উত্তরপ্রদেশে এবারও গুরু শিষ্যের লড়াই

  শামীম জোয়ার্দ্দার ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জয়াপ্রদা
জয়াপ্রদা। ছবি: সংগৃহীত

‘এক জিদ থি মেরি অন্দর কি, মে কাহি সে ভি কনটেস্ট লড় সাকতি হু’ (আমার ভেতরে একটাই জিদ কাজ করছিল। যেখান থেকেই হোক জেতার শক্তি আমার আছে)। ২০০৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের নেতা এন চন্দ্রবাবু নাইডুর বিরুদ্ধে এ চ্যালেঞ্জ ছুড়েই ‘নিজের পায়ে’ পথচলা শুরু জয়াপ্রদার। এরপর আর পেছনে তাকাননি।

চলতি পথে হোঁচট খেয়ে অনেক বটবৃক্ষের ছায়ায় বসেছেন। তবে জিরাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েননি। শক্তি সঞ্চয় করেই আবার শুরু। এক দৌড়েই উত্তরপ্রদেশের রামপুর থেকে পরপর দু’বার এমপি। রুপালি পর্দার প্রেমিকের দিকে তাকানো সেই একই বাঁকা চাহনিতেই তার গুরুকুলকেও বুঝিয়ে দিলেন ‘আমি জয়াপ্রদা’। সেই জয়াপ্রদা, মাত্র ১৩ বছরেই যিনি স্কুল মাতিয়েছিলেন নেচে। তারপর কালের হাল ধরে ঢুকে পড়েন তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে।

জনপ্রিয়তার পারদে চড়ে পা পড়ে বলিউড-টালিউডে। অন্ধ্রপ্রদেশের অজপাড়া ললিতারানির পল্লীবালাই হয়ে ওঠেন রাজধানীর হট-টক। আর আজ উত্তরপ্রদেশ রাজনীতির টপ-টক। শুরুটা ছিল সমাজবাদী পার্টির সমকালীন তারকা, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠাতা আজম খানের হাত ধরে। এখনও সবাই বলে, এ আজম খানই তার রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু। আর সেই আজম খানকেই গত ১৫ বছর ধরে রাজনীতির মাঠের ভেড়া বানিয়ে রেখেছেন তারই প্রিয় পাত্রী, পছন্দের শিষ্য জয়াপ্রদা। আর এ দেড় দশকে বহু ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে আজকের জয়াপ্রদা। উত্তরপ্রদেশ খেলায় মোদির তুরুপের তাস।

শুরু থেকেই একের পর এক দল ও রাজনৈতিক গুরু বদলান তিনি। কখনও টিডিপি, কখনও সমাজবাদী পার্টি (সপা) আবার কখনও বিজেপি। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ মার্চ যোগ দেন বিজেপিতে। গতবার হারলেও এবারও আবার রামপুর থেকেই। গুরু আজম খানের বিরুদ্ধে। অখিলেশ-মায়াবতী জোটের প্রার্থী তিনি। জয়াপ্রদার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের সঞ্জয় কাপুরকে নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই ৫৭ বছর বয়সী এ অভিনেত্রীর। লড়াই মূলত গুরু-শিষ্যের। অবশ্য ‘গুরু মারা শিষ্য’ খ্যাতিটাও তার নিজের ঝুলিতে অনেক পুরনো।

২৩ এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের ভোট। হারানো ভূমি ফিরে পাওয়ার আশায় দিনরাত শহর থেকে গ্রাম চষে বেড়াচ্ছেন জয়া। শুক্রবার রামপুরের সিট্রিয়া জাগির গ্রামে এক জনসভায় বক্তব্য রাখেন। হাজার হাজার নারী ভোটারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চাই যে, ২৩ এপ্রিল এলেই আগে ভোট দেবেন তারপর রান্না করবেন। এর ঘণ্টা দুই বাদেই আজম খানের প্রেস সচিব বলেন, দু’দিন আগে এ কথাটাই এক জনসভায় বলেছিলেন তার নেতা। ‘আগে ভোট দেবেন, পরে খাবেন।’ এ হল গুরু শিষ্যের সার্বক্ষণিক অবস্থা।

শুধু জয়ায় নয়, জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন সপার আজম খান ও কংগ্রেসের সঞ্জয় কাপুরও। প্রচারে গিয়ে জয়ার বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছেন আজম। জয়ার নাম না নিয়েই তিনি মন্তব্য করেন, ‘তাকে চিনতে উত্তরপ্রদেশের ১৭ বছর সময় লেগেছে। কিন্তু আমি ১৭ দিনেই বুঝেছিলাম, ওর অন্তর্বাসের রং খাকি।’ এ মন্তব্যের পর ৭২ ঘণ্টার জন্য তার প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা দেয় নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি এখন সরগরম।

আজম খানের মন্তব্যের জবাবে জয়া বলেছেন, ‘তাকে ভোটে লড়তে দেয়াই উচিত নয়। কারণ এ লোকটা জিতলে গণতন্ত্রের কি হবে। সমাজে নারীদের কোনো স্থান থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘উনি বোধ হয় ভাবছেন, আমি এসব কথা শুনে ভয় পেয়ে রামপুর ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু আমি সেটা করব না। তবে এটা আমার কাছে নতুন নয়। ২০০৯ সালে যখন তার দলের প্রার্থী হয়েছিলাম। উনি এমনই মন্তব্য করেছিলেন। তখন কাউকে পাশে পাইনি। কিন্তু এবার আর মুখ বুজে মেনে নেব না।’ জয়া বলেন, ‘আমি তাকে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলাম, কিন্তু আমাকে নাচনেওয়ালি বলে গালি দিয়েছিলেন।

এখন থেকে বছর ১৫ আগে সপার প্রভাবশালী নেতা আজম খানই রামপুরে নিয়ে এসেছিলেন জয়াপ্রদাকে। এখানকার দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ কংগ্রেস ও নবাব পরিবারের কর্তৃত্ব শেষ করতে। ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনে নবাব পরিবারের বেগম নূর ভানুকে হারিয়ে দেন তিনি। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আজম খানের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব। ৫ বছরের মধ্যে তা দা-কুমড়া সম্পর্কে পরিণত হয়। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আগে আগে জয়াপ্রদা চলে যান দলের আরেক নেতা অমর সিংয়ের শিবিরে। তখন সপার প্রধান মুলায়ম সিং যাদবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অমর সিং। এটাকেই কাজে লাগান জয়া। এবারও নির্বাচনে জিতে যান। অমর সিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জেরে পরের বছর ২০১০ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে।

সপা থেকে বেরিয়েই ২০১১ সালে অমর সিংয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় লোক মঞ্চ নামে নতুন দল গঠন করেন জয়া। কিন্তু ২০১২ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের ৪০৩ আসনের ৩৬০টিতেই প্রার্থী দেন তারা। কিন্তু একটি আসনেও জিততে পারেননি। বড় হারের পর অমর সিংকে নিয়েই রাষ্ট্রীয় লোকদলে (আরএলডি) ওঠেন। ২০১৪ সালে লোকসভায় বিজনোর আসন থেকে আরএলডির টিকিটে নির্বাচনে লড়লেও সুবিধা করতে পারেননি। এবার বিজেপিতেই আশা দেখছেন।

২০০৪ সালে সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর টিডিপির রাজনীতি করেছেন জয়প্রদা। ১৯৯৫ সালে শ্বশুর এনটি রামা রাওয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দলে নিয়ন্ত্রণ নেন অন্ধ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। ১৯৯৬ সালে নাইডুর টিডিপির টিকিটেই প্রথমবারের মতো রাজ্যসভার বিধায়ক নির্বাচিত হন জয়াপ্রদা। কয়েক বছর না জেতেই চন্দ্রবাবুর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জাড়িয়ে পড়েন এবং টিডিপি ছেড়ে সপায় যোগ দেন।

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×