আড়ালেই থাকল ‘জামাই বাবু’

রাবির শিক্ষক শফিউল হত্যায় ৩ জনের ফাঁসি

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাজশাহী ব্যুরো

রাবি শিক্ষক ড. একেএম শফিউল ইসলাম লিলন। ফাইল ছবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক ড. একেএম শফিউল ইসলাম লিলন হত্যা মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার দুপুর ১২টায় রাজশাহীর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক অনুপ কুমার সাহা জনাকীর্ণ আদালতে চাঞ্চল্যকর মামলার এ রায় ঘোষণা করেন।

বিচারক ৮ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। তবে আলোচিত সেই ‘জামাই বাবু’কে নিয়ে রহস্য উদ্ঘাটন করা গেল না। রায় নিয়ে বাদীপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- আবদুস সামাদ ওরফে পিন্টু (৩৪), আরিফুল ইসলাম ওরফে মানিক (৩৩) ও মো. সবুজ শেখ (১৮)। এদের মধ্যে সবুজ শেখ পলাতক এবং অন্য দুজন রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পিন্টু রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি। মানিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাটাখালি পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আশরাফ আলীর ছেলে।

পিন্টু নগরীর খোজাপুর এলাকার মোজাহারের ছেলে। সবুজ বাখরাবাজ দক্ষিণপাড়া এলাকার শফিকুল ইসলামের ছেলে। বিচারক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেছেন।

অভিযোগপত্রে পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আখতার রেশমাসহ ১১ জন আসামি ছিলেন। রায়ের সময় সবজু ছাড়া সবাই উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত দুজনকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। মামলায় ৩৪ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।

রাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলাম ছিলেন লালন ভক্ত, মুক্তমনা ও প্রগতিশীল আদর্শের অনুসারী। ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। বিকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে তিনি মারা যান। পরদিন রাবির তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহাম্মদ এন্তাজুল হক মতিহার থানায় মামলা করেন।

খুনের ৫ ঘণ্টার মাথায় ফেসবুকে দায় স্বীকার করে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’। খুনের ঘটনায় উগ্রবাদী এ সংগঠনকে সন্দেহ করা হচ্ছিল। তবে তদন্তে বেরিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার নাসরিন আখতার রেশমার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোন্দলের জেরেই খুন হন ড. শফিউল।

হত্যায় জড়িত সন্দেহে ২৩ নভেম্বর প্রথমেই রেশমার স্বামী রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আবদুস সামাদ পিন্টুসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতার করা হয় রেশমাকেও, পরে রেশমা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তৎকালীন পরিদর্শক রেজাউস সাদিক আদালতে অভিযোগপত্রে বলেছেন- রেশমার সঙ্গে ড. শফিউলের ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল। রেশমা এ বিষয়টি তার স্বামী পিন্টুকে জানান। এ নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে ড. শফিউলের বাকবিতণ্ডা হয়। পরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। মানিকের সঙ্গে আলোচনা করে পিন্টু হত্যার পরিকল্পনা করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পথে শফিউলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়- সবুজ প্রথম ড. শফিউলের মাথায় কোপ দেয়। এজাহারে কারও নাম উল্লেখ করা না হলেও সব আসামিকে খুঁজে পাওয়া যায় তদন্তে। পরে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হলেও পরে ৮ জনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়।

অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে ‘জামাই বাবু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে। তবে তদন্তে তার আসল পরিচয় উদ্ঘাটন করা যায়নি। রায়েও তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অভিযোগপত্রে জামাই বাবু সম্পর্কে উল্লেখ করা হলেও তার সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের ছেলে সৌমিন শাহরিদ। তিনি বলেন, যারা সাজা পেলেন- তারা খুনি কী খুনি না, সে বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেই। তবে মামলার তদন্ত নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তদন্ত ঠিকমতো হয়নি। হত্যার সঠিক কারণ উঠে আসেনি।

জানতে চাইলে মামলার অভিযোগপত্র দাখিলকারী পুলিশ কর্মকর্তা এসআই রেজাউস সাদিক বলেন, তদন্তে ঘাটতি নেই; যা পেয়েছি অভিযোগপত্রে তা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘জামাই বাবু’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগেও কয়েকজন মামলা তদন্ত করেছেন। তারা জামাই বাবুর প্রসঙ্গটা এনেছিলেন কিন্তু তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি। এটা হলে তাকে খুঁজে পাওয়া যেত।

মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবু। তিনি বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যে রায় আনতে পেরেছি তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে সন্তুষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হত্যা করার যে প্রবণতা আছে সেটা এ রায়ের মধ্য দিয়ে কমে আসবে। খালাস পাওয়া আসামিদের সাজা চেয়ে আপিল করা হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে সিদ্ধান্ত পরে নেয়া হবে।

এদিকে আটজনের খালাস দেয়ায় সন্তোষ এবং তিনজনকে ফাঁসির আদেশ দেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিদের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, মামলায় যে ৮ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু যে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তা নিয়ে আমরা অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, পুলিশ বলেছে, তাদের কাছে আসামিরা স্বীকারোক্তি দিয়েছে। কিন্তু মামলার ৩৪ সাক্ষীর কেউই পুলিশের বক্তব্যকে সমর্থন করে বক্তব্য দেননি। তাই সাজাপ্রাপ্ত তিনজনের মধ্যে যে দুজন উপস্থিত আছেন তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।