বিমান এমডিসহ ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

১৪৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারীর জবানবন্দি নেয়ার জন্য দুদকের চিঠি * পাইলট নিয়োগের দুর্নীতি অনুসন্ধানে পরিচালক ফ্লাইট অপারেশনসহ আরও ১০ জনকে চিঠি দেবে * যে কোনোভাবে বিমান মাফিয়াদের আদালত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হবে -দুদক চেয়ারম্যান

প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিজান মালিক ও মুজিব মাসুদ

বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-লুটপাট আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এর অংশ হিসেবে সদ্য অব্যাহতি দেয়া এমডি ও সিইও মোসাদ্দিক আহমেদসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আরও অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শিগগিরই নিষেধাজ্ঞা আসছে। এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে ৩ পরিচালকসহ ৫ কর্মকর্তার জবানবন্দি।

১৪৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দি নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন- সাবেক এমডি এএম মোসদ্দিক আহম্মেদ, বিমান শ্রমিক লীগ সভাপতি ও সিবিএ নেতা মসিকুর রহমান, ট্রাফিক সুপারভাইজার জাকির হোসেন, কমার্শিয়াল সুপারভাইজার রফিকুল আলম, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার মিজানুর রহমান, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার একেএম মাসুম বিল্লাহ, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মারুফ মেহেদী হাসান, কমার্শিয়াল অফিসার জাওয়াত তারিক খান, মাহফুজুল করিম সিদ্দিকী ও গোলাম কায়সার আহম্মেদ।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিমানের দুর্নীতিবাজ মাফিয়া চক্র ও গডফাদাররা যাতে কোনোভাবে দেশত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ লিখিত সিদ্ধান্ত গত সপ্তাহে শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশন পুলিশকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কোনো সময় এ চক্রের প্রত্যেকের পাসপোর্টও জব্দ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারও করা হতে পারে। কেননা অনেকে দেশ ছাড়ার জন্য চেষ্টা করছেন। দেশে-বিদেশে থাকা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ নামে-বেনামের যাবতীয় সম্পদের খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, বিমানের দুর্নীতিবাজরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। গ্রেফতার করে হোক আর না করে হোক, তাদের আদালত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজ এ চক্রটি পুরো বিমানের সিস্টেম নষ্ট করে দিয়েছে। এখানে সিস্টেম অনুযায়ী কোনো কাজ হয়নি। ম্যানেজমেন্ট ও দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্তাদের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে- তারা দুর্নীতি রোধ করতে পারেনি। ম্যানেজমেন্টর ব্যর্থতায় এটা হয়েছে। তিনি বলেন, বিমানের এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিশন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছে। বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। এরই মধ্যে এমডি ও সিইও মোসদ্দিক আহম্মেদকে অপসারণ করা হয়েছে। আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পাইলট নিয়োগে একটি বড় চক্র আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করেছে। তাদের খুঁজে বের করে আনা হবে। যোগ্যতা নেই, তারপরও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ কারণে অনেকে ট্রেনিংয়ে ফেল করে বসে আছে। নিয়োগে শর্ত মানা হয়নি।

জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত দুদকের ৪টি বিশেষ টিম প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক অবস্থায় সংস্থার মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ, গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ ও কার্গো শাখার অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত করবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শাখার তদন্ত করবে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, পাইলট নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে মোসাদ্দিক আহম্মেদ ছাড়াও বর্তমান এমডি ও পরিচালক ফ্লাইট অপারেশন (ডিএফও) ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল, বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানসহ অন্তত ১০ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক। অভিযোগ আছে, মোসাদ্দিক আহম্মেদ তার আপন ভাতিজাকে নিয়োগ দেয়ার জন্য এ চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেছেন। অপরদিকে ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলের নেতৃত্বে এ টিম পুরো নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু নাটের গুরু ফারহাত জামিল এখনও অধরা রয়ে গেছেন। যদিও বিমানের পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ হওয়ায় তাকে এমডি পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, নেপথ্যে থেকে একটি চক্র এ নিয়োগ থেকে গড়প্রতি ৫০ লাখ টাকা থেকে কোটি টাকার উপর বাণিজ্য করেছে। পুরো ৩২ জনকে নিয়োগের সঙ্গে ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলের কতটুকু সম্পৃক্ততা ছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এর আগেও ২৬ জন পাইলট নিয়োগে এ ফারহাত জামিল ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু মোসাদ্দিক আহম্মেদের কারণে ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিলের বিরুদ্ধে সে সময় কোনো ধরনের তদন্ত করা হয়নি। অভিযোগ আছে, ২৬ জন পাইলট নিয়োগের সময় বিমানের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছ থেকে ১০ জনকে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এজন্য ১০ জনকে পাস করানো হয়েছিল। কিন্তু পরে সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদের সঙ্গে যোগসাজশে ২৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অভিযোগ আছে, সে সময় বিমানের সাবেক এক পাইলটের ছেলেকে নিয়োগ দেয়ার জন্য বাধ্য হয়ে ওই বছর ১০ জনের পরিবর্তে ২৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। তৎকালীন নিয়োগ কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল তখন কমিটির কাছ থেকে ১০ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য ফাইলে অনুমোদন নিয়েছিলেন। নিয়োগ কমিটির পক্ষ থেকে তখন তাকে বলা হয়েছিল বাকি প্রার্থীদের অনেকেরই বিমানের পাইলট হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। ১০ জনের বাইরে যাতে কাউকে নিয়োগ দেয়া না হয়। কিন্তু এ ফারহাত জামিল একটি নোট লিখে ১০ জনের বাইরে আরও ১৬ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। জানা গেছে, যোগ্যতা নেই তারপরও জোর করে পাস করানোর কারণে ওই ১৬ জনের মধ্য থেকে ৩ জন পাইলট এখনও সিমিউলেটর ট্রেনিং পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। কমপক্ষে ৪ জন পাইলটকে একাধিকবারের চেষ্টায় সিমিউলেটর পরীক্ষা দিয়ে পাস করানো হয়েছিল। খোদ বিমানের সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদও একাধিকবার এ তথ্য স্বীকার করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে বুধবার বিমানের বর্তমান এমডি ও পাইলট নিয়োগ কমিটির প্রধান ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল যুগান্তরকে বলেন, তিনি মিডিয়ার কাছে কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। দুদককে তিনি সব তথ্য দেবেন। তারপরও তথ্য জানতে হলে বিমানের জনসংযোগ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। শুধু একটি কথা বলেন, আগে যেটা চলে গেছে সেটা নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করে কি লাভ?

এদিকে টিকিট ও কার্গো কেলেঙ্কারির অভিযোগে ওএসডি হওয়া পরিচালক মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস আশরাফুল আলম ও যুক্তরাজ্যের সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম, আতিকুর রহমান চিশতীসহ মার্কেটিং ও কার্গো শাখার দুর্নীতিবাজদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেছে দুদক। পাশাপাশি চক্রের সব সদস্যকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।

চক্রের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- মতিঝিল বিক্রয় অফিসের সহকারী ম্যানেজার মো. এনায়েত হোসেন, সহকারী ম্যানেজার পারভেজ আলম, জিয়াউদ্দিন ঠাকুর, সোলায়মান রিয়াদ প্রমুখ। এছাড়া ইন্টারনাল অডিট শাখার ডিজিএম জাকির হোসাইন, ম্যানেজার জাহাঙ্গীর হোসাইন মজুমদার, লিগ্যাল শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আল মাসুদ খান, গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার এইউএম শাহরিয়ার খানসহ আরও অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি। দুদকের কাছে অভিযোগ আছে, এ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানাভাবে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। লিগ্যাল শাখার আল মাসুদ খানসহ একটি চক্র মামলার পক্ষ-বিপক্ষের কাছে তথ্য বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন।

দুদকের ওই সূত্রে আরও জানা গেছে, সম্প্রতি বিমানের প্রকৌশল শাখা ১৫০ জন ক্লিনার (সুইপার) নিয়োগ দেয়ার সবকিছু চুড়ান্ত করে রেখেছে। এর মধ্যে শুধু সিবিএ নেতাদের তদবিরে কমপক্ষে ৭৫ জনকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিমানের বিভিন্ন শাখার সিবিএ নেতাদের তদবিরে বিমান শ্রমিক লীগের পক্ষ থেকে এসব নাম দেয়া হয়েছে প্রকৌশল শাখায়। এ নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে দীর্ঘদিন ধরে এ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে পারছে না প্রকৌশল বিভাগ। জানা গেছে, এ নিয়োগে সিবিএ নেতারা জনপ্রতি ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। প্রকৌশল শাখার একটি সূত্রে জানা গেছে, এ নিয়োগে ১৫০ জনের যে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছে তার সবগুলো কোনো না কোনো পক্ষের তদবিরে তৈরি করা হয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে একজনকেও চূড়ান্ত করা হয়নি।