কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীনরা

কোনো ইস্যুতেই ছাড় নয় বিএনপিকে

কোনো সংলাপ নয় * নতুন-পুরনো মামলায় অব্যাহত থাকবে ‘গ্রেফতার অভিযান’ * খালেদা জিয়ার মুক্তির নামে যে কোনো বিশৃঙ্খলায় ‘জিরো টলারেন্স’

  মাহবুব হাসান ও রেজাউল করিম প্লাবন ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো ইস্যুতেই বিএনপিকে ছাড় না দেয়ার পরিকল্পনা করেছে ক্ষমতাসীনরা। আর এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো ধরনের সংলাপে যাবে না দলটি। সংবিধান অনুযায়ীই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তির নামে কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজও শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা। যদিও ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের ওপর সরকারের কোনো ধরনের প্রভাব ছিল না। এটি সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় এদেশেও সেভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচনকালীন সরকার থাকবে। যে সরকার শুধু নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। এই ইস্যুসহ অন্য কোনো ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিএনপিকে অতীতের মতো আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস-নাশকতা আর করতে দেয়া হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ রকম কিছু হলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা কঠোর হাতে দমন করবে। কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আশা করি, বিএনপি নেতারা আবোল-তাবোল না বকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হবেন।

আর মঙ্গলবার রাজধানীতে একটি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজাকে সম্পূর্ণ আদালতের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। এতে সরকারের হাত নেই, থাকবেও না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে দুর্বল করতে নানা কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের পুরনো সব মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৩০ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে শুরু হওয়া গ্রেফতার অভিযানও অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এতে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচনের প্রস্তুতির পরিবর্তে মামলা নিয়েই আদালতে মামলা-মোকদ্দমা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। কেননা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী মামলার জালে বন্দি। পুরনো মামলার পাশাপাশি নতুন করেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার রায়ের আগে-পরে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, নাজিমুদ্দিন আলম, শিমুল বিশ্বাস, আজিজুল বারী হেলাল, হাসান মামুন, সাখাওয়াত হোসেন বকুলসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রায়ের দিনও দেয়া হয়েছে মামলা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ৩০ জানুয়ারি থেকে আজ সেদিন পর্যন্ত মোট গ্রেফতারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন। পরদিন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু হুশিয়ারি দেন, সন্ত্রাস-নাশকতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। তিনি এই কমিটির সভাপতি।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ পুরোদমে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের সময় কাটছে আদালতের বারান্দায়। নির্বাচনের বছরেও তাদের বেশির ভাগ সময় আদালতে কাটাতে হবে। যার সম্পূর্ণ সুবিধা ঘরে তুলবে আওয়ামী লীগ। কেননা ক্ষমতাসীনরা ইতিমধ্যে পুরোদমে প্রচার শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় নেতারা করছেন সাংগঠনিক সফর। নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এজেন্ট প্রশিক্ষণ, ভোট কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন, প্রার্থী মনোনয়নের কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু বিএনপি যদি শেষ মুহূর্তে হলেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেও তাদের প্রস্তুতি ছাড়াই নির্বাচনী মাঠে নামতে হবে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের জবাবও দিতে পারবেন না তারা। যেখানে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি-জামায়াত জোটের দুর্নীতি, লুটপাট, মানি লন্ডারিং, হাওয়া ভবন বানিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যাসহ নাশকতা-অরাজকতার চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।

এদিকে খালেদা জিয়ার জামিনের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি কারাবন্দি হওয়ার পর নতুন করে আরও চারটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। যদিও মঙ্গলবার তা অস্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন এবং আপিল আবেদনের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। রোববার দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এবং জামিন আবেদন করলে দুদক তার বিরোধিতা করবে।

এছাড়া খালেদা জিয়া মুক্তি আন্দোলনের নামে ন্যূনতম বিশৃঙ্খলা সহ্য করবে না সরকার। অতীতের মতো নাশকতা বা অরাজতকা কিংবা সহিংসতা করার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত হাতে তা দমন করবে। আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রীসহ সরকারের আরও কয়েকজন মন্ত্রী এ বিষয়ে হুশিয়ারি দিয়েছেন। হুশিয়ারি এসেছে পুলিশের পক্ষ থেকেও। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। এটা আইন-আদালতের বিষয়। কিন্তু বিএনপি যদি আইনি প্রক্রিয়া ছেড়ে এ নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা দমন করবে। আর তাদের সহযোগিতা করবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি দিলে রাজনৈতিকভাবে দলীয় কর্মসূচির মাধ্যমে তার জবাব দেয়া হবে। শাসক দলের নেতারা মনে করছেন, নিবন্ধন রক্ষার্থে হলেও আগামী নির্বাচনে বিএনপিকেও অবশ্যই অংশ নিতে হবে, এমনকি প্রয়োজনে খালেদা জিয়া ছাড়াও। কারণ সাংবিধানিক সব বাস্তবতা মেনে বিএনপির আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। পরপর দুবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার মতো আইনি জটিলতায় পড়বে বিএনপি। আর বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় সেক্ষেত্রেও নির্বাচন স্বাভাবিক নিয়মে অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করছেন তারা। কেননা যদি আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়, সেক্ষেত্রে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা গিয়ে ঠেকবে তলানিতে। যে কারণে সংলাপ বা সহায়ক সরকার কোনো দাবি পূরণ না হলেও বিএনপি নির্বাচনে আসবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড় সরকার পক্ষ। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এবং সরকারের মন্ত্রীরাও বলছেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই, পৃথিবীর অন্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবে এদেশেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি বারবার দাবি করলেও ক্ষমতাসীনরা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না। সহায়ক সরকারকেন্দ্রিক বিএনপির দাবিকেও আমলে নিচ্ছেন না তারা। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচনের আগে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। যার প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। আর তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাবে সে সময়ের সরকার। ইসি ইতিমধ্যে তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করেছে। আমরা আশা করি, আগামী সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সাংবিধানিক পন্থার বাইরে অতীতে এদেশে অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আর সংবিধানের ব্যত্যয় হতে দেবে না।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপিকে সংলাপের জন্য আহবান করা হয়েছিল। তাতে তারা সাড়া না দিয়ে নির্বাচন বানচাল, জ্বালাও-পোড়াও এবং পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। তারা নির্বাচন বর্জন করে ট্রেন মিস করেছিল। এর খেসারত জনগণ দেবে না। কাজেই সরকার বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আর সংলাপের সুযোগ নেই। নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা থাকলে বিএনপি তা ইসির সঙ্গে করতে পারে। তবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস তার।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter