রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সেই ওসির বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ছবি-সংগৃহীত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সোমবার আইনবহির্ভূতভাবে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে জেরা করে তার ভিডিও প্রচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে এ মামলা করা হয়।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ৩০ এপ্রিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বিচারক।

আদালতে জবানবন্দিতে সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের আলোচিত ঘটনার মধ্যে অন্যতম। নুসরাতকে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়। যৌন হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে আসামিসহ তাকে থানায় নেয়া হয়। ওই সময় তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম তাকে জেরা করেন। ওই জেরার ভিডিও ওসি মুঠোফোনে ধারণ করেন।

নুসরাতের মৃত্যুর পর ১১ এপ্রিল তিনি ওই ভিডিও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, আগুনের ঘটনায় নুসরাত বেঁচে গেলেও, ভিডিও প্রচারের পর তার বেঁচে থাকা কঠিন হতো। অনুমতি ছাড়া গোপনে এমন ভিডিও ধারণ ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করায় ভিকটিমের সম্মানহানি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর একটিও ঘটেনি। থানার ভেতরে এমন ভিডিও ধারণ ও সম্প্রচার করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধ।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ফেনীর সোনাগাজী মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি ও আসামিকে ২৭ মার্চ থানায় নিয়ে যান তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওই সময় ওসি নিয়মবহির্ভূতভাবে জেরা করতে করতেই অনুমতি ব্যতিরেকে রাফির বক্তব্য ভিডিও করেন। পরে ওই ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ওসি অত্যন্ত অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষায় নুসরাতকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। এমনকি ভিডিওর একপর্যায়ে দেখা যায় ওসি রাফিকে জিজ্ঞাসা করেন, তাকে (রাফি) বুকে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করেছিল কিনা। এটি অত্যন্ত মানহানিকর।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নিয়মিত হত্যা মামলা বিচারাধীন। কিন্তু জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তারা কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ও দায়িত্বে অবহেলাসহ সব বিষয় বিচারের আওতায় আনা উচিত। আসামির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় মামলাটি করা হয়।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জানান রাফি। সেখানে কয়েকজন তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে বলে। তিনি অস্বীকৃতি জানাতে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে মামলা করেন। অগ্নিদগ্ধ নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান।

ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যৌন নিপীড়নের ওই ঘটনাকে ‘নাটক’ ও পরে অগ্নিদগ্ধের ঘটনাকে ‘আত্মহত্যার’ রূপ দিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। নানা অভিযোগে ১০ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর ছাগলনাইয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে।

ঘুষ কেলেঙ্কারি, স্বর্ণ চুরি, মামলার আলমত চুরি করে বিক্রি করা, সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়া, টোকেন দিয়ে নম্বরবিহীন সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসোয়ারা আদায়, ভুয়া মামলা দিয়ে অর্থ আদায়, নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর হামলা, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের চাঁদাবাজি- এমন অসংখ্য অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করা হয় বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।