কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ আছে বর্তমান নেই

  সালমান রিয়াজ ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ আছে বর্তমান নেই

ভারত শাসন করবে কোন দল- বিজেপি না বিরোধী কংগ্রেস, নরেন্দ্র মোদি না রাহুল গান্ধী, কার হাসি চওড়া হবে- সেই সমীকরণ শুরু হয়ে গেছে।

তৃতীয় দফার ভোটের পর বিশ্লেষক মহলও অঙ্ক কষতে বসেছে। যোগ্যতার দাঁড়িপাল্লায় তুলছে মোদি-রাহুলকে। ‘চাওয়ালা’ থেকে দেশের ‘চৌকিদার’ (প্রধানমন্ত্রী) বনে যাওয়া মোদিকে সরানো এত সহজ?

‘কৃষক-সেনা’র জোরে তাকে গদিচ্যুত করে হারানো মসনদ ফিরিয়ে আনতে পারবেন ‘যুবরাজ’ রাহুল?- ঘুরেফিরে সে প্রশ্নই উঠছে বারবার।

গত ডিসেম্বরের রাজ্যসভা ভোটে নিজের জাত চিনিয়েছেন গান্ধী পরিবারের কর্ণধার রাহুল। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে বিজেপির হাত থেকে তিনটি ছিনিয়ে নেয় কংগ্রেস।

এতেই ছাতি অনেকটা চওড়া হয়েছে রাহুলের। রাজ্যসভার সেই বিজয়-মুকুট লোকসভায় জয়ে কতটা ঝলক দেখাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘পোড় খাওয়া মোদির সামনে এসব ধোপে টিকবে না। কংগ্রেসের সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ আছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমানটা গড়ের মাঠ।

গত পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একের পর এক আক্রমণ শানিয়েছেন রাহুল, সোনিয়া, জওহরলাল নেহেরু এবং কংগ্রেসকে। এ আক্রমণ বহু ক্ষেত্রে শালীনতার বেড়াও টপকেছে।

গান্ধী পরিবারকে ‘নামদার’ ও নিজেকে ‘কামদার’ বলে অভিহিত করেছেন। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের গৌরবগাথা বর্ণনা করতে গিয়ে হেয় করেছেন নেহেরুকে।

বারবার শুনিয়েছেন কংগ্রেসশূন্য ভারত গড়ার অঙ্গীকারের কথা। লোকসভা নির্বাচনের প্রচারেও গান্ধী পরিবার ও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন মোদি।

সেই তুলনায় রাহুল কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণে যাননি, বরং রাফাল অস্ত্র দুর্নীতি নিয়ে মোদিকে একের পর এক খোঁচা মেরেছেন। একে কেউ দেখছেন প্রশংসার সুরে। কেউ বলছেন, একঘেয়েমি।

২০১২ সালে প্রকাশিত ‘ডিকোডিং রাহুল গান্ধী’ বইয়ের লেখক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অর্থি রামাচন্দ্রন বলেন, ‘মোদির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে যোগ্য নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি (রাহুল)।

কথিত রাফাল যুদ্ধবিমান দুর্নীতি নিয়ে সরকারের উপযুক্ত জবাব চেয়েছেন। নোট বাতিল জনসাধারণের জীবন যে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাহুলের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এখন দেখছি, প্রথমদিকে তার বিন্দুমাত্রও ছিল না। তার রাজনৈতিক বিতর্ক দক্ষতায় বেশ উন্নতি হয়েছে। তিনি নিজেকে ফিরে পেয়েছেন, নিজের দক্ষতা বাড়াতে কঠোর পরিশ্রম করছেন।’

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কংগ্রেস ভোটের প্রচারে গরিবের জন্য ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা (ন্যায়) প্রকল্পের ঢাকঢোল পেটাচ্ছে জোরেশোরেই।

ক্ষমতায় গেলে ৫ কোটি গরিবের প্রত্যেকের জন্য বছরে ৭২ হাজার রুপির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি। একে বিশ্লেষকরা ‘নিখুঁত প্রকল্প’ বলে গুণগান করছেন, যেটি ভোটব্যাংক গড়তে দলকে সাহায্য করবে।

বিজেপি যখন পাকিস্তানের হামলাকে পুঁজি করেছে, কংগ্রেস তখন সরকারের দুর্বলতা খুঁজে খুঁজে তোপ দাগিয়েছে। দরিদ্র ও কর্মসংস্থানের অভাবকে হাতিয়ার করে কথার বাণ ছোটাচ্ছে, যা বিজেপিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

‘কিন্তু ২০১৯ সালের নির্বাচনে কোনো কাজে আসবে না এসব দাবার ঘুঁটি,’ বলছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের (সিএসডিএস) অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার। তিনি বলেন, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে। কংগ্রেসের যোগাযোগ দক্ষতা খুবই দুর্বল। দলটির চতুর্মুখী খামতি রয়েছে। কংগ্রেসের শীর্ষ কাতারের নেতাদের কথার ধারভার খুবই কম।

রাহুলের চেয়ে মোদির রাজনৈতিক বক্তব্য বেশ ক্ষুরধার। আর এ কারণেই বর্তমানের কংগ্রেসকে আমি এগিয়ে রাখতে রাজি নই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নেই। দু-একটি নির্বাচনে হারার অর্থ এই নয় যে, দলটির কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

মনে রাখতে হবে, ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ২টি আসনে জিতেছিল। আর সেই দলটি গতবারের নির্বাচনে এক লাফে ২৮২ আসনে জয় পায়।’ আর এখানেই যত আশা। কংগ্রেস ভারতের ঐতিহাসিক দল। সাদা কথায় বলা যায়, রাহুলের পরিবারের হাত ধরেই হাঁটতে শিখেছে ভারত। আজ হাওয়া খারাপ, কিন্তু বাতাস ঘুরতে সময় লাগে না। রাহুলের বাবা-দাদির ভক্তরা আজও জীবিত। এই পড়তি বাজারেও সেই হইচই চলছে ভোটের মাঠে। আমেথিতে ভোটের রোডশোতে এখনও ভক্তরা রাহুলকে দেখতে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। ১২৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে গত সপ্তাহে রাহুলের রোডশোতে যান মুশতাকিম আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘মোদির সময় ফুরিয়ে আসছে। আর হাতে গোনা কয়েক দিন।’ আনোকেলাল তিওয়ারি নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, ২৩ মে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হবেন মোদি। কংগ্রেসই সরকার গড়বে এবং রাহুল ভাই হবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী।’

যদিও কংগ্রেসের অনেক নেতাই মনে করছেন, ২০১৯-এ প্রকৃত বাঁচা-মরার লড়াই নয়। ২০২৪ সালেই জয়ের মুকুটটা বাগাতে হবে। ২০০৪ সালে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন নেহেরু-গান্ধী পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্ম রাহুল।

৪৮ বছর বয়সী এ নেতা গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ঘাঁটি উত্তর প্রদেশের আমেথি আসন থেকে টানা তিনবারের এমপি। এবার কংগ্রেসের আরেক দুর্গ কেরালার ওয়ানাড়েও লড়ছেন তিনি।

রাহুলের (প্রপিতামহ) জওহরলাল নেহেরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ঠাকুমা (দাদি) ইন্দিরা গান্ধী প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বাবা রাজিব গান্ধীও দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত মা সোনিয়া গান্ধী ১৯৯৮ সাল থেকে দীর্ঘ ১৯ বছর দলের সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন।

২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর সভাপতির ভার রাহুলের কাঁধে আসে। এক বছর ঘুরতেই গত বছরের ডিসেম্বরে বড় দান মারেন নতুন কংগ্রেস সভাপতি। রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপিকে হারিয়ে সরকার গড়ে তার দল।

মিজোরামেও কংগ্রেসের টিমটিম করে জ্বলা বাতি নেভেনি। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল বিজেপি। আর তেলেঙ্গানা রাজ্য তো তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি (টিআরএস) দলের একচেটিয়া দখলে।

তিন রাজ্য বিজেপির কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রাহুল তার যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিলেন। গতবারের লোকসভা ভোটে ৫৪৫ আসনের মধ্যে তার দল মাত্র ৪৪টিতে জয় পেয়েছিল। কংগ্রেস এবার কতটা আসন বাড়িয়ে নিতে পারবে সে জন্য আগামী ২৩ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এদিনই ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×