শ্রীলংকার ঘটনায় বিশ্লেষকরা

রাজনীতিতে ধর্মের কার্ড ব্যবহার বন্ধের আহ্বান

বৈশ্বিক সন্ত্রাসের থাবায় দ্বীপরাষ্ট্রটি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীলংকার ঘটনায় বিশ্লেষকরা

রাজনীতিতে ধর্মের কার্ড ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলা বন্ধ না করলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ঘৃণাকে ভালোবাসা দিয়ে জয় করার যে উদাহরণ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন তা থেকে বিশ্বনেতাদের শিক্ষা নেয়ার তাগিদও দেন তারা।

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শ্রীলংকায় হামলার পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণ, অভ্যন্তরীণ সংকটও থাকতে পারে। ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, সময় নিয়ে পরিকল্পনা করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ছক কষা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায়, কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী এ হামলা চালাতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গির্জা ও পাঁচ তারকা হোটেলে হামলা ধর্মীয় জঙ্গিবাদের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

অনুমান করা যায়, বৈশ্বিক সন্ত্রাসের থাবায় এ দ্বীপরাষ্ট্রটি। তারা বলেন, শ্রীলংকায় ভয়াবহ এ হামলার প্রভাব শুধু ওই দেশটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আরও নানাদিকে প্রভাব ফেলতে পারে। আশপাশের দেশ এমনকি বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জঙ্গি নির্মূল হয়ে গেছে এমনটা ভেবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আত্মতৃপ্তিতে না ভোগার আহ্বান জানান তারা। বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদে আছে। এ দেশ থেকে এ ধরনের শক্তি দূর হয়ে গেছে এমন আত্মতুষ্টিতে যেন আমরা না ভুগি। কারণ অতীতে বাংলাদেশে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতায় জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী একটা মনোভাব আছে। এ মনোভাবকে আরও কাজে লাগাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এমন সময় ঘটনাটি ঘটেছে যার প্রভাব এই উপমহাদেশে কমবেশি পড়তে পারে। হামলার পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণ, অভ্যন্তরীণ সংকটও থাকতে পারে। তবে হামলার ব্যাপারে এত তাড়াতাড়ি উপসংহার টানা ঠিক হবে না। যদিও দেখছি, অনেকে উপসংহার টানার চেষ্টা করছে। আমার মনে হয়, এর সময় এখনও আসেনি। বেশ কতগুলো কারণে এ হামলা তাও ঠিক নয়।

তিনি বলেন, ভয়াবহ এ হামলায় বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। তিনটি শহরে একই সঙ্গে বোমাগুলো বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এগুলো বড় মাত্রার বিস্ফোরণ। এর অর্থ হল হামলাগুলো যথেষ্ট পরিকল্পিত। এটি এক-দুই দিনের কাজ নয়। অন্তত বেশ কয়েক মাসের। গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও দেশটিতে কোনো তৎপরতা না নেয়াটা অস্বাভাবিক। ব্যবস্থা নিলে ঘটনা ঘটত না সেটা হয়তো বলা যাবে না। তবে এত ব্যাপক আকারে ঘটত না। গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণ নিয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন।

এ বিশ্লেষকের মতে, হামলার ধরন থেকে কয়েকটি বিষয় অনুমান করা যায়। প্রথমত, এমন দিনে হামলা চালানো হয়েছে যখন এ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। যে কেউ ধারণা করবে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করে এ আক্রমণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, হামলার পেছনে অর্থনৈতিক কারণও থাকতে পারে। বড় বড় তিনটি পাঁচতারা হোটেলে হামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে কিংসবারি ও সিনামন হোটেল শ্রীলংকার মালিকানায় আছে। আক্রান্ত অপর হোটেল সাংগ্রিলা মালয়েশিয়ার মালিকানাধীন। এতেও বোঝা যাচ্ছে, এক ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। যে পর্যটন খাত নিয়ে শ্রীলংকার অর্থনীতি চালিত হয় সে জায়গায় আঘাত করা হয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও শ্রীলংকায় বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার শমসের মবিন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এ রকম বড় হামলার ঘটনা প্রথম ঘটল। এই বর্বরতম ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, এ নিয়ে শ্রীলংকান সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তারা সন্দেহ করছে এবং কিছুটা ইঙ্গিত করছে, একটি জঙ্গিগোষ্ঠী ওই হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, যদি কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী এটি করে থাকে, এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। এর প্রভাব শুধু শ্রীলংকার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আরও নানাদিকে প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, কারা কোন উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী এ হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকতে পারে নতুবা স্থানীয় জঙ্গিরা আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে অনুসরণ করেছে।

শমসের মবিন বলেন, এ ধরনের ঘটনা ভারত, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশেও ঘটেছে। কিন্তু শ্রীলংকার মতো দেশে এমন ঘটনা বিরল। শ্রীলংকায় হামলার পর আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। জঙ্গি দমনে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। সরকারও এ ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। কিন্তু এতে খুশি হলে চলবে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

কারণ জঙ্গি তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা খুবই কঠিন। তিনি বলেন, এ হামলা অবশ্যই মর্মান্তিক এবং নিন্দনীয়। ঘটনার পর শ্রীলংকান সরকার জরুরি অবস্থার ঘোষণা দিয়েছে। সান্ধ্য আইনও জারি করেছে। নিশ্চয় কোনো একটি বিষয় মাথায় রেখেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ হামলার কোনো পাল্টা আক্রমণ যাতে না হয় কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর, সরকার এখন সেদিকেই নজর দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিনের মতে, ধর্মের অপব্যবহার করে রাজনীতির খেলা বন্ধ না করলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। রাজনীতিতে ধর্মের কার্ড ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

১৯৮৩ সাল থেকে ২৬ বছর গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ছিল শ্রীলংকা। ২০০৯ সালের মে মাসে তামিল টাইগারদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। গত ১০ বছরে শান্তির পথে হাঁটতে শুরু করে দেশটি। কিন্তু রোববারের হামলা আবারও সংকটে ফেলেছে শ্রীলংকাকে। তিনি বলেন, ঘৃণাকে ভালোবাসা দিয়ে জয় করার যে উদাহরণ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন তা থেকে বিশ্বনেতাদের শিক্ষা নেয়ার তাগিদও দেন এ অধ্যাপক।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×