আদালতে শরিফের স্বীকারোক্তি

হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত ১২ জনের সভায়

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি প্রধানের বিরুদ্ধেই গাফিলতির অভিযোগ! * সদর দফতরে দেয়া এসপির চিঠি ও ওসির ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশের তদন্ত কমিটি * এজাহারভুক্ত আসামি কাদেরসহ গ্রেফতার ৩ * আরেক আসামি মণি ৫ দিনের রিমান্ডে * বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট * এ পর্যন্ত গ্রেফতার ১৯ * সারা দেশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অব্যাহত

  ইকবাল হাসান ফরিদ, ঢাকা ও যতন মজুমদার, ফেনী ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুসরাত

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১২ জনের সভায়। রাফি হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আবদুর রহিম ওরফে শরিফ।

বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সারাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেন শরিফ। সেখানে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকা থেকে বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর একটি দল তাকে (আবদুর রহিম শরিফ) গ্রেফতার করে। শরিফসহ এ পর্যন্ত রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনজন।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ- জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান মাদ্রাসা গভর্নিং বডির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এনামুল করিম বিতর্কিত ব্যক্তি।

তার (এনামুল করিম) নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরবে কি না- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা। এদিকে রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া আবদুর রহিম শরিফসহ গত দু’দিনে তিনজনকে গ্রেফতার করল পিবিআই।

এ নিয়ে বুধবার পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হল। এ ছাড়া সোমবার গ্রেফতার হওয়া কামরুন্নাহার মণিকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আজ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে হাফেজ আবদুল কাদেরকে ফেনীর আদালতে হাজির করা হবে। হাফেজ আবদুল কাদের পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, রাফিকে গায়ে আগুন দিয়ে পোড়ানোর প্ল্যানটি প্রথম সে-ই (কাদের) দিয়েছিল।

এ ছাড়া বুধবার রাফি হত্যার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। আর রাফি হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বুধবারও ঢাকা, ফেনী, গোপালগঞ্জ, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে।এদিকে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার তদন্ত কাজ বুধবার থেকে শুরু করেছে পিবিআই।

পাশাপাশি রাফিকে যৌন হয়রানি এবং পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে এদিন বিকালে ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) এসএম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে পুলিশ সদর দফতরের ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

পুলিশের ওই প্রতিনিধি দল ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ‘রক্ষা করতে’ ফেনীর পুলিশ সুপারের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে। তারা রাফির স্বজন, মাদ্রাসার শিক্ষকসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে। আরও জানা গেছে, সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের এ ঘটনার (রাফি হত্যা) পেছনে জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানে নেমেছে পিবিআই।

পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাফির গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনা নিয়ে ফেনীর এসপি জাহাঙ্গীর আলম ১১ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দফতর, বিশেষ শাখা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির দফতরে পাঠানো হয়। পুলিশ সুপারের চিঠিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন রাফি মাদ্রাসায় যান।

এরপর তার বসার স্থানে ফাইলপত্র রেখে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদের ওপরে বাথরুমের কাছে যান। কিছুক্ষণ পর গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে আসেন। তখন কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও মাদ্রাসার কর্মচারীরা আগুন নিভিয়ে ফেলেন।

ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা মামলা করতে কালক্ষেপণ করে। পুলিশ রাফির চাচাকে বাদী করে মামলা করতে গেলে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান আপত্তি জানান। তিনি দু’বার এজাহার বদল করেন।

নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনাটি এসপির চিঠিতে এমনভাবে বলা হয়েছে যাতে মনে হচ্ছে, নুসরাত নিজের ইচ্ছায়ই ভবনের ওপরে যান। অথচ তাকে পরিকল্পনা করে ডেকে নেয়া হয়। এরপর হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার কোনো কথাই উল্লেখ করা হয়নি।

এসপির এ চিঠির ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- ওসিকে রক্ষা করতে এমন চিঠি দেয়া হয়েছিল কি না। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন বুধবার রাতে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু এসপির চিঠিই নয়, পুলিশের কোনো সদস্যের গাফিলতি ছিল কি না- সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার আবদুর রহিম শরিফ তার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশে ও পরামর্শে রাফিকে হত্যার জন্য গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগানো হয়। এ জন্য ২৮ ও ৩০ মার্চ দুই দফা কারাগারে থাকা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করেন তারা।

৪ এপ্রিল সকালে অধ্যক্ষ সাহেব ‘মুক্তি পরিষদ’র সভা করা হয়। ওই রাতেই ১২ জনের এক সভায় রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। তার (আবদুর রহিম শরিফ) দায়িত্ব পড়ে মাদ্রাসার গেটে। সেখানে নুরুদ্দিন, আবদুল কাদেরসহ আরও ২ জন ছিলেন। মাদ্রাসার ছাদে বোরকা পরে ছিলেন শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের ও জাবের। এ ছাড়া ছাদে ছিলেন কামরুন্নাহার মণি ও পপি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, আবদুর রহিম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর রাতেই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার অপর দুই আসামি নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, আবদুর রহিম শরিফও একইরকম স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তাদের স্বীকারোক্তি থেকেও মণির নাম উঠে আসে। তিনি বলেন, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই জানতেন আবদুর রহিম শরিফ।

জানা গেছে, রাফিকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনার পরদিন ৭ এপ্রিল ফেনী জেলা প্রশাসন ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পিকেএম এনামুল করিমকে।

কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন : সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী সলিম উল্লাহ। কমিটিকে ৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- কমিটি ৩ কার্যদিবসে ঘটনাস্থলেই যেতে পারেনি। পরে আরও ৭ দিনের সময় বাড়ানো হলে ১১ এপ্রিল কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান যুগান্তরকে বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিকেএম এনামুল করিম মাদ্রাসার গভর্নিং বডির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। এ মাদ্রাসার প্রিন্সিপালসহ কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। তার তদন্ত রিপোর্টে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে, এমনটা আশা করা যায় না।

এদিকে এ ঘটনায় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির গাফিলতির বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বুধবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যিনি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির প্রধান। রাফির ঘটনায় দায়িত্ব পালনে তিনিসহ ওই বডির সবার গাফিলতি পাওয়া গেছে। যার বিরুদ্ধে একই ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগ আছে, সেই ঘটনা তদন্তে তাকে কমিটির প্রধান করা ঠিক হয়নি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পিকেএম এনামুল করিম যুগান্তরকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, সেখানে আমি কোনো কথা বলতে পারি না। আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না। তবে আমাদের রিপোর্ট প্রায় চূড়ান্ত। আশা করছি বৃহস্পতিবার (আজ) দাখিল করতে পারব। রিপোর্টে কি উঠে এসেছে তাও এ মুহূর্তে বলা যাবে না।

যোগাযোগ করা হলে ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আমরা তদন্ত কমিটির প্রধান করেছিলাম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিকেএম এনামুল করিম। এ হিসেবে তিনি তদন্ত কমিটির প্রধান। জেলা প্রশাসক বলেন, তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর দেখা হবে এতে কোনো ধরনের চাতুরী করা হয়েছে কি না। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে পিবিআইয়ের একটি সূত্র জানায়, রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ্দৌলাসহ ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও অন্তত ৭ জনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ মিলেছে। এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেছেন, রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। গ্রেফতার হওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রত্যেকের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

শামীমের সঙ্গে তার (রুহুল আমিন) কথোপকথনের কল রেকর্ডও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক না কেন, কেউ ছাড় পাবে না। ডিআইজি জানান, ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার তদন্তে একজন নারী এসপিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছেন।

পুলিশ সদর দফতরে তদন্ত কমিটি : রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের গাফিলতি খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দফতরের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল বুধবার বিকালে ফেনীর সোনাগাজীতে যায়। তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে একজন পুলিশ সুপার, দু’জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক এ তদন্ত দলে রয়েছেন।

তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কথা বলেন মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে। পরে তারা সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের নুসরাত জাহান রাফির বাড়িতে যান। সেখানে তার বাবা এসএস মুছা মানিক, মা শিরিন আক্তার, বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান ও রাফির দুই সহপাঠীকে মাদ্রাসায় নিয়ে এসে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে কথা বলেন।

রাফির কবর জিয়ারতও করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। ডিআইজি রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন- ঘটনায় ওসির ভূমিকা কি ছিল, যথাযথ ছিল কি না- সেটাই আমরা খতিয়ে দেখব। আমি আমার টিমসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আজ (বুধবার) কথা বলেছি। আগামীকালও কথা বলব। তদন্তে কি পাওয়া গেছে তা এখনই বলা যাবে না। তবে পুলিশের কেউ অপরাধ করলে এর দায় পুরো বাহিনী নেবে না। আমরা যেটা পাব সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদন দাখিল করব।

সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার ৩ দিন পর পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে পিবিআই সূত্র জানায়, রাফি হত্যার ঘটনায় এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরকে বুধবার ভোরে মিরপুরের ৬০ ফুট ছাপড়া মসজিদ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে এসআই আল আমিন শেখ ওই এলাকায় তার ভাইয়ের বাসা থেকে আবদুল কাদেরকে গ্রেফতার করেন।

এ ছাড়া রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর এলাকা থেকে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর আরেকটি দল মঙ্গলবার রাতে আবদুর রহিম শরিফকে গ্রেফতার করে। এদিকে অভিযানের কারণে ইমরান হোসেন মামুন ঢাকা থেকে স্টারলাইন পরিবহনের একটি বাসে করে ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার বিকালে ফেনী এলাকার স্টারলাইন পরিবহনের ওই বাস থেকে গ্রেফতার করা হয় ইমরান হোসেন মামুনকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শাহাদাত ও নুরুদ্দিনের জবানবন্দিতে শরিফ ও মামুনের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছিল। রাফির গায়ে আগুন দেয়ার সময় এরা গেটের পাহারায় ছিলেন।

এদিকে ফেনী প্রতিনিধি জানান, রাফিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা মিশনে অংশ নেয়া কামরুন নাহার মণিকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। বুধবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সারাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ আদেশ দেন। কোর্ট ইন্সপেক্টর গোলাম জিলানী জানান, কামরুন নাহার মণিকে আদালতে তুলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর মো. শাহ আলম ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

আদালত তাকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ মামলার অন্যতম আসামি নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের জবানবন্দিতে উঠে আসে, কামরুন্নাহার মণি বোরকা সংগ্রহ করেন এবং রাফিকে আগুনে পোড়ানোর মিশনে অংশ নেন।

এ ছাড়া রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে বুধবার হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। এদিন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ এ আবেদন করেন। অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ জানান, হাইকোর্ট বৃহস্পতিবার (আজ) এ আবেদনের শুনানি করতে পারেন।

তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভুলের কারণে রাফি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, সোনাগাজী মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও শাস্তি দেয়া উচিত। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পুলিশের আইজি ও সোনাগাজীর ওসিসহ মোট পাঁচজনকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি। এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

বিক্ষোভ-মানববন্ধন : রাফি হত্যায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বুধবার ঢাকা, ফেনীর সোনাগাজী, গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে।

বুধবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাফি হত্যায় সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, সংবাদ প্রকাশের জের ধরে সোনাগাজীর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম নিজেকে বাঁচাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি ও বিএমএসএফের স্থানীয় সভাপতিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছেন।

পরদিন স্থানীয় ও ফেনী জেলার সাংবাদিকরা ফুঁসে উঠে মানববন্ধনের ডাক দিলে তাকে আদরের ছলে বাসায় নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন পৌর মেয়র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানকার সাংবাদিকদের ওপর স্টিম রোলার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

বিএমএসএফ ঢাকা জেলা কমিটির আয়োজনে ঢাকা জেলার সহসভাপতি অহিদুজ্জামান মোল্লার সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএমএসএফের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আবু জাফর, মহেশখালীর পৌর মেয়র মকছুদ উল্লাহ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক সালামত উল্লাহ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সুরক্ষা কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রবীন্দ্র নাথ দে, আবদুর রাজ্জাক, ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল ভূঁইয়া, যুগ্ম সম্পাদক আনিস লিমন, সাংগঠনিক সম্পাদক কবির নেওয়াজ, আমেনা ইসলাম, মানবাধিকার সম্পাদক মোনালিসা মৌ, উপ-প্রচার সম্পাদক কৌশিক আহম্মেদ সোহাগ প্রমুখ। এ ছাড়া আরও কয়েকটি সংগঠন নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করে।

সোনাগাজীতে মানববন্ধন : সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, রাফির হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বুধবার সকাল ১০টায় সোনাগাজী প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে সোনাগাজী বাজারের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বখতার মুন্সি কলেজ, এনায়েত উল্যাহ মহিলা কলেজ, ১৮টি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×