রাফি হত্যা : তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ

এসপি বদলির সিদ্ধান্ত, বরখাস্ত হচ্ছেন ওসি

বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে আরও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে * সদর দফতর থেকে নির্দেশ না দিলে ঘটনাস্থলে যেতেন না এসপি * এডিসি’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরকে বলবে পুলিশ সদর দফতর * ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম এবং সময় টিভির রিপোর্টারের পাল্টাপাল্টি জিডি

  সিরাজুল ইসলাম ও আহমদুল হাসান আসিক ০৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এসপি বদলির সিদ্ধান্ত, বরখাস্ত হচ্ছেন ওসি

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় অ্যাকশনে যাচ্ছে পুলিশ সদর দফতর।

এরই মধ্যে এসপি জাহাঙ্গীর আলমকে বদলি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরখাস্ত করা হচ্ছে সোনাগাজীর তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে।

এ দুই পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়া আরও দু’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রাফি হত্যার ঘটনায় ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পিকেএম এনামুল করিমের গাফিলতির প্রমাণও মিলেছে।

তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদনসহ চিঠি পাঠানো হবে। পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি এসএস রুহুল আমিনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

রাফি হত্যার ঘটনায় গাফিলতি খতিয়ে দেখতে ১৩ মে পুলিশ সদর দফতর ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। মঙ্গলবার রাতে কমিটি সদর দফতরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, রাফি হত্যার ঘটনায় এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। এমনকি রাফির গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জেনেও তিনি গুরুত্ব দেননি। ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

পুলিশ সদর দফতর থেকে হস্তক্ষেপ করা না হলে এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। ঘটনাটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এটি জেনেও ওসির পক্ষেই অবস্থান নেন এসপি।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে রাফির যৌন হয়রানির অভিযোগের ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং সময় টিভির ফেনীর রিপোর্টার আতিয়ার হাওলাদার।

ওসি মোয়াজ্জেম ১৪ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় করা জিডিতে বলেন, ওসির মোবাইল ফোন থেকে ভিডিওটি একটি অ্যাপের মাধ্যমে আতিয়ার চুরি করে তার মোবাইলে নিয়ে যায়। অপরদিকে আতিয়ার বৃহস্পতিবার ফেনী মডেল থানায় করা জিডিতে বলেছেন, ওসি স্বেচ্ছায় ওই ভিডিও তাকে দেন।

মিথ্যাচার করেছেন এসপি জাহাঙ্গীর : তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দফতরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনা ঘটলেও তাকে শুরুতে জানানো হয়নি। খাগড়াছড়িতে তার একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার পর তিনি সেখানে রওনা দেন। রামগড় পার হওয়ার পর ঘটনাটি তাকে জানানো হয়। এরপর তিনি খাগড়াছড়িতে না গিয়ে ফেনীতে ফেরত আসেন। তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার পর পরই সকাল ১০টার দিকে এসপিকে বিষয়টি জানায় স্থানীয় পুলিশ। ঘটনা জানার পরও প্রায় ৩ ঘণ্টা তিনি ফেনীতে অবস্থান করেন। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফেনী থেকে সোনাগাজীতে যাওয়া যায়। কিন্তু রাফিকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা শোনার পর এসপি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাননি। খাগড়াছড়ির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুপুর ১টার দিকে তিনি ফেনী ত্যাগ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ সদর দফতর হস্তক্ষেপ না করলে ঘটনার দিন এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। আগুনে জীবন্ত মানুষ পোড়ানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নাড়া দেয়নি।

পুলিশ সদর দফতর থেকে যখন এসপিকে ফোন করা হয়, তখন এসপি ছিলেন খাগড়াছড়ির পথে। তাকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে বিকাল ৫টার দিকে তিনি সোনাগাজীতে যান। অথচ কারও নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে এসপির উচিত ছিল সোনাগাজীতে ছুটে যাওয়া।

ওসির পক্ষে অবস্থান নেন এসপি : পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের সঙ্গে মিলে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর সব ধরনের চেষ্টা করেন। বিষয়টি মিডিয়াতে আসার কারণে অপচেষ্টা সফল হয়নি। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবেই ঘটনা বিকৃত করে ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে পুলিশ সদর দফতরে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন এসপি জাহাঙ্গীর আলম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ডিআইজি পদমর্যদার এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতর একমত হয়েছে। এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে ধরনের নির্দেশনা দেবে, পুলিশ সদর দফতর সে ব্যবস্থা নেবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে এরই মধ্যে সদর দফতর এসপিকে কম গুরুত্বপূর্ণ এবং নন অপারেশনাল ইউনিটে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ওসিকে বরখাস্ত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া অভিযুক্ত দুই এসআই মো. ইকবাল ও মো. ইউসুফকে বরখাস্ত করা হবে।

এডিসি এনামুলের গাফিলতি : পুলিশ সদর দফতরের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করার পর অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সহসভাপতি ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন এতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। রাফির মা শিরিন আক্তার এবং রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান যৌন হয়রানির বিষয়টি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও ফেনী জেলা এডিসি-রাজস্ব পিকেএম এনামুল করিমকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি। উল্টো তাদের তিরস্কার করে বের করে দেন। এমনকি অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তিনি কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেননি। রাফি হত্যায় তার দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এ ঘটনা এড়ানো যেত।

পাঁচজনের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড : ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, রাফিকে যৌন নিপীড়নের পর হত্যায় দায়ের মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমসহ ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এ আদেশ দেন। ফেনী জজ আদালত পুলিশের ওসি গোলাম জিলানি জানান, মামলার ৫ আসামিকে আদালতে হাজির করে ৭ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. শাহ আলম। পরে আদালত শাহাদাত হোসেন শামীম ও জাবেদ হোসেনকে ২ দিন করে এবং ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন ও মহি উদ্দিন শাকিলকে ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি। এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ পর্যন্ত রাফি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২২ জনের মধ্যে সিরাজ উদ্দৌলাসহ ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মে দিবসের কর্মসূচিতে রাফি হত্যার বিচার দাবি : সোনাগাজীতে মে দিবসের শোভাযাত্রা ও সমাবেশে রাফি হত্যার বিচার দাবি করা হয়েছে। ১ মে সকালে উপজেলা শ্রমিক লীগ, কৃষি শ্রমিক ইউনিয়ন, অটোরিকশা, হোটেল, বাস-ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন শোভযাত্রা ও সমাবেশের আয়োজন করে।

সকাল সাড়ে ১০টায় পৌরসভা চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। এটি পৌর শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে জিরো পয়েন্টে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×