বিএনপি সংসদ সদস্যদের শপথ

স্পিকার চাইলে সময় বাড়তে পারে

৩০ এপ্রিল ৯০ দিনের মেয়াদ পূর্ণ হবে * আসন শূন্য ঘোষণার সুযোগ আছে * এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ৫ এমপি, দু-এক দিনের মধ্যে বৈঠকে বসবেন * দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ কেউ শপথ নিতে পারেন এমন সন্দেহ নীতিনির্ধারকদের

  শেখ মামুনূর রশীদ ও তারিকুল ইসলাম ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্পিকার শিরিন শারমিন
স্পিকার ড. শিরিন শারমিন। ফাইল ছবি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির ছয় সংসদ সদস্যকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শপথ নিতে হবে। এর মধ্যে যদি তারা শপথ না নেন, সেক্ষত্রে আসনগুলো শূন্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের প্রথম পরিচ্ছেদের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে তাকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে তিনি চাইলে যথার্থ কারণ সাপেক্ষে এ সময় বাড়াতেও পারেন।

এ বিষয়ে সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি (ক) তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন : তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন।’

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী মনে করেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএনপির নির্বাচিত ছয় সদস্য শপথ নেবেন। তিনি বলেন, ‘ওই সময়ের মধ্যে তারা আগ্রহ প্রকাশ করলে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। আর তারা শপথ না নিলে বিষয়টি সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএনপির নির্বাচিতরা শপথ না নিলে আসনগুলো শূন্য হবে। সংবিধানের ৬৭(১) অনুচ্ছেদে সময় বাড়ানোর এখতিয়ার স্পিকারকে দেয়া আছে। এক্ষেত্রে স্পিকারের কাছে তাদের (নির্বাচিত সদস্য) সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে লিখিতভাবে আবেদন জানাতে হবে। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শপথ নেয়ার সময় বাড়াতে পারেন, চাইলে নাও পরেন। পুরো এখতিয়ার স্পিকারের।

তিনি বলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী সদস্যদের শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়া উচিত। জনগণ তাদের ভোট দিয়েছেন সংসদে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরও শপথ না নিলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। তারা সেটা করবেন না বলে আশা করি’।

এদিকে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা শপথ গ্রহণ নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন। একদিকে শপথ নিতে স্থানীয় জনগণের চাপ, অন্যদিকে না নিতে দলের কঠোর অবস্থান- এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় তারা। শপথের জন্য আর মাত্র ৫ দিন সময় পাচ্ছেন নির্বাচিত ৬ এমপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া নির্বাচিত পাঁচ এমপি করণীয় নির্ধারণে দু-এক দিনের মধ্যে বেঠকে বসবেন। সেখানেই তারা করণীয় চূড়ান্ত করবেন। তবে শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্তে এখনও অনড় বিএনপি। কেউ কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নিতে পারেন এমন সন্দেহ দলটির নীতিনির্ধারকদের।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আট আসনে জয়ী হয়। এ আটজনের মধ্যে ছয়জন বিএনপির আর বাকি দু’জন ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামের। নির্বাচনের পরপরই ভোটে ব্যাপক অনিয়ম এবং কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি থেকে বিজয়ী ছয়জন হলেন- বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মো. হারুন অর রশীদ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাহিদুর রহমান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উকিল আবদুস সাত্তার।

এদের শপথ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ, প্রহসনের নির্বাচনে বৈধতা দেবে না বিএনপি। আমাদের সেই সিদ্ধান্তই বহাল আছে। এ নির্বাচন বিএনপির মতো দেশের মানুষও প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে দলের অপর এক নীতিনির্ধারক যুগান্তরকে বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দু’জন এমপি শপথ নিতে পারেন আমাদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে। এদের মধ্যে একজন এবারই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। আরেকজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী। আমরা তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথাও বলেছি। আশা করছি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে তারা যাবেন না। এমনকি তাদের এলাকার নেতাদের সঙ্গেও হাইকমান্ডের কথা হয়েছে। তারা হাইকমান্ডকে জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রতিটি নেতাকর্মী কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করছেন। তারা সংসদে যাওয়ার জন্য কোনো চাপ দিচ্ছেন না। এলাকার জনগণের চাপ রয়েছে বলে যা প্রচার করা হচ্ছে তা অজুহাতমাত্র। ওই নীতিনির্ধারক আরও জানান, তাদের কাছে খবর আছে বিএনপি থেকে নির্বাচিত কয়েকজনকে সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান (সিলেট-২ আসনে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত) ফোন করে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বুব্ধ করার চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোকাব্বির খান যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের সঙ্গে এমনিতে দু-একবার কথা হয়েছে। তারা যাওয়ার জন্য আগ্রহী। এর বেশি তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

সূত্র জানায় দলের চাপে নির্বাচিতরা ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শপথ নিতে না পারলে সময় বৃদ্ধির জন্য স্পিকারের কাছে আবেদন করতে পারেন। স্পিকার চাইলে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শপথ নেয়ার সময় বৃদ্ধি করতে পারেন।

শপথ গ্রহণের সময় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বুধবার যুগান্তরকে বলন, সংবিধান অনুযায়ী কারও সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করা না করার পুরো এখতিয়ার একমাত্র স্পিকারের। ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো সদস্য শপথ না নিলে তিনিই করণীয় ঠিক করবেন। এক্ষেত্রে স্পিকার নির্বাচিত সদস্যকে শপথ নেয়ার জন্য আারও সময় দিতে পারেন, নাও পারেন।

সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানান, সংবিধান অনুযায়ী পুরো বিষয়টি এখন স্পিকারের এখতিয়ারের ওপর। তবে বিধান অনুযায়ী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপির ছয় সদস্যকে শপথ নিতে হবে। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নির্বাচনে জয়ী কোনো সদস্য ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে তার আসন শূন্য হবে। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ৩০ জানুয়ারি। এ হিসাবে ৩০ এপ্রিল ৯০ দিন পূর্ণ হবে তাদের।

গুঞ্জন ছিল সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন। বিনিময়ে সংসদে যোগ দেবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ৬ এমপি। তবে বাংলা নববর্ষের দিন দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যসহ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে সংসদে যাওয়া ও প্যারোলের ব্যাপারে নিজের অনাগ্রহের কথা পরিষ্কার করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এরপর নির্বাচিতদের সতর্ক করে কয়েকটি সভা-সমাবেশে বক্তব্যও দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। এতেও তেমন কাজ হচ্ছে না। নির্বাচিতরা বলছেন, তাদের ওপর এলাকাবাসীর চাপ আছে। এদের কয়েকজন এ নিয়ে নিয়মিত গণমাধ্যমে বক্তব্যও দিচ্ছেন। সম্প্রতি তারা রাজধানীতে একটি হোটেলে চা-চক্রের আয়োজন করেন। পরে দলের মহাসচিব তাদের চেয়ারপারসন কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। সেখানে তারা তাদের ওপর চাপের কথা তুলে ধরেন। বিপরীতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে তাদের সতর্ক করে দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, যারা শপথ নিতে আগ্রহী তারা আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছেন। শপথ নেয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা এ ব্যাপারে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শও করছেন কেউ কেউ।

ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এখনও এ ব্যাপারে কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। মহাসচিব বাদে আমরা ৫ এমপি গত সপ্তাহে একবার বসেছিলাম। সেখানে নীতিগতভাবে আমরা একমত হয়েছিলাম শপথ নেয়াটাই ভালো হবে। বাইরে থেকে কি হবে। সংসদে গিয়ে অন্তত আমরা ম্যাডামসহ নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিসহ নানা বিষয়ে কথা বলতে পারব। তিনি আরও বলেন, শপথ নিয়ে এখনও তো কেউ কিছু বলছেন না। যারা নেবেন ২৯ তারিখের মধ্যে হয়তো নিয়ে নেবেন। আমি এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশিদ যুগান্তরকে বলেন, এখনও ৪-৫ দিন সময় আছে। দেখা যাক কি হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার বলেন, জনগণ যারা ভোট দিয়েছেন তাদের চাপ আছে। আবার দল শপথ না নিতে বলছে। আমরা আছি উভয় সংকটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সময় বেশি নেই। আমি এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। দেখা যাক কি হয়। বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন বলেন, জনগণের তো চাওয়া-পাওয়া অনেক কিছু আছে। কি করব নিজেই তো বুঝে উঠতে পারছি না। দলের বাইরে গিয়েও কিছু করা উচিত হবে না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এক এমপি যুগান্তরকে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে চাই না। দল থেকে অনেক পেয়েছি। কয়েক বার সংসদ সদস্যও ছিলাম। এখন আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু শপথ নিতে নানা দিক থেকে চাপে রয়েছি। শপথ নিতে কারা চাপ দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সব কিছু তো বলা সম্ভব নয়। তবে এখন ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতে বাধ্য হয়েছি- এতটুকুই বলছি।

গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ দল ও ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ৭ মার্চ শপথ নেন। এ কারণে দল ও ফ্রন্ট থেকে তাকে ওইদিনই বহিষ্কার করা হয়। সুলতান মনসুরের পথ ধরে গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও নিজ দলের প্রতীক ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খানও ২ এপ্রিল শপথ নেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা বেইমান। জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছেন, প্রতারণা করেছেন। এটা তার নিজের দলের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে এবং ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রতারণা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×