লক্ষ্মীপুরে দগ্ধ সেই নারীর ঢাকায় মৃত্যু

আটক চার, স্বামী পলাতক

  যুগান্তর রিপোর্ট ও রামগতি (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্ত্রীর স্বীকৃতি আদায়ে চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুরে আসার পর আগুনে দগ্ধ শাহীন আক্তার (২২) মারা গেছেন।

স্ত্রীর স্বীকৃতি আদায়ে চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুরে আসার পর আগুনে দগ্ধ শাহীন আক্তার (২২) মারা গেছেন।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান।

রোববার লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরফলকন গ্রামে একটি সয়াবিনক্ষেতের ভেতর থেকে গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় দৌড়ে বের হলে শাহীনকে উদ্ধার করেন স্থানীয় লোকজন। প্রথমে তাকে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বাচ্চু মিয়া চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বলেন, ‘শাহীন আক্তারের শরীরের ৪০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তার শ্বাসনালি পুড়ে গিয়েছিল। রোববার রাত ২টার দিকে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল শাহীনকে। তিনি আরও জানান, লাশ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পরিবারের লোকজন এলে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তর করা হবে।’

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সালাউদ্দিন তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সালাউদ্দিনের দুই ভাই আলাউদ্দিন, আবদুর রহমানসহ চরফলকন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজউদ্দিন ও গ্রামপুলিশ আবু তাহেরকে আটক করেছে পুলিশ।

কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এছাড়া আটক ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

মেয়টির শরীরে কীভাবে আগুন লেগেছে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা এখনও নিশ্চিত নই। একেক জন একেক রকম কথা বলছেন। বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার সোনাগাজী গ্রামের জাফরউদ্দিনের মেয়ে শাহীন আক্তার শনিবার চরফলকন গ্রামের রিকশাচালক সালাউদ্দিনের বাড়িতে এসে স্ত্রীর মর্যাদা দাবি করেন। শাহীন বলেন, সালাউদ্দিনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেন সালাউদ্দিন। এ নিয়ে সালিশ বৈঠক হয়। কোনো মীমাংসা হয়নি। রোববার বিকাল ৫টার দিকে একটি সয়াবিনক্ষেত থেকে শাহিনা শরীরে আগুন লাগা অবস্থায় বের হয়ে আসে। এ ঘটনার পর সালাউদ্দিন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সালাউদ্দিনের দুই ভাই আলাউদ্দিন, আবদুর রহমানসহ চরফলকন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজউদ্দিন ও গ্রামপুলিশ আবু তাহেরকে আটক করা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল খায়ের বলেন, গ্রামে ঢুকে প্রথমে তার দোকানে বসেন শাহীন। শোনান তার জীবনের গল্প। শাহীনের দেয়া তথ্যের বরাতে আবুল খায়ের বলেন, ফোনে সালাউদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় হয় শাহীনের। পরিচয় থেকে প্রেম। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে শাহীনকে বিয়ে করেন সালাউদ্দিন। কিন্তু সালাউদ্দিন এখন তাকে অস্বীকার করছেন। তবে বিয়ের সময়, তারিখ সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি শাহীন।

এ ঘটনা জানতে পেরে শনিবার বিকালে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হাফিজউদ্দিন সালিশ বৈঠক করেন। বৈঠকে শাহীনকে বিয়ে করার কথা অস্বীকার করেন সালাউদ্দিন। এ সময় শাহীনের কাছে বিয়ের কাবিননামা চাওয়া হয়। কাবিননামা দেখাতে না পারায় তাকে সেগুলো আনতে বলা হয়। এরপর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সালিশে সিদ্ধান্ত হয়। রাত হয়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী পারভিনের বাড়িতে শাহীনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন বেলা ৩টার দিকে শাহীনকে একটি ইজিবাইকে করে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য হাজিরহাট বাসস্ট্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যাওয়ার পথে শাহীন ইজিবাইক থেকে নেমে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, ইজিবাইক থেকে নেমে আবার সালাউদ্দিনের বাড়ির কাছে যান শাহীন। বিকাল ৫টার দিকে ওই বাড়ির পাশের একটি সয়াবিনক্ষেতের ভেতর ঢোকেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে একটি হাতব্যাগ ছিল। কিছুক্ষণ পর আগুন ধরানো অবস্থায় বের হয়ে ছুটে গিয়ে পাশে আরেক বাড়ির গোয়ালঘরে ঢুকে যান শাহীন। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়।

অগ্নিদগ্ধ শাহীন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে সংবাদকর্মীদের জানান, দুই বছর আগে মোবাইল ফোনে সালাউদ্দিনের সঙ্গে তার প্রেম হয়। এর কয়েক মাস পর রাউজানে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তার স্বামী এক বছর শ্বশুরালয়ে আসা-যাওয়া করলেও স্ত্রীকে কখনই নিজের বাড়ি নেয়ার আগ্রহ দেখায়নি।

শাহীন আরও জানান, বিভিন্ন সময় তিনি শ্বশুরবাড়ি আসার তাগিদ দিলেও তাতে সাড়া দেননি স্বামী সালাউদ্দিন। এ অবস্থায় খোঁজখবর নিয়ে শুক্রবার রাতে তিনি একাই আসেন স্বামীর বাড়ি। সেখানে এসে দেখতে পান সালাউদ্দিন দুই সন্তানসহ অন্য স্ত্রী নিয়ে সংসার করছেন। শাহীন নিজেকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলে সালাউদ্দিন তা অস্বীকার করেন।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি মেয়েটি তার শরীরে নিজেই আগুন দিয়েছে না অন্য কেউ দিয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে বলতে পারব আসল ঘটনা কী ঘটেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×