখা হয়েছে, সেটি তার থাকার উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে।

এর আগে রোববার দুপুরে কারা অধিদফতরের নিজ কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দিতে তার আইনজীবীরা একটা দরখাস্ত দিয়েছেন। আমি সেটা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। টিভিতে দেখেছি আদালত থেকে একটা অর্ডার হয়েছে। অর্ডারের কপি এখনও হাতে আসেনি। তাই খালেদা জিয়াকে সাধারণ বন্দির মতো রাখা হয়েছে। তবে তাকে বেশ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাকে সবচেয়ে ভালো ভবনের দোতলায় এটাস্ট বাথরুম বিশিষ্ট (কমোডওয়ালা) একটি মানসম্মত রুমে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত খাট দেয়া হয়েছে। বালিশ, চেয়ার টেবিল সবই আছে তার রুমে।

তিনি জানান, আদালত থেকে খালেদা জিয়ার ডিভিশন সংক্রান্ত আদেশ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, কারাগার থেকেই খালেদা জিয়াকে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। সকালে তাকে রুটি ও সবজি দেয়া হয়। রাতে ও দুপুরে মাছ ও সবজি খাচ্ছেন তিনি।

ডিভিশনের বিষয়ে আইজি প্রিজন্স উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডিভিশন পান না। কারা বিধি অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতি, বর্তমান এমপি, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী কোনো দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ডিভিশন পান। কিন্তু এসবের কোনো কিছুর বিবেচনায় তিনি ডিভিশন পান না। কিন্তু সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আদালত কোনো নির্দেশনা দিলে সেটা বাস্তবায়ন করা হয়। এ জন্য তাকে ডিভিশন দিতে আদালতের নির্দেশের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

ইফতেখার উদ্দীন আরও বলেন, ‘বন্দিকে কী ধরনের মর্যাদা দেয়া হবে তার সুপারিশ প্রাথমিকভাবে কোর্ট থেকে আসে। যেহেতু ৮ তারিখের রায়ের সঙ্গে কোনো সুপারিশ আসেনি, তাই তাকে সাধারণ বন্দি হিসেবেই রাখা হয়। খালেদা জিয়াকে কয়েদির পোশাকে রাখা হয়েছে কিনা- এ প্রশ্নে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারা বিধি অনুযায়ী কয়েদিদের কারাগারের পোশাকই পরার কথা।

তিনি বলেন, আর ‘বেসিক হিউম্যান রাইটস’ হিসেবে সাধারণ ও ডিভিশনপ্রাপ্ত সব আসামিই চিকিৎসা সেবা পান। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার ও একজন ডিপ্লোমা নার্স রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা হবে। তার একাকীত্ব দূর করতে কয়েকজন কারারক্ষী রাখা হয়েছে বলে আইজি প্রিজন্স জানান। তিনি আরও জানান, কারাগারে খালেদা জিয়ার আচরণ শান্ত ও স্বাভাবিক। তার পায়ে সমস্যা থাকলেও যখন তাকে নিচতলা থেকে দ্বিতীয় তলায় যেতে বলা হল তখন তিনি সানন্দে রাজি হন।

পরিত্যক্ত কারাগারে খালেদা জিয়াকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে ইফতেখার উদ্দীন বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটিকে বিশেষ কারাগার হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সরকার যেহেতু এখনও ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেনি, তাই এটাকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাশিমপুর মহিলা কারাগারে রাখলে এ বয়সে প্রিজনভ্যানে করে আনা-নেয়ায় উনার অসুবিধা হতো। তাই বয়স ও শারীরিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাকে এখানে রাখা হয়েছে। আইজি প্রিজন্স জানান, রায়ের পর খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছিল পুরনো কারাগারের মূল ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে, যা আগে একজন কারা কর্মকর্তা ব্যবহার করতেন। এখন তাকে ডে কেয়ার সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় রাখা হয়েছে।

২০১৬ সালের ২৯ জুন থেকে ছয় হাজার ৪০০ বন্দিকে কেরানীগঞ্জে নতুন কারাগারে স্থানান্তর করে রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত কারাগারটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর এই প্রথমবারের মতো এটিকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে সেখানে দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.