দায় আমাদের দায় রাষ্ট্রের

  যতীন সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি মাস, ভাষার মাস- এ কথা আমরা সব সময় বলি। একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে এটি আমাদের জন্য গর্ব ও গৌরবের। এই গৌরবের মাসে আমরা যে অগৌরবের কাজ করি তা দেখে আমি রীতিমতো লজ্জা পাই এবং গ্লানিবোধ করি। অবসর ও বয়সের কারণে যেহেতু আমাকে অনেকটা গৃহে থাকতে হয় তাই স্বাভাবিকভাবেই টেলিভিশনের অনুষ্ঠানাদি দেখতে হয়। গত বুধবার একটি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সরাসরি এক দর্শকের সাক্ষাৎকার প্রচার করা হল। তাতে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে দর্শকের মুখে ‘সো’ ‘বাট’ ‘একচুয়েলি’ সমৃদ্ধ যে উত্তর আমি শুনলাম তাতে ভয়ানক মর্মাহত বোধ করলাম। ভাষা শহীদদের জীবনদানের এই মাসেও আমরা যদি শুদ্ধভাবে বাংলায় কথা বলতে না পারি তার চেয়ে গ্লানির এবং বেদনার আর কি থাকতে পারে? বইমেলার মাঠে দাঁড়িয়ে যে ভাষায় তারা কথা বললেন তাতে তো আমার মনে হয় না যে ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনার কথা মনে রেখেছি, একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের কথা মনে রেখেছি।

ভাষা ব্যবহারে এই যে অসচেতনতা তার চিত্র ফেব্রুয়ারি মাসেই যদি এ-ই হয় তাহলে বছরের বাকি মাসগুলোর কথা বলাই বাহুল্য, সহজেই অনুমেয়।

‘আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ‘জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করতে হবে’- এটা আমাদের সাংবিধানিক দায় কিন্তু সেই সাংবিধানিক দায় কি আমরা বহন করছি? এই যে বহন করছি না- এর জন্য দায়ী কে? আমরা কি আত্মসমালোচনা করে কখনও দেখেছি? এই নৈরাজ্য যদি আমরা লক্ষ্য না করি, এ নৈরাজ্যের প্রতিকারে যদি আমরা এখনও সচেতন না হই, তৎপর না হই তাহলে আমরা যে বাংলা ভাষার জন্য গর্ব করি তার সব যে মিথ্যা- এই গৌরব দাবির যে কোনো অধিকার আমাদের নেই- সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলা ভাষার এই বিকৃতি, মিশ্রণ, নৈরাজ্য শুরু হয়েছে উপরতলা থেকে, উপরতলায় যা হয় নিচের তলা তা অনুকরণ করে- এটা সর্বজনসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক সত্য। দেশের উপরতলার মানুষরা কী করে? উপরতলার মানুষের, যার সামান্য সঙ্গতি আছে সে বাংলা ভাষার মাধ্যম স্কুলে তার ছেলেমেয়েদের পড়ায় না, পড়ায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এবং এরই অনুকরণে আমি দেখছি, আমাদের গ্রাম এলাকায়ও এখন অনেক স্কুল হয়ে গেছে ইংরেজি মাধ্যম। কিন্তু এসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যারা পড়ায় তাদের ইংরেজি ও বাংলা কোনো ভাষারই জ্ঞান নেই- পরিষ্কার। আমি এটা দেখেছি এদের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে। ময়মনসিংহে হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে কলেজের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে- যেহেতু আমি সুদীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছি, বয়সে প্রবীণ- তাদের তুমি করে বলতাম- তাদের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে যখন বলতাম- ‘দেখ, তোমরা তো কলেজে মাস্টারি করো। এখন তোমাদের যদি বলি- ‘নিরক্ষর’। তাহলে তোমাদের ভাষায় যাকে বলে ‘প্রেস্টিজ হ্যাম্পারড’ হয়ে যাবে কিন্তু তোমরা সাক্ষর কিনা আমার সন্দেহ আছে।’ তারপর আমি তাদের সংযুক্ত বর্ণের অর্থ জিজ্ঞেস করে দেখেছি শতকরা ৯০ ভাগই জানে না, ভুল বলে। যেমন কৃষ্ণ বানানের যুক্তাক্ষরকে তারা বলে ‘কৃ’ ‘ষ’ ‘ঞ’। তারা কেউই বলতে পারেনি যে এটা ‘ণ’। তবে এদের ক্লাস নেয়ার পর প্রত্যেক বছরই বিদায় নেয়ার সময় এরা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বলত যে, ‘স্যার, আপনার ক্লাস করে আমরা একটা জিনিস জানছি।’

-‘কি জানছো?’

‘আমরা যে কিছু জানি না, এটা জানছি।’

আমি তাদের বলতাম, সবচেয়ে বড় জানাটাই তোমরা জানছো।

আমরা যে বাংলা জানি না, বাংলা অক্ষর চিনি না- এই ‘জানা’টা আমাদের জন্য খুব জরুরি। আমরা এই জানার অবস্থা যদি তৈরি করতে পারি, তাহলে কিছুটা কাজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ব্যাপারে প্রধান দায় রাষ্ট্রের। পাশাপাশি আমি মনে করি, দেশের সব গণমাধ্যমেরও দায় রয়েছে। মায়ের ভাষা মর্যাদা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১৯৫২-তে নিজেদের প্রাণ দিয়ে যে শহীদরা বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছে সেই ভাষার সৃজনশীল বিকাশ এবং পরিচর্যার দায় দেশের সব মানুষের। এই সত্যটি যেন আমরা বিস্মৃত না হই।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.