নুসরাত হত্যায় দুই আসামির জবানবন্দি: সব জানতেন রুহুল আমিন

গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয় ১ লিটার কেরোসিন * কেরোসিন ঢালে জাবেদ, আগুন দেয় জোবায়ের * এখন পর্যন্ত ১৯ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে * কিলিং মিশনে ছিল পাঁচজন, খুনিদের ১০ হাজার টাকা দেয় মাকসুদ * ৭০ টাকা দিয়ে এক লিটার কেরোসিন কেনেন শাহাদাত * সেই শম্পা (পপি)সহ তিনজন গ্রেফতার * ৫ দিনের রিমান্ডে কাউন্সিলর মাকসুদ

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আহমদুল হাসান আসিক ও ইকবাল হাসান ফরিদ

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার বিষয়ে সব জানতেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। এমনকি রাফির গায়ে আগুন দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পালানোর পর খুনি শাহাদাত হোসেন শামীম প্রথম ফোন করেন রুহুল আমিনকে।

তখন রুহুল আমিন তাকে বলেন, ‘আমি জানি, তোমরা পালিয়ে যাও।’ শুধু তাই নয়, রুহুল আমিনের সহযোগী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম আগুন দিতে খুনিদের ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। আর কারাগার থেকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা।

রাফি হত্যা মামলার অন্যতম দুই আসামি নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের দেয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানায় মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। রোববার ফেনীর আদালতে এ দুই আসামি রাফি হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিন বেলা ৩টা থেকে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন তাদের দু’জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

তবে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন তার বিরুদ্ধে উঠে আসা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সোমবার বিকালে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘সবই ভিত্তিহীন। আমি তাদের অধ্যক্ষকে (সিরাজ উদ্দৌলা) জেলে পাঠিয়েছিলাম। এ কারণেই তারা (নুরুদ্দিন ও শাহাদাত) হয়তো আমার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে নাম বলেছেন।’

সূত্র আরও জানায়, ওই দুই আসামির দেয়া জবানবন্দিতে সোনাগাজী থানা থেকে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও উঠে এসেছে। রাফি হত্যায় জড়িতদের ‘শেল্টারদাতা’ হিসেবে তার নাম এসেছে। 

এছাড়া ওই দুইজনের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছেন পাঁচজন। তারা হল- শাহাদাত হোসেন, জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন, অধ্যক্ষ (বহিষ্কৃত) সিরাজ উদ্দৌলার দূরসম্পর্কের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি ও তার বান্ধবী কামুরুন্নাহার মণি। রাফিকে শেল্টার হাউসের ছাদে কৌশলে ডেকে আনেন পপি।

তিনি (পপি) নিজেকে ঘটনার সময় শম্পা বলে পরিচয় দিয়েছিল। ওই সময় শাহাদাত, জোবায়ের ও জাবেদ বোরকা পরে টয়লেটে লুকিয়ে ছিলেন। সিঁড়ির কাছে তখন লুকিয়ে ছিলেন নুরুদ্দিন। নুরুদ্দিনের ‘সিগন্যাল’ পেয়ে শাহাদাত দৌড়ে গিয়ে রাফির মুখ চেপে ধরেন। এরপর পাঁচজন মিলে তাকে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলেন। তার পরনের ওড়নাটি দুভাগ করে রাফির হাত-পা বাঁধা হয়।

এরপর এক লিটার কেরোসিন তার গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢেলে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় পায়ে। আগুন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই পাঁচজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে  নেমে আসেন। অন্যরা পালিয়ে গেলেও পপি ও মণি মাদ্রাসাতেই অবস্থান করেন। এমনকি সেদিন তারা আলিম পরীক্ষায়ও অংশ নেন।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অন্তত ১৯ জনের নাম এসেছে। দুই আসামির জবানবন্দিতেও অনেকের নাম এসেছে। তাদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ছাড়াও মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক রয়েছেন। এছাড়া আছেন সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বেশ ক’জন আলিম ও ফাজিল শিক্ষার্থী।

এদিকে রাফি হত্যার ঘটনায় সোমবার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কামরুন্নাহার মণি ও মো. শামীম নামে দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা দু’জনই আলিম পরীক্ষার্থী। অপরদিকে অধ্যক্ষ সিরাজের দূরসম্পর্কের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপিকে সোমবার গ্রেফতার দেখিয়েছে পিবিআই।

এর আগে শম্পা সন্দেহে তাকে আটক করা হয়েছিল। তদন্তে পিবিআই নিশ্চিত হয়েছে, রাফি যে শম্পার কথা বলেছিলেন, পপিই প্রকৃতপক্ষে শম্পা। মামলার এজাহারভুক্ত আরেক আসামি কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে সোমবার ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পিবিআই। 

রাফি হত্যার প্রতিবাদ ও খুনিদের বিচারের দাবিতে সোমবারও সারা দেশে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে। এদিকে রাফিকে জেরা করে তার ভিডিও প্রচারের অভিযোগে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। সোমবার বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে এ মামলা দায়ের করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। 

তদন্তের বিষয়ে পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, প্রথমে আমরা ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। পরে আমরা আরও ছয় জনের সংশ্লিষ্টতা পাই। এখন পর্যন্ত আমরা ১৯ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। যাদের নাম আসছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তদন্তে আরও কারও কারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে নুরুদ্দিন জানিয়েছে, ৪ এপ্রিল সে (নুরুদ্দিন), শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন ফেনী কারাগারে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তারা অধ্যক্ষকে বলেন, ‘রাফি আপনাকে (সিরাজ) জেলে পাঠিয়ে আলেম সমাজকে চরমভাবে হেয় করেছেন।

এ কারণে রাফিকে কঠিন শিক্ষা দিতে হবে। রাফিকে কঠিন শিক্ষা দিতে তারা সিরাজের কাছে ‘হুকুম’ চান। ওই সময় রাফিকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেন শাহাদাত। এ প্রস্তাবকে সিরাজ উদ্দৌলা সমর্থন করেন। তখন সিরাজ উদ্দৌলা বলেন, ‘কর, তোমরা কিছু একটা কর’। এ সময় সিরাজ উদ্দৌলা তাদের বেশকিছু গোপন টিপসও দেন। 

নুরুদ্দিন তার জবানবন্দিতে বলেছে, রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করতে শাহাদাত হোসেনের বেশি উৎসাহ ছিল। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাফিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছিলেন। 

রাাফির প্রতি ক্ষোভের কথা জানিয়ে শাহাদাত হোসেন জবানবন্দিতে বলেছেন, দেড় মাস আগে তিনি রাফিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রাফি তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে অপমান করেন। এ কারণে রাফির প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। সিরাজের সঙ্গে ঝামেলা শুরু হওয়ার পর তিনি এটিকে সুযোগ হিসেবে নেন। তিনি রাফিকে শিক্ষা দিতে সিরাজের দলে যোগ দেন। 

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে এনে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। যৌন নিপীড়নের ঘটনায় রাফির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানালে রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

পলিথিনে আনা হয় কেরোসিন : জবানবন্দিতে ওই দুই আসামি প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, ৪ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তারা ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠক করেন।

শাহাদাত জানিয়েছেন, বৈঠকে তিনি, নুরুদ্দিন, মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের প্রধান আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন ছিলেন। ওই বৈঠকে রাফিকে পুড়িয়ে মারার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে কে বোরকা আনবে, কে কেরোসিন আনবে, কে কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় উম্মে সুলতানা পপিকে দিয়ে রাফির বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে- এমন খবর দিয়ে তাকে ডেকে পাঠানো হবে।

পরদিন ৬ এপ্রিল তারা এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগে থেকেই কেরোসিন কিনে আনেন শাহাদাত। তিনি ৭০ টাকা দিয়ে এক লিটার কেরোসিন কেনেন। তিনি দোকানদারকে পলিথিনে কেরোসিন দিতে বললে দোকানদার তাকে সন্দেহ করে। তখন শাহাদাত বলেন, লাকড়িতে আগুন ধরানোর জন্য কেরোসিন লাগবে। পরে তাকে কেরোসিন দেয় দোকানদার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনজন পুরুষের জন্য তিনটি বোরকা কেনার জন্য পপির বান্ধবী কামরুন্নাহার মণিকে দুই হাজার টাকা দেয়া হয়। তিনি তিনটি বোরকা এনে শাহাদাতকে দেন। তিনটি হাতমোজাও তিনি সংগ্রহ করেন। এগুলো সংগ্রহ করার পর তারা শেল্টার হাউসের (ঘটনাস্থল) তিন তলার ছাদে রেখে আসেন।

জবানবন্দিতে শাহাদাত জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সকাল ৮টায় শাহাদাত সোনাগাজী বাজারে আসেন। তখন মনি একটি পুরনো ও দুটি নতুন বোরকা দিয়ে যান। তিনি (শাহাদাত) তাকে উম্মে সুলতানা পপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিকভাবে কাজ করতে বলে বাজারে কেরোসিন কিনতে যান।

এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ও মাদ্রাসাছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) সাইক্লোন শেল্টারের নিচতলার শ্রেণীকক্ষে বসেন। আগুন লাগানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে শাহাদাত বলেন, সকাল  পৌনে ৯টার দিকে রাফিকে ডাকতে যান উম্মে সুলতানা। তখন তারা নিচের শ্রেণীকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেন।

কিছুক্ষণ পর উম্মে সুলতানা ও রাফি ছাদে ওঠেন। তাদের পেছনে ওঠেন মনি। এরপর তৃতীয় তলা থেকে তারা তিনজন ছাদে যান। ছাদে ওঠার পর উম্মে সুলতানা পপি প্রথমে রাফিকে মামলা তুলে নিতে বলেন। রাফি তখন নিশাতকে ছাদে খোঁজাখুঁজি করে না  পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর কামরুন্নাহার মণি রাফিকে একই কথা বলেন। রাফি তখন জবাবে বলেছিলেন, মামলা ওঠাব না। আমার গায়ে কেন হাত দিল। আমি এর শেষ  দেখেই ছাড়ব।

জবানবন্দিতে শাহাদাত আরও বলেন, রাফির ওই জবাব শুনে তিনি নিজে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে তার মুখ  চেপে ধরেন ও অন্য হাত দিয়ে হাত ধরেন। উম্মে সুলতানা পপি তখন রাফির পা ধরেন। আর কামরুন্নাহার মণি রাফির শরীর চেপে ধরেন। তিনজন মিলে রাফিকে তারা ছাদের  মেঝেতে ফেলে দেন।

এই সময়টাতে উম্মে সুলতানাকে তারা কৌশলে শম্পা বলে ডাক দেন। মেঝেতে শুইয়ে  ফেলার পর জোবায়ের রাফির ওড়না দুই টুকরো করে তার (রাফি) হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। জাবেদ তখন রাফির সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। এরপর শাহাদাতের  চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে দেশলাই  বের করে রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন।

পা থেকে আগুন ধরানোয় প্রথমে রাফির পায়ের বাঁধন খুলে যায়। এরপর আগুন যখন ওপরে উঠে তার হাতের বাঁধনও খুলে যায়। তখনই রাফি উঠে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাফির মুখ শাহাদাত চেপে ধরায়  সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।

জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম আরও জানান, এ ঘটনার সময় নুরুদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরও পাঁচজন গেটে পাহারায় ছিল। নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর শামীম দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যান। বাইরে গিয়ে তিনি সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানান। রুহুল আমিন বলেন, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।

নুরুদ্দিন জানিয়েছেন, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজের ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে রাফিকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ঘটনার সময় তিনি ভবনের নিচে ছিলেন। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগ্নি পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যান। নুরুদ্দিন জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ নানা সময়ে ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করতেন।

সিরাজকে কারাগার থেকে বের করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সভাপতি : জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছেন, ২৭ মার্চ রাফিকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে তার মা শিরিন আক্তারের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন তাকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

এমনকি থানা ম্যানেজ করার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। এ জন্য রুহুল আমিন অধ্যক্ষের পরিবারের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছিলেন। সিরাজ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে নুরুদ্দিন ও শাহাদাতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। বিশেষ করে সিরাজকে মুক্ত করার আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন রুহুল আমিন।

তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাউন্সিলর মাকসুদ আলম তাদের দু’জনকে ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। ঘটনার পরদিন ৭ এপ্রিল মাকসুদ ঢাকায় চলে আসেন। এ ছাড়া রাফিকে পুড়িয়ে মারতে এক শিক্ষক তাদের পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।

এদিকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে বাঁচাতে সব ধরনের প্রচেষ্টা ছিল তৎকালীন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের। এমনকি আইনবহির্ভূতভাবে রাফিকে জেরা করে সেটি ওসি মোয়াজ্জেম প্রচার করেন। রাফির গায়ে দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে তিনি এটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে প্রচার চালান।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ও সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। এমনকি ওসি যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেননি। তার এই বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

কাউন্সিলর মাকসুদ পাঁচ দিনের রিমান্ডে : ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মাকসুদ আলমকে ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ আদেশ দেন।

আদালত পরিদর্শক গোলাম জিলানী জানান, সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রীর গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার ৪ নম্বর আসামি পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলমকে আদালতে হাজির করে পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত তাকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আত্মগোপনে স্ত্রী-সন্তানরা : ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি আরও জানান, রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ১৮ লাখ টাকা তুলে স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার পরিবার-পরিজন নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। বর্তমানে ফেরদৌস আক্তার কোথায় আছেন তা জানেন না আত্মীয়স্বজন কেউই।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ জেলে যাওয়ার পরদিন ২৮ মার্চ সোনাগাজীর জনতা ব্যাংকের সোনাগাজী শাখার সিরাজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এসব টাকা উত্তোলন করা হয়।

তবে এসব টাকার কিছু অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির আন্দোলন ও রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করতে খুনিদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।