হামলাকারীদের ধরতে মাঠে তিন বাহিনী

নিহতের সংখ্যা শতাধিক কম দাবি শ্রীলংকার : গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় স্বীকার সরকারের * এবার পুগোদা শহরে বিস্ফোরণ * ভয়ে নেগোম্বো ছাড়ছেন মুসলমানরা * আত্মঘাতী দুই ভাইয়ের বাবা গ্রেফতার * গির্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ, মসজিদ ও স্কুলে নিরাপত্তা জোরদার

  যুগান্তর ডেস্ক ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীলংকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার হোতাদের ধরতে মাঠে নেমেছে দেশটির তিন বাহিনী। ইস্টার সানডের ওই হামলার পরপরই প্রায় দেড় হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। বুধবার রাতে আরও পাঁচ হাজার সেনার সঙ্গে মাঠে নামেন বিমান ও নৌবাহিনীর আরও দুই হাজার সদস্য। এরই মধ্যে আত্মঘাতী হামলাকারী দুই ভাইয়ের বাবা ধনকুবের ইউসুফ ইব্রাহিমকে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এছাড়া সন্দেহভাজন আরও ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছে দেশটির সরকার। বৃহস্পতিবার দেশটির পার্লামেন্টে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী এ দায় স্বীকার করেন। এদিন পুগোদা শহরে আদালতের পেছনে আবারও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহত হয়নি।

এদিকে শোকার্ত মানুষ যখন আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত খ্রিস্টানদের শেষকৃত্য করছে, তখনই প্রাণভয়ে পশ্চিম উপকূলের নেগোম্বো শহর ছাড়ছেন শত শত মুসলমান শরণার্থী। স্থানীয় বাড়িওয়ালারাও তাদের ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবর এনডিটিভি, বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের। খবরে বলা হয়, ন্যাশনাল তাওহিদ জামা’আতের (এনটিজে) জঙ্গিদের ধরতে আরও শক্তি প্রয়োগ করছে শ্রীলংকা সরকার। এরই মধ্যে রাজধানী কলম্বোয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও শহরের অলিগলি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় দেখা গেছে। সরকার সব ধরনের ড্রোন বিমান নিষিদ্ধ করেছে। বাণিজ্যিক ড্রোনের অনুমোদনও বাতিল করা হয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ পাদ্রি সব গির্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া মসজিদ ও স্কুলগুলোয় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার সুমিত আতাপাত্তু বলেন, সেনাবাহিনী এ অভিযানে এর সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ৩০০ জনে উন্নীত করেছে। পাশাপাশি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীও আরও ২ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার আওতায় আমরা এ অভিযানে সন্দেহজনক স্থানে টহল, তল্লাশি এবং সন্দেহভাজনদের আটক ও গ্রেফতারে সহায়তা করছি।

আবারও বিস্ফোরণ : বৃহস্পতিবার রাজধানী কলম্বো থেকে ৪০ কিলোমিটার পূর্বে পুগোদা শহরে আদালতের পেছনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে ওই বিস্ফোরণে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনাসেকেরা বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পেছনের খোলা মাঠে বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ।

এদিকে কলম্বোর প্রধান বিমানবন্দরের কাছে কার পার্কে একটি সন্দেহজনক গাড়ি দেখা যাওয়ার পর বিমানবন্দরে ঢোকার সড়কটি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বোমা হামলার শঙ্কায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবনের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দিয়ে কর্মীদের সদর দফতরের ভেতরেই থাকার নির্দেশ দেন। পরে অবশ্য নিরাপত্তা সতর্কতা তুলে নেয়া হয়েছে।

হামলাকারী দুই ভাইয়ের বাবা গ্রেফতার : গির্জা ও হোটেলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের মধ্যে দু’জন ছিল সহোদর। হামলাকারী সন্তানদের সহযোগিতা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে মসলা ব্যবসায়ী ধনকুবের মোহাম্মদ ইউসুফ ইব্রাহিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার ইব্রাহিমের দুই ছেলে ইমসাত আহমেদ ইব্রাহিম ও ইলহাম আহমেদ ইব্রাহিম আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল।

বৃহস্পতিবার পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনাসেকেরা জানিয়েছেন, তার পরিবারের অন্য সদস্যদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে গুনাসেকেরা বলেন, সিআইডি ও সন্ত্রাসবাদ তদন্ত বিভাগ (টিআইডি) পাঁচটি সেফ হাউসে অভিযান চালিয়েছে। ওই স্থানগুলো ফরেনসিক তদন্তের জন্য সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।

এদিকে হামলার ঘটনায় বুধবার রাতে আরও ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে এক মিসরীয় ও কয়েকজন পাকিস্তানি রয়েছে। তবে আটক মিসরীয় ও পাকিস্তানিরা হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এর আগে আরও ৬০ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে এক সিরীয় নাগরিক ছিলেন।

বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা শতাধিক কম বলছে শ্রীলংকা : রোববারের সিরিজ বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৫৩ জন বলে দাবি করেছে দেশটির স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে কয়েক দফায় বাড়ার পর নিহতের সংখ্যা ৩৫৯ বলে জানানো হয়। বৃহস্পতিবার দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মরদেহের সংখ্যা গণনায় ভুল হয়েছিল।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় স্বীকার শ্রীলংকা সরকারের : এদিকে হামলার ঘটনায় ‘বড়সড়ো গোয়েন্দা ব্যর্থতার’ কথা স্বীকার করেছে দেশটির সরকার। বৃহস্পতিবার বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে ভারতীয় গোয়েন্দারা শ্রীলংকান গোয়েন্দাদের সতর্ক করেছিল। কিন্তু তারপরও কর্তৃপক্ষ সে তথ্য যথাযথভাবে সবাইকে জানানো এবং সাবধানতা অবলম্বনে ব্যর্থ হয়েছে বলে শ্রীলংকার পার্লামেন্টে জানানো হয়।

গোয়েন্দা ব্যর্থতা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান জয়াবর্ধনে বলেন, আমাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় নিতে হবে, যদি গোয়েন্দাদের কাছে থাকা তথ্য যথাসময়ে যথাযথ লোকজনের কাছে থাকত, তাহলে হয়তো ওই হামলা এড়ানো বা অন্তত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যেতে পারত।

পালাচ্ছেন শ্রীলংকার মুসলিমরা : প্রাণভয়ে পশ্চিম উপকূলের নেগোম্বো শহর ছাড়ছেন শত শত মুসলমান শরণার্থী। কলম্বো থেকে এক ঘণ্টা দূরের এ বন্দর শহরে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলেমিশে বাস করলেও গত কয়েকদিনে সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা অনেক বেড়ে গেছে। রোববার স্থানীয় সময় সকালে ভারত মহাসাগরের এ দ্বীপদেশটির বিভিন্ন গির্জা ও হোটেলে একযোগে যে বোমা হামলা হয়, তার মধ্যে নেগোম্বোর সেইন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চও ছিল। প্রায় একই সময়ে ছয়টি স্থানে বিস্ফোরণ ঘটলেও এ গির্জাটিতে হওয়া হামলাই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।

বুধবারও কয়েকশ পাকিস্তানি মুসলমান কলম্বোর উত্তরের এ শহরটি ছেড়ে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে রয়টার্স। স্থানীয় নেতা ও পুলিশ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকা ওই মুসলমানদের সরিয়ে নিতে বাসেরও ব্যবস্থা করে দেন। বাসে উঠতে উঠতে পাকিস্তান থেকে আসা আদনান আলি বলছিলেন, বোমা হামলা এবং এখানে যে বিস্ফোরণটি হয়েছে তার কারণে স্থানীয় শ্রীলংকানরা আমাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। এ মুহূর্তে আমরা জানি না কোথায় যাচ্ছি। ফারাহ জামিল নামে আরেকজন জানান, রোববারের ঘটনার পর তাকে তার বাড়িওয়ালা বাসা থেকে বের করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাড়িওয়ালা আমাকে বলেছেন, বেরিয়ে যাও। যেখানে খুশি সেখানে চলে যাও, কিন্ত এখানে থেকো না।

সব গির্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ : নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির আগ পর্যন্ত শ্রীলংকার সব খ্রিস্টান গির্জা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির এক জ্যেষ্ঠ পাদ্রি এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শে আমরা সব গির্জা বন্ধ রাখছি। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সব গণজমায়েত বন্ধ থাকবে। এছাড়া দেশটির বিভিন্ন মসজিদ ও স্কুলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×